ফুটপাতেই আস্থা মধ্যবিত্তের

ফুটপাতেই আস্থা মধ্যবিত্তের

‘আসেন আসেন, বাইছ্যা লন দেইখ্যা লন, শেষ শেষ, যাচ্ছে বেশ, এক দাম এক রেট,’-এ রকম বিভিন্ন হাঁকডাকে মুখরিত রাজধানীর ফুটপাতের দোকানগুলো। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এমন বিভিন্ন হাঁকডাকেই ব্যস্ত ফুটপাতের হকাররা। পায়ে হাঁটা মানুষগুলোর পাশাপাশি কার-মাইক্রোবাসে করেও অনেকে আসছেন ফুটপাতের দোকান থেকে শীতের পোশাক কিনতে। চোখ ধাঁধাঁনো বিলাসবহুল শপিংমলগুলোতে স্বল্প আয়ের মানুষগুলোর যাওয়ার সাধ্য না থাকলেও ফুটপাতের এসব শীতের পোশাকে অসন্তুষ্টি নেই তাদের। বরং অনেকটা আনন্দ নিয়ে নেড়েচেড়ে বেছে বেছে নিজের সাধ্য অনুযায়ী পছন্দ করে কিনছেন শীত নিবারণের পোশাক।

রাজধানীর পলওয়েল সুপার মার্কেট, গাজী বিপণিবিতান, ইস্টার্ন প্লাজা, বসুন্ধরা সিটি, এলিফেন্ট রোড, যমুনা ফিউচার পার্কের দোকানগুলোতে বয়সভেদে ক্রেতাদের জন্য নানা রকমের শীতের কাপড়ের সমাহার দেখা যায়। কিন্তু মধ্যবিত্তদের ভরসা ফুটপাতেই। বাচ্চা, বুড়ো আর শিক্ষার্থীরাও হুমড়ি খেয়ে পড়েন এসব দোকানে। নিম্নআয়ের যারা তারাই বেশি হকার্স মার্কেট আর ফুটপাতের কাস্টমার। কেউ নিজের জন্য কিনছেন, আবার কেউ কিনছেন গ্রামে থাকা পরিবারের সদস্যদের জন্য।

মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশের পছন্দ নিউমার্কেট। এখানে হুডি থেকে শুরু করে জ্যাকেট, শাল, গেঞ্জি পাওয়া যাচ্ছে তুলনামূলক কম দামে। স্বল্পমূল্যেই ফুটপাতের এসব দোকানে পাওয়া যাচ্ছে শীতের ব্লেজার, জ্যাকেট, কোট, সোয়েটার, চাদর, মাথার টুপি, কানটুপি, হাতমোজা, মোজা, গলাবন্ধ ইত্যাদি। গুলিস্তান হকারস মার্কেটের সামনের ব্যবসায়ী নাজিম উদ্দীন বলেন, ‘ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্যই সুর করে তাদের ডাকার পদ্ধতিটি বেশ কাজে আসছে। এখানে ৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে মোটামুটি উন্নতমানের শীতের পোশাক পাওয়া যাচ্ছে।’

পল্টনের বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ মার্কেট ও মসজিদের সামনের দোকানগুলোতে এসেছে কম্বল, সোয়েটার, চাদরসহ বিভিন্ন শীতের পোশাক। বিশেষ করে শিশুদের জন্যেও শীতের বাহারি পোশাক উঠতে শুরু করেছে।

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ মার্কেটের কম্বল ও চাদর বিক্রেতা রাজু বলেন, ‘আমাদের কম্বল চায়না, কোরিয়া, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। এ ছাড়া কাশ্মীর থেকেও চাদর আমদানি করা হয়। এসবের পাশাপাশি দেশীয় কম্বল ও চাদরও আছে আমাদের দোকানে। এসব কম্বলের দাম ২ থেকে ১০ হাজার টাকা। আর চাদরের দাম ৫০০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যাবে। খুচরার পাশাপাশি আমরা পাইকারিও বিক্রি করে থাকি।’

নিউমার্কেটের প্রধান গেটের সঙ্গে বসা দোকানদার আমিনুল বলেন, ‘শীত তো এখনো আসেনি, তাই ক্রেতাও কম। এখন কিছু সোয়েটার, ট্রাউজার বিক্রি হচ্ছে। বিকেলের দিকে অফিস ফেরত কিছু মানুষ কিনছেন এসব কাপড়।’

রাজধানীর গুলিস্তানের ফুটপাতে কাপড় কিনতে আসা জাকির হোসেন তার দুই মেয়ে আর ভাগ্নে-ভাগ্নির জন্য শীতের কাপড় দেখছিলেন। কিন্তু দাম মেলাতে না পেরে ফিরেই যাচ্ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত দোকানদারের হাতে ৫টি সোয়েটারের দাম হিসেবে চারশ’ টাকা গুঁজে দিলেন তিনি। অথচ দোকানদার পাঁচটি সোয়েটারের দাম হেঁকেছিলেন ১২শ’ টাকা। জাকির হোসেন বলেন, ‘স্বল্প আয়ের মানুষ আমরা। ভালো কিছু কাপড় পাওয়া যায় এসব ফুটপাতে। শেষ ভরসা ফুটপাতের দোকান।’ এখানে হুডি, জ্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়। গেঞ্জির দাম ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। চাদর ১০০ থেকে ৩০০ টাকা।

নূরজাহান মার্কেটের সামনে এবং সাইন্সল্যাব মোড়ের ফুটপাতে পাওয়া যাচ্চে দেশীয় তৈরি এবং বিদেশ থেকে আমদানিকৃত শাল বা চাদর। দাম পড়বে ৫০০ থেকে ৫০০০ টাকা। আর শিশুদের পোশাক কেনা যাবে ৩০০-২০০০ টাকায়। বড়দের জন্য রয়েছে পাতলা সোয়েটার, ফুলহাতা টি-শার্ট, হুডি ইত্যাদি। দাম ৩০০ থেকে ১০০০ টাকা। নিউ মার্কেটের ফুটপাতে হুডি দেখছিলেন আকবর হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রতি শীতের আগে এখান থেকে আমি হুডি আর প্রয়োজনীয় শীত বস্ত্র কিনে নিয়ে যাই। মানের দিক থেকেও খারাপ নয় আর দামের তো সাশ্রয় আছেই। আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের ভরসা একমাত্র ফুটপাতেই।’ স্বল্পমূল্যেই ফুটপাতের এসব দোকানে পাওয়া যাচ্ছে শীতের ব্লেজার, জ্যাকেট, কোট, সোয়েটার, চাদর, মাথার টুপি, কানটুপি, হাতমোজা, মোজা, গলাবন্ধ ইত্যাদি।

যেখান থেকে আসে শীতের পোশাক: রাজধানীর ফুটপাতে বা হকার্স মার্কেটে কম টাকায় চকচকে যে পোশাক কিনে নিচ্ছেন আপনি, সেটি কি নতুন না সেকেণ্ডহ্যান্ড বোঝার উপায় নেই। নূরজাহান মার্কেটের এক ব্যবসায়ী জানান, বঙ্গবাজার, হকার্স বা ফুটপাতের কোনো শীতের পোশাকই নতুন নয়। ৯০ শতাংশ পোশাক আসে দেশের বাইরে থেকে। তাইওয়ান, ফিলিপাইন, চীন, হংকং, জাপান, সৌদি আরব, কুয়েত, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ডসহ আরো অনেক দেশ থেকে আসে এই পোশাক। তাদের ব্যবহৃত পোশাকটি ড্রাইওয়াশ করে বাংলাদেশে নিয়ে আসে একশ্রেণির হকার।

চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস হওয়ার পরে পাইকারি বাজারের মাধ্যমে হকার হয়ে এই পোশাক চলে আসে ক্রেতার হাতে। রাজধানীর ফুটপাতে প্রায় ১০ হাজার শীতের পোশাক বিক্রেতা রয়েছেন। প্রতিদিন সকালে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে পাইকারি বা নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হয় শীতের পোশাক। নিলামের মাধ্যমে ১০ হাজার, ১৫ হাজার, ২০ হাজার টাকা দরে প্রতিগাইট শীতবস্ত্র ক্রয় করেন হকাররা। প্রতি গাইটে ৪০০ থেকে ৫০০টি কাপড় থাকে। সেগুলো বাছাই করে ভালোগুলো বিক্রির জন্য প্রদর্শন করা হয়।

মধ্যবিত্তরা যেখানে পাবেন সস্তা দামের শীত পোশাক: রাজধানীর সদরঘাট, মতিঝিল, পুরানা পল্টন, বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে, বঙ্গবাজার, নীলক্ষেত, খিলক্ষেত, নিউমার্কেট, হকার্স মার্কেট, নূরজাহান, মৌচাক, মালিবাগ, ফার্মগেট, মিরপুর, গাবতলী, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, বাড্ডা, রামপুরাসহ বেশ কিছু স্থানে শীতের পোশাক বিক্রি করা হয়। এ ছাড়াও ফুটপাতের বিভিন্ন জায়গায় খণ্ডকালীন শীত পোশাক বিক্রি করেন হকাররা।

জুতাও কিনতে পারেন শীতের জন্য: শরীরের সবকিছু গরম কাপড়ে আবৃত থাকলেও বাদ পড়ে যায় পায়ের অংশটুকু। তাই শরীরের পোশাকের সঙ্গে মানানসই জুতা, কনভাটর্স, কেটর্স, সু, লেপার্টসহ বিভিন্ন ডিজাইনের জুতা কিনতে পারেন ফুটপাত থেকে। নিউমার্কেট, গুলিস্তান, পল্টন, মতিঝিল, মালিবাগ মোড়, বসুন্ধরা সিটির সামনে, ফার্মগেট, মিরপুরসহ আরো কিছু স্থানে রয়েছে ফুটপাতে জুতার বিশাল সরবরাহ। সর্বনিম্ন ১৫০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকার মধ্যে কিনে নিতে পারেন পছন্দের পাদুকাটি।

মানবকণ্ঠ/এসএস