ফারহানা রহমানের কবিতা

আমাকে তুমি লাবণ্য করে রেখো

আমি লাবণ্য হতে চেয়েছিলাম।
বালিয়াড়ি বাঁধের কোনায় এক ঠোঙা বাদাম হাতে দাড়িয়ে অনন্তকাল চেয়ে থাকবো।
কুসুম বনের ভিতর দিয়ে ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া সুখের ছোট্ট সেই সময়রেখা।
যতই দূরহ চড়াই উৎরাই পথ পার হতে হয় হোক!
আগুনলাগা সেই সব দিনগুলোয় ।
সুখের বারান্দা জুড়ে সূর্যাস্তের লাল আভা মাখা সন্ধ্যায়।
ধ্রুপদী নৃত্যের মায়াবী জালে জড়িয়ে থাকা তুমুল স্বপ্নগুলো। ফিরে ফিরে আসুক !
আমি আসলে লাবণ্যই হতে চেয়েছিলাম।
চারুশিল্পের অদৃশ্য কোন ছোঁয়ায় সিক্ত হয়ে ছিল আমার হৃদয়।
আকাশমণির শত শত তারাফুলের মাঝে একটি চন্দ্রমল্লিকা হতে দিও আমায়।
আমাকে নিত্যদিনের ব্যবহার্য ঘড়ায় তোলা জল কেতকী করোনা কখনো। আমি লাবণ্যের মত দীঘি হবো।
তোমার মন যখন খুশী সাঁতার কাটবে তাতে।
আমি লাবণ্য হবো।
আমাকে তুমি লাবণ্য করে রেখো।
***

বাক্সবন্দী জীবন

সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অব্দি পবিত্র আগরবাতি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দাও –
কবিতার খেরোখাতা, শব্দবোঝাই অথচ মূল্যহীন হয়ে পড়া সমস্ত বইপত্র। কালি, কলম আর কালির দোয়াত
ফুঁৎকারে নিভিয়ে দাও যুক্তি ও বিজ্ঞান। ঈশ্বরের চেয়েও শক্তিধর তোমরা
তোমাদের অভিশপ্ত নিঃশ্বাসের গনগনে আগুনে অঙ্গার করো আমাদের নশ্বর জীবন।
অথচ আসমানের বেহেস্ত আজ কত শান্ত- শীতল হয়ে আছে। শুধু তোমাদের দুচোখে, শিরায়- উপশিরায় বয়ে বেড়াও উন্মুক্ত ক্রোধ
কেন এভাবে বদলে দিচ্ছো এই প্রাচীন সজীব পৃথিবীর চিরচেনা মুখাকৃতি ? তৈরি করছো মহামারীতে আক্রান্ত এক বিকৃত মুখ!
অর্থহীনতার এক মহাপরিণামে ভেসে যায় আমাদের জীবন্ত জীবন
উধাও হয়ে যায় সমস্ত তীক্ষ্ণ অনুভূতিগুলো। পুঞ্জ পুঞ্জ অসহায়ত্বের আঁধারে
ছিন্নভিন্ন করা মানুষের রক্তে ধুয়ে যাক সমস্ত জনপদ। তবে তাই হোক!
সমস্ত আশা আর নির্মল স্বপ্নগুলো আজ থেকে শুধু বাক্সবন্দি হয়ে থাক!
***
হেমন্তের সেই বিকেলে

হেমন্তের রোদেলা একটি বিকেলে
মাটি আর সূর্যের অপার্থিব প্রেমের ছায়াময়তা,
আহা প্রেম!
এতো গভীর অথচ বিষণ্ণ !
পলকহীন দৃষ্টিতে বেভুল চেয়ে থাকা
নৈশব্দের মাঝে কী আকুল ডুবে থাকা;
এক গোছা কাশফুল খুঁজে পেতে বনভুমির গহীন কোন পথে –
নদীর খুব কাছে চলে আসা
টলমলে স্বচ্ছ সে জলে অচেনা সুবাস
মুহুর্মুহু শব্দের বর্ষণ ঢেউ থেকে ঢেউ এ
তোমার অবিরাম ক্লিক ক্লিক স্নেপ
চেয়ে দেখার মুগ্ধতায় অস্থিরতা আনে।
আমার স্বপ্নালু মনে চুইয়ে চুইয়ে কষ্টেরা জমে
দেহমনে শেকড়ের বেদনার ছোপ ছোপ ছাপ ,
অমিলগুলো জালের দেয়াল হয়ে উঠতে চায়।
বাতাসে প্রশ্নের আনাগোনা ;
এসবই নিছক অলীক স্বপ্ন নয় তো!
চাইনা মিথ্যার কাঁটার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হতে
চাইনা কোন গোপন ঘৃণা অনুসরণ করুক আমার অথবা তোমার চেনা স্বপ্নগুলোকে।
এই চলে যাওয়া আর বারবার ফিরে ফিরে আসা
দূর থেকে উম্মুক্ত জীবনের পানে চেয়ে থাকা
বড় কষ্টের !
আমাকে গ্রাস করে তীব্র বেদনার নীল;
যেভাবে গ্রীষ্মের দিন গ্রাস করে নেয় উম্মাতাল আলো
এভাবেই আলোর পাপড়িরা নুয়ে আসে সাঝের বেলায় ।