ফর্দ

ফর্দ

আলু ২ কেজি
তেল ২ লিটার…
এ পর্যন্ত লিখেই থামে বীণা। ‘তেল লিখলে কি তেল আনবে ঠিক আছে?’
কেটে লিখে: সয়াবিন তেল-২ লিটার। আবারো কাটে। লোকটার বুদ্ধিসুদ্ধি কিছু আছে নাকি? গতবার আনারস ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল এনেছিল! ‘আপনিই বলেন ভাই, আনারস সয়াবিন তেলের নাম শুনেছে কেউ কোনোদিন!’

আমি না সূচক মাথা নাড়ি।
এবার বীণা লেখে
**চাদা সয়াবিন তেল দুই লিটার।
লিস্টটা একটু বেশি দীর্ঘ হয়ে গেল নাকি? এমনিতেই মাসের অর্ধেক পেরিয়ে গেছে।
বারবার চোখ বুলিয়েও কাটবার কিছু পেল না সে। বরং নিজের হাতের লেখা দেখে একটু বিরক্তই লাগল।
স্কুলে থাকতে হাতের লেখা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে একটা টিফিন বক্স পেয়েছিল বীণা।
আহা! কি যত্নে যে রেখেছিল টিফিন বক্সটাকে। আর এখন হাতের লেখার কি শ্রী! বিশ্রী।
‘আপনার হাতের লেখা কেমন, ভাই?’

আমি কোনো কথা না বলে বিষয়টা চেপে যাই। কারণ, ছেলেবেলায় আমার হাতের লেখা দেখে বন্ধুরা বলতো, ‘তুই নিশ্চিত ডাক্তার হবি!’
হঠাৎ বাতাসে পর্দা উড়ে এসে আলতো ছোঁয়াতে ফেলে দেয় ফ্রেমে বাঁধানো একটা ছবি। দশ বছর আগে বীণা আর তামিম কি সুখেই না ছিল!
ছোট ছোট গাল ফোলানো, চোখ রাঙ্গানো আবেগ ছিল, মান ছিল, ছিল মান ভাঙ্গানোর নতুন নতুন কৌশল। কেমন জানি জীবনটা একঘেঁয়ে হয়ে গেছে গত ক বছরে।

কত চিঠি জমে আছে আলমারির ওপরে রাখা ব্রিফকেসে। চিঠি লেখার আবেগটাও মনের ব্রিফকেসে আটকা পড়ে আছে বছরের পর বছর!
‘জানি, দিন ফেরে না। তার বদলে স্মৃতিকে পাঠায় মনের দড়জায়। বারবার কড়া নাড়ে আর মনটাকে বিষন্ন করে দেয়। কিছু একটা করুন না, ভাই। সেই আবেগ আমার চাই ই চাই’

‘আমি কি করব!’ মনে মনে বলি আমি। পরক্ষণেই মনে হয়। যা করার সে তো আমাকেই করতে হবে। বীণার গল্পটা যে আমারই লিখতে হবে। ওরা তো আমারই তৈরি চরিত্র।

বীণার একলা চিন্তার আকাশটাকে একটা গলা খাকারি দিয়ে ভেঙ্গে দিলাম। বললাম, ‘লেখ না চিঠি। আজই লেখ। তবে ডাকে বা কুরিয়ারে নয়…’
কথাটা শেষ না হতেই বীণা প্রবল উৎসাহে বলে উঠল, ‘ফর্দে লিখি?’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘মানে!’

-‘অত মানে-টানে আপনার বোঝার দরকার নেই। ফর্দের অপর পাতায় লিখব ছোট্ট একটা চিঠি। আমার মনের কোণে জমে থাকা চিঠি’
এ ব্যাপারে বাধা দিতে গেলে মার-টারও খেয়ে বসতে পারি। তাই চুপ থাকলাম।
সিনেমার নায়িকাদের মত ১০০ বার লিখে আর কেটে কাগজ দলামোচা করে চিঠি লেখার পাত্রী বীণা নয়।
একটানে, এক নিঃশ্বাসে লিখেই ফেলল ‘ফর্দপত্র’

প্রিয় রোবট,
অনেক ভালবাসি। চলো ব্যস্ততার ধুলো মুছে আগের মতো আবেগে স্নান করি। প্রথমদিনের মতো একটা লাল গোলাপ এনো কিন্তু!
-ইতি তোমার বীণ

ছোট্ট পরিসরে সব আবেগ যেন উপচে পড়ল। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম বীণার চোখে ছলকে উঠেছে জল।
তামিম সবসময়ই ব্যস্ত। তাড়াহুড়ো করে ফর্দটা নিয়েই নেমে গেল। বাজারের ব্যাগটাও নিল না। কবেই বা নিয়েছে। এ নিয়ে প্রায় শ’খানেক ব্যাগ বাসায় জমেছে। প্রতি বাজার ডে তে নতুন ব্যাগ।

তামিমকে রোবট বলার ১০১ টা কারণ আছে বীণার কাছে। এর মধ্যে একটা হলো আধা ঘন্টায় কিভাবে বাজার শেষ করে একটা মানুষ!
ঘামে ভেজা তামিম দৌঁড়ে ছুটে যায় বেডরুমে। এসির টানে।
আর বীণা পাগলের মতো বাজারের ব্যাগে খুঁজতে থাকে লাল গোলাপ। নেই। নেই মানে নেই। মুহূর্তে কালো মেঘ নামে পুরোটা বীণা জুড়ে।

সপ্তাহখানেক পর আবার বাজার। আবারো ফর্দ।
আবারো চিঠি-

রোবট,
রাগ করেছি। ভাবতেও পারি নি তুমি গোলাপ ছাড়া বাসায় ঢুকবে। আজ এনো কিন্তু
-বীণা।

তামিম ফেরে। বাজারের নতুন ব্যাগও আসে। আসে না গোলাপ।

পরের সপ্তাহে-
তামিম,
ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গেছ। আজ মান ভাঙ্গানোর শেষ একটা সুযোগ দিলাম। এদিনও নতুন কিছু হয় না। মাঝখান থেকে তামিম অবাক বিস্ময় নিয়ে বীণাকে জিজ্ঞেস করে, ‘রাগ করে আছো কেন? বাসায় এসে দুদণ্ড শান্তিও পাব না!’
বীণার অভিমান বড় শক্ত। একটা শব্দও উচ্চারণ করে না। শুধু তামিম চোখের আড়াল হলে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে চোখ থেকে।
এবারের বাজারের দিনটা অন্যরকম। কেমন যেন গুমোট পরিবেশ! ছোট্ট এক বাজারের ফর্দ
চাল- ৫ কেজি
মুরগি- ২টা

তামিম বাজারে গিয়ে ফর্দ দেখে অবাক! ব্যাস! এটুকুই! আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘অবস্থা দেখছেন, ভাই? সে কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করে?
এটা কি ধরনের ফর্দ
খুব মন চাচ্ছিল বলে দেই চিঠির কথা।
চুপ থাকলাম। গল্পের লেখকদের এ অভ্যাস না রাখাই ভালো!
তবে, আমি না বললে কি হবে! প্রকৃতির বিচার আছে না! সব সময় তাড়াহুড়ো করা তামিম আজ মনের অজান্তেই উল্টে বসে ফর্দের পেছনের পাতাটা। লেখা-
এ নিয়ে চারবার চিঠি লেখলাম। এত অবহেলা! তোমার লাল গোলাপও চাই না। সংসার, ভালবাসা কিচ্ছু চাই না। চললাম আমি।
তামিমের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার হয়ে আসে। ওর মুখ দেখেই বুঝে নিতে কষ্ট হয় না। আগের চিঠিগুলো পড়েনি সে। একহাতে মোবাইলটা নিয়ে উন্মাদের মতো কল করতে থাকে একের পর এক। সংযোগ মিলছে না। অন্যহাতে পকেট হাতড়ে চলে। যদি খুঁজে পায় আগের কোন ফর্দ!
শুক্রবারের ভিড়ভাট্টার বাজারেও একাকীত্ব ঘিরে ধরে তামিমকে।

চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘ভালবাসি বীণ। বিশ্বাস করো আগের চিঠিগুলো চোখে পড়েনি। ফোনটা একবার ধর। ১ লাখ গোলাপ বিছিয়ে দেব তোমার চলার পথে।’
হঠাৎ রেশ কাটে মুরগিওয়ালার ডাকে, ‘ও স্যার, গিলা-কলিজা কি দেব না থাকপে?’

পাঁচ কেজি চাল, ২টা মুরগি, অজানা ভবিষ্যৎ আর পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ফর্দ হাতে নিয়ে বাসার পথে পা বাড়ায় তামিম… বীণার রোবট।

মানবকণ্ঠ/এসএস