ফুটপাতেও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঘুমাতে পারি না স্যার

স্যার, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, ঈদের দিবস বলেন আমাগো কাছে সব সমান। সব দিনই আমাদের খুঁইজ্যা, মাইগ্গা খাইতে অয় (হয়)। আর রাইতে (রাতে) ফুটপাতে হুইতে (ঘুমাতে) গিয়া পুলিশের জ্বালায় কয়েকবার জায়গা অদল-বদল করতে অয় (হয়)। গেল রাতে অসুস্থ শরীর নিয়ে ছোট বাচ্চাসহ কয়েকবার পুলিশ উঠায়ে দিয়েছে। এটা কি স্বাধীন দেশ স্যার। এই দেশের লইগ্যা শুনছি ৩০ লাখ লোক রক্ত দিছে। কিন্তু স্বাধীন এই দেশের ফুটপাতেও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঘুমাতে পারি না স্যার- বলেই চোখের পানি ছেড়ে দিলেন কুমিল্লা রেল স্টেশনে অবস্থানরত সালাম মিয়া।

সালাম মিয়ার পুরো নাম মো. আবদুস সালাম মিয়া। বয়স প্রায় ৫০ ছুঁই ছুঁই করছে। নানা রোগ শোক তার জীর্ণশীর্ণ শরীরটাকে কাবু করে ফেলছে। স্ত্রী রেহেলা খাতুনের বয়সও ৪০ এর ঘরে। ২ ছেলে ও ২ মেয়ের জনক সালাম মিয়ার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মন্দবাগ এলাকায়। ভালোভাবে ঠিকানাটাও বলতে পারেন না তিনি।

১৬ ডিসেম্বর শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুমিল্লা রেলস্টেশনের ভেতরে প্রবেশ করার পথেই দেখা গেল হাতের বাম পাশে রাস্তার ওপর অপরিষ্কার একটু জায়গায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন এক লোক। তার পিঠের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ৩ বছরের একটি ছেলে আর সঙ্গে বসে শিঙ্গাড়া খাচ্ছেন আর চোখের পানি ফেলছে এক মধ্য বয়সী নারী। সাংবাদিকদের তৃতীয় নয়ন বলে একটি কথা আছে। হয়তো সেই জন্যই কি না এত কিছুর মধ্যেও আমার চোখ গিয়ে পড়ল ওই নারীর চোখের পানির দিকে। সামনে এগিয়ে গেলাম। লক্ষ্য করলাম নারীর চোখের পানি আর হাতের শিঙ্গাড়া ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। আর মনের সুখে বাবার পিঠে দাঁড়িয়ে খেলা করছে রাতুল নামের ওই শিশুটি। পিতৃস্নেহ যে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা বোঝে না, স্থান, কাল আর পাত্র মানে না তা আরেকবার প্রমাণ হলো সালাম মিয়াকে দেখে। নিজেও অসুস্থতার জন্য বসতে পারে না, সারারাত পুলিশের যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারেনি, কিন্তু তার পরেও ছোট ছেলে পিঠে চড়ে যে আনন্দ পাচ্ছে তা থেকে তাকে বঞ্চিত করতে চাচ্ছে না বাবা সালাম মিয়া। এটাই মনে হয় অকৃপণ পিতৃস্নেহ।
কাছে গিয়ে নারীকে কান্নার কারণ জানতে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চেঁচিয়ে উঠলেন রাহেলা খাতুন।

জানালেন, ‘স্যার, এই দেহেন আমার স্বামী অসুস্থ। আমরা স্বামী-স্ত্রী ভিক্ষা কইরা খাই। আমাদের কোনো বাড়িঘর নাই। যখন যেখানে যাই রাস্তার ওপর সেখানেই থাকি। স্বামী আমার খুব অসুস্থ। ২ দিন ধরে ভিক্ষা করতে ফারছে না। রাতে ঘুমাতেও ফারছে না। সারা শরীর ব্যথা, নানা রোগ আছে তার ভেতর। টেহার জন্য ডাক্তারও দেহাতে ফারছি না। কাইল রাইতে রেল স্টেশনে শীতের মধ্যে কোনোমতে এই ছাদরটি দিয়া আমার এই শিশু বাচ্চাটিকে নিয়া আমরা ঘুমাচ্ছি এমন সময় পুলিশ আইয়া আমাদের তুইল্লা দেয়। আবার ওই দিকে গিয়ে ঘুমাইতে যামু এমন সময় আবার পুলিশ বাঁশি বাজাইয়া তুইলা দেয়। সাথে সাথে না উডলে লাডি দিয়ে মারে। বলেন, ফুটপাতে না ঘুমাইতে দিলে আমরা কই গিয়া ঘুমাইব।’

এমন সময় সালাম মিয়া উঠে বসেন। স্ত্রীর ক্রন্দনরত পরিবেশটা পাল্টানোর জন্যই সালাম মিয়াকে বললাম, আজ কি দিবস জানেন কি না। খুব অস্ফুট স্বরে সালাম মিয়া বলে চললেন, ‘স্যার, দিবস দিয়া আমাদের কি অইব? বিজয় দিবস, স্বাধীন দিবস, ঈদের দিবস সব দিবসই আমাগো কাছে হমান। সরকার বিজয় দিবস পালন করছে অথচ আমি স্বাধীন এই দেশের ফুটপাতেও স্ত্রী-সন্তান নিয়া স্বাধীনভাবে ঘুমাতে পারি না। স্যার, বলেন তো আমরা গরিব হতে পারি, ভিখারি হতে পারি কিন্তু আমরা কি এই দেশের নাগরিক না। কেন রাতে পুলিশ আমাদের ফুটপাতে ঘুমাতে বাধা দেয়। তাহলে আমরা কোথায় গিয়ে ঘুমাব?’

লক্ষ্য করলাম, সালাম মিয়ার কথা যেন শেষ হতে চায় না। মুক্তিযুদ্ধ কি জানেন কি না জানতে চাইলে সালাম মিয়া বলেন, জানব না কেন, আমার দুই চাচাতো ভাই রেনু মিয়া ও আজগর আলী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুক্তিযোদ্ধা। সরকার তাদের ভাতা দেয়। আমরা যাতে শান্তিতে খাইতে পারি, ঘুমাতে পারি এই জন্যই তো আমাদের ভাইয়েরা যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু স্যার, আজ যে আমরা ফুটপাতেও ঘুমাতে পারি না। এ জন্যই কি দেশ স্বাধীন হয়েছিল? এ কথা বলেই চোখের পানি ছেড়ে দিলেন অসুস্থ আবদুস সালাম মিয়া।

দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৪৬ বছর হলো। স্বাধীনতার মূল চেতনার অন্যতম অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থান। এই ৪৬ বছরেও আমরা কি পেরেছি এই চার মূলনীতির সঠিক বাস্তবায়ন করতে। এখনো কেন আবদুস সালাম মিয়াদের ফুটপাতে খোলা আকাশে নিচে ঘুমানোর জন্যও সংগ্রাম করতে হয়? আর কতকাল চলবে এভাবে আমার প্রিয় স্বদেশ। আমরা এমন একটি ভোরের সূর্য প্রত্যাশা করি, যে সূর্যটি আমাদের জন্য আর কিছু না হোক মোটা ভাত, মোটা কাপড় খেয়েপরে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগাবে।

মানবকণ্ঠ/বিএএফ