ফিটনেসবিহীন গাড়ির অপসারণ প্রয়োজন

ফিটনেসবিহীন গাড়ির অপসারণ প্রয়োজন

অসম্ভব রকম যানজট সৃষ্টির পাশাপাশি রাজধানীর পরিবেশ দূষণেও অন্যতম ভূমিকা রাখছে ফিটনেসবিহীন নিম্নমানের যানবাহন। অধিকাংশ গণপরিবহন কোম্পানির বিআরটিএ থেকে নেয়া গাড়ি চলাচলের বৈধ কাগজ থাকলেও নেই পরিবহনের ফিটনেস। ইঞ্জিনের বিকট শব্দে অস্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টির পাশাপাশি কালো ধোঁয়াও নির্গমন করে চলছে এসব পরিবহন। গাড়িগুলোর সাইলেন্সারে কোনো প্রকার ধোঁয়া ফিল্টারের ব্যবস্থা না থাকায় দূষিত হচ্ছে রাজপথ। রাজপথে মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে ফিটনেসবিহীন কিছু গাড়ি ধরা হলেও সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হচ্ছে না। কখনো জেল-জরিমানা করে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে কিন্তু কমছে না এই দূষক গাড়িগুলোর দৌরাত্ম্য। যার ফলে রাজধানীতে ক্রমাগত বায়ু দূষণ বেড়েই চলছে। পরিবহন মালিকেরা এজন্য ভেজাল জ্বালানিকে দায়ী করছে। পরিবেশ অধিদফতরের এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্টের তথ্যানুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ লাখ যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করে। মোটরযান চলাচলের প্রধান সড়কগুলো আবাসিক এলাকা সংলগ্ন হওয়ায় এসব এলাকার লোকজন উচ্চহারে বায়ু দূষণের শিকার হচ্ছে। সবচেয়ে অরক্ষিত গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে পথচারী, ফেরিওয়ালা, দোকানদার, ট্রাফিক পুলিশ ও গাড়িচালকরা।

ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো নিয়ন্ত্রণ করা দুরূহ হওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে রাজপথে, ক্ষতি হয় জনসাধারণের জান এবং মাল। শহরের দূষণের তালিকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়িসহ অন্যান্য যানবাহনের একটি বিরাট অংশ বায়ু দূষণের মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। এসব নিম্নমানের মোটরযান থেকে ক্ষতিকর বস্তুকণা যেমন: কার্বন মনোক্সাইড, কার্বনডাই অক্সাইড এবং ওজোন নির্গত হচ্ছে। এছাড়াও ফিটনেসবিহীন মোটরযানগুলো রাজপথের পরিবেশকে ধূলিময় করে তোলে যা মানব স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গবেষণা সংস্থা ‘হেলথ ইফেক্টেস ইনস্টিটিউট’ এবং ‘ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন’-এর যৌথ পরিচালিত বৈশ্বিক বায়ু দূষণ পরিস্থিতি ২০১৭-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, বায়ু দূষণের কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়।

এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট রাজধানীতে চলাচলকারী যানবাহনের ওপর ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নগরীর ১৩টি পয়েন্টে বিভিন্ন যানবাহনের ওপর একটি সমীক্ষা করে। এই সমীক্ষায় ৪৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ একতলা বাস, ৫৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ টাটা বাস, ৬০ দশমিক ২০ শতাংশ মিনি বাস, ৫০ শতাংশ মাইক্রো বাস ও জীপ, ৯০ শতাংশ পিকআপ ও মিনি কাভার্ড ভ্যান, ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি বায়ু দূষণ করছে বলে মন্তব্য করা হয়। উল্লেখ্য যে, ২০০৪ সালের পর থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত যানবাহনের ওপর বড় কোনো সমীক্ষা করা হয়নি। রাজধানীতে চলাচলকারী যানবাহনগুলো প্রধানত ৩ ধরনের জ্বালানি যথা: ডিজেল, পেট্রোল ও সিএনজি ব্যবহার করে। ইঞ্জিন ডিজাইনে ত্রুটি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা, মানসম্মত জ্বালানি ও লুব্রিকেন্ট ব্যবহার না করা এবং ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য বহন করার কারণে বায়ু দূষণ হচ্ছে। নিম্নমানের জ্বালানি দহন বায়ুতে নিঃসরিত হচ্ছে অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম ২.৫। কর্মকর্তারা আরো বলেন, সূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম ২.৫ নিঃসরণ কমানোর জন্য গাড়িকে প্রতি ঘণ্টায় কমপক্ষে ৬০ কিলোমিটার বেগে চলতে হবে। কিন্তু যানজটের এই নগরীতে এত গতিতে গাড়ি চালানো প্রায় অসম্ভব।

ডিজেল নিঃসরণে যেসব দূষক পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন, জৈব বিষ- পলি নিউক্লিয়ার এরোমেটিক্স। পেট্রোল, অকটেন ও সিএনজি চালিত যানবাহন থেকে নিঃসরিত দূষণকারী পদার্থের মধ্যে রয়েছে আইডল কার্বন মনো অক্সাইড, আইডল হাইড্রোকার্বন- এসব বস্তুকণার কারণে মানবদেহে ক্যান্সার, হৃদরোগ, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাস ইত্যাদি রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।

পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যে জানা যায়, রাজধানীতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে, এ সময়ে যতগুলো যানবাহন পরীক্ষা করা হয় তার বেশিরভাগই পরিবেশ দূষণকারী হিসেবে ধরা পড়ছে এবং এজন্য মামলাও হচ্ছে। সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকের জ্বালানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১১ সালে ঢাকার বায়ু দূষণের জন্য যানবাহন দায়ী ছিল ১০ শতাংশ।

নরওয়েভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনআইএলইউ-এর সহায়তায় সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ঢাকা শহরের বায়ুর গুণগত মানের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের শুধু গাড়ির ধোঁয়া থেকে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ টন বস্তুকণা পিএম ২.৫ বাতাসে ছড়াচ্ছে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্যমতে, ঢাকার বাতাসে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সালফারডাই অক্সাইডের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে এবং এর অধিকাংশ এসেছে নিম্নমানের যানবাহন থেকে। ঢাকা শহরের নিম্নমানের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে প্রশাসন কাজ করছে, পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করে ঢাকা শহরের বায়ু দূষণকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে মোটরযানের বিকল্প হিসেবে বাইসাইকেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
– লেখকদ্বয় : স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতায় ও গবেষণায় সংযুক্ত

মানবকণ্ঠ/এসএস