ফরাসি বিপ্লব না ক্রোয়েট জাদু

আগেও বিশ্বকাপের মঞ্চে শিরোপা উঁচিয়ে ধরার সৌভাগ্য হয়েছে ফ্রান্সের। ২০ বছর পূর্বে। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার হাত এখনো শূন্য। ফুটবলের বিশ্ব দরবারে কখনোই শিরোপা স্বাদ পাওয়া হয়নি তাদের। এবার সেই আক্ষেপ ঘুচানোর দ্বারপ্রান্তে জুাটকো ডালিচের শিষ্যরা। অপেক্ষা কেবল মাত্র একটি জয়ের।

ওই অপেক্ষা ঘুচাতে আজ মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে লুকা মদ্রিচের দল মুখোমুখি হবে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যদের। তাই আপাতত প্রশ্ন একটাই, ফরাসি বিপ্লব নাকি ক্রোয়েট জাদু? যা নিশ্চিত হওয়া যাবে ফাইনাল ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর। আর তাতে থেমে যাবে রাশিয়ায় শুরু হওয়া অস্ত্রহীন বিশ্বযুদ্ধ।

চার বছরের জন্য থমকে যাবে বিশ্বকাপ ঘিরে জেগে উঠা ফুটবল জ্বর। ১৪ জুন রাশিয়ায় পর্দা ওঠে ফিফার ২১তম বিশ্বকাপ আসরের। দেশটির ১১ শহরের ১২ ভেন্যুতে ৩২ দলের ৬৪ ম্যাচে সেজে ওঠা রঙিন আসরটি শেষ হবে আজকের ফাইনাল দিয়ে। রোমাঞ্চকর এক ম্যাচ দিয়ে ৩২ দিনব্যাপী আয়োজিত ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চের পর্দা এখন নামার অপেক্ষায়। যেমনটা দেখা মেলেছে শুরু থেকেই। উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিকরা ৫-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছিল সৌদি আরবকে। এরপর প্রথম রাউন্ডে জার্মানির ছিটকে যাওয়ার ঘটনা। দ্বিতীয় রাউন্ডে একই রাতে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে হারানোর বেদনা। শেষ আটে ব্রাজিলের ‘হেক্সা মিশনের’ মৃত্যু। এমন অঘটনের বিশ্বকাপ শেষ হবে রোমাঞ্চ ছাড়া! তা কি করে হয়। হওয়ারও কথা নয়।

সবাইকে চমকে দিয়ে ফাইনালে ওঠা ফ্রান্স এবং ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার লড়াই আপাতত আভাস দিচ্ছে এমন কিছুই। বিশেষ করে ক্রোয়েশিয়া। ফিফার বড় আসরে এখন পর্যন্ত দলটির সেরা সাফল্য ১৯৯৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলা। কিন্তু রাশিয়ায় মারিও মানজুকিচ এবং ইভান পেরেসিচদের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স ক্রোয়েটদের দেখাচ্ছে নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন। কেননা, গ্রুপপর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়নদের ফাইনালে ওঠার পথটা ছিল না মোটেও সহজ। দ্বিতীয় রাউন্ডে পার করতে হয়েছে ডেনমার্কের বাধা এবং কোয়ার্টার ফাইনালে হারাতে হয়েছে দেশের মাটিতে জ্বলে ওঠা রাশিয়াকে। যদিও ওই দুই ম্যাচে ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছে তারা। দুটো ম্যাচই জিতেছে টাইব্রেকারে।

তবে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের শক্তির জানান দিতে ভুল করেনি ডালিচের শিষ্যরা। থ্রি লায়ন্সদের বিপক্ষে পঞ্চম মিনিটে পিছিয়ে পড়েও স্থাপন করেছে ঘুরে দাঁড়ানোর দৃষ্টান্ত। এবার আর ভাগ্যের সাহায্য লাগেনি তাদের। দ্বিতীয়ার্ধে দলকে সমতায় ফেরান পেরিসিচ এবং অতিরিক্ত সময়ে মানজুকিচের গোলে হাতে পায় স্বপ্নের ফাইনাল খেলার টিকিট। সেই স্বপ্নের ম্যাচ শেষ বিজয় কেতন উড়ানোর লক্ষ্য নিয়েই ফরাসিদের মুখোমুখি হবে ক্রোয়েশিয়া। জীবনের সেরা খেলাটা খেলতে চাইবেন মদ্রিচও। কারণ শিরোপা জয়ের আক্ষেপ ঘুচানোর পাশাপাশি গোল্ডেন বল হাতিয়ে নেয়ার হাতছানিও রয়েছে ক্রোয়েট অধিনায়কের সামনে।

মদ্রিচের ওই দুই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ডালিচের রক্ষণভাগকে থামাতে হবে কিলিয়ান এমবাপেকে। কেননা, ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয়ী ফ্রান্সকে দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্নটা দেখাচ্ছেন ১৯ বছর বয়সী এই বালক। ফাইনালে ওঠার আগে পিএসজির এই তারকা একাই ভাঙন ধরিয়েছেন আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে এবং বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী দলগুলোর রক্ষণভাগে। তার গতি আর পায়ের জাদুতে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে ফুটবল বিশ্বের তিন পরাশক্তি। এখন শেষ বাজিটা জয়ের অপেক্ষায় এমবাপে। লুঝনিকিতে উঁচিয়ে ধরতে চান শিরোপা, যা ইতিমধ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে জানান দিয়েছেন মোনাকোর সাবেক এই ফরোয়ার্ড। আর এমনটা হলে শেষতক মদ্রিচকে হটিয়ে গোল্ডেন বলেও নাম লেখাতে পারেন তিনি!

তবে দুই দলের দুই তারকার সামনে এই মুহূর্তে লড়াইটা শ্রেষ্ঠত্বের। ব্যক্তিগত খেতাবের নয়। দুই তারকাই চান দলকে শিরোপার স্বাদ পাইয়ে দিতে। সেই ছাপটা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে ফাইনালের আগে ফ্রান্স এবং ক্রোয়েশিয়ার অনুশীলনে। যদিও বাড়তি চাপ নিচ্ছেন না কেউই। তবে একটু পর পরই দেখা গেছে কোচ আর খেলোয়াড়দের একত্রিত হওয়ার ঘটনা। লক্ষ্য হয়তো একটাই, কীভাবে পরিকল্পনা মাফিক খেলে আটকে দেয়া যায় প্রতিপক্ষকে। অনুশীলন শেষে প্রত্যাশা ব্যক্ত করতেও দুই দল ছিল কৌশলী। জয়ের প্রত্যাশা করেছে সবাই। কিন্তু ভুল করেনি প্রতিপক্ষকে সমীহ আর সম্মান জানাতে।

এদিকে আজকের ম্যাচে প্রতিশোধ নেয়ার ভালো একটি সুযোগ পাচ্ছে ক্রোয়েশিয়া। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে প্রথমবারের মতো ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলেছিল তারা। ওই আসরের স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে হারতে হয়েছিল ২-১ ব্যবধানে। এরপর আজ দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে দেখা হবে দুই দলের। অর্থাৎ ২০ বছর আগে ফাইনালে ওঠার স্বপ্নভঙ্গের প্রতিশোধ নেয়ার সামনেই ডালিচের শিষ্যরা। যদিও ইতিহাস পক্ষ নিচ্ছে না তাদের। কারণ ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে এখন পর্যন্ত অপরাজেয় ফ্রান্স। দেশের মাটিতে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জয়ের পর আরো চারবার ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল ফ্রান্স। জিতেছে দুটো এবং বাকি দুই ম্যাচ হয়েছে ড্র।

তবে ভুলে গেলে চলবে না, এটা রাশিয়া বিশ্বকাপ। যেখানে ইতিমধ্যে ঘটে গেছে অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। দেখা মেলেছে বহু রোমাঞ্চকর ম্যাচের। তাই ইতিহাস আগলে বসে থাকলে চলবে না। থাকতে হবে ফাইনাল শেষের অপেক্ষায়। যেখানে ফ্রান্স এবং ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল তারকাদের পায়ের জাদু মিলিয়ে দেবে সব ধাঁধা। বিশ্বকাপও খুঁজে পাবে এবারের চ্যাম্পিয়নকে।

মানবকণ্ঠ/এএএম