প্রয়োজন দেশীয় কৃষিভিত্তিক শিল্প

আমাদের দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ক্রমান্বয়েই বাড়ছে। অথচ আমাদের মানবসম্পদ বাড়লেও দক্ষতার দিক থেকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি যে হচ্ছে না, সবাইকে তা স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু দক্ষ মানবশক্তি ব্যতীত বিদেশ থেকে যেমন আশানুরূপ রেমিট্যান্স আনা সম্ভব হবে না, তেমনি দেশীয় প্রতিষ্ঠানে দক্ষ বিদেশিরা কাজ করে দেশের অর্থ বিদেশে নিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের দেশের শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। দক্ষ হিসেবে নিজেদের তৈরি করতে পারলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের যথেষ্ট সুযোগ ছিল। একদিকে দক্ষতার অভাব, অন্যদিকে দেশীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের বিদেশিদের নিয়োগে আগ্রহের কারণে প্রতিবছরই হাজার হাজার কোটি কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। ফলে দেশের শিল্প খাতের আশানুরূপ অগ্রগতি দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকারের উচিত, সংকট নিরসনে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া।

তবে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ধীরগতি ইতিমধ্যেই লাঘব হয়েছে। এখন বিদেশে কর্মী পাঠানোর অনুমতি যেমন মিলেছে, তেমনি বিদেশ গমনেচ্ছুদের যেন প্রতারণার শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে সরকারের জনসচেতনা বৃদ্ধির জন্য নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করায় ইতিবাচক ফলও পাওয়া যাচ্ছে। আবার দালালদের হাত ধরে অবৈধ পথে সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতাও অনেক কমেছে। আশা করা যায়, বৈধ পথে মানবসম্পদ রফতানির এ ধারা আরো গতিশীল হলে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার ঝুঁকি সহসাই কেউ নেবে না। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কর্মী প্রেরণের স্থবিরতার কারণেই অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি ছিল।

বাস্তবে যখন দেশের লাখ লাখ যুবক বেকার হয়ে অলস সময় কাটায়, তখন শুধু একটু কাজের আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিতেও ভয়-ভীতি থাকে না। ভয়-ভীতি না থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে, অনেককেই সাগরেই সলিল সমাধির শিকার হতে হয়। আবার ভাগ্যগুণে কেউ সাগর পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারলেও দালালদের প্রতারণার শিকার হয়ে বনে জঙ্গলে পালিয়ে থাকতে হয়। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কেউ কেউ ধরাও পড়ে। অনেকেই মনে করেন, অলস বসে না থেকে কাজ পেতে হলে জীবনের ঝুঁকি নিতেই হবে। এ ঘটনাই প্রমাণ করে আমাদের দেশের যুবশক্তির কর্মস্পৃহা অনেক বেশি। কিন্তু যুব শক্তিকে কাজে লাগানোর মতো সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি আমাদের নেই।

আমাদের দেশ মূলত কৃষিনির্ভর। কৃষির সমৃদ্ধি যেভাবে এসেছে, সেভাবে কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়নি। কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হলে দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে প্রচুর অর্থ আয় করা সম্ভব ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, নতুন করে কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান তো স্থাপিত হচ্ছে না, বরং স্থাপিত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতি, লুটপাটের শিকার হয়ে লোকসান দিতে দিতে এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যেমন- আমাদের দেশের উৎপাদিত চিনি এশিয়ার যে কোনো দেশের চেয়ে উন্নতমানের। আবার দেশে এখন আঁখ চাষ উপযোগী দো-আঁশ মাটির জমির পরিমাণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের নদ-নদীগুলো শুকিয়ে বিশাল বিশাল চরাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এসব জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে অতি উৎপাদনশীল আখ চাষ করা সম্ভব। এক সময় এ দেশের কৃষক আখ চাষ করে উপযুক্ত মূল্যের অভাবে আখ চাষ ছেড়েই দিয়েছিল। অথচ দেশীয় চিনি শিল্পকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব হলে উৎপাদিত চিনি দেশের ভোক্তা চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রফতানি করাও সম্ভব ছিল। অথচ দেশীয় চিনি কল বন্ধ করে বিদেশ থেকে চিনি আমদানির সুযোগ দেয়া হচ্ছে। অনুরূপ অবস্থা বস্ত্রশিল্প ও পাটকল শিল্পের ক্ষেত্রেও। দেশীয় বস্ত্রশিল্প বলতে গেলে প্রায় সবই বন্ধ। সে স্থান দখলে নিয়েছে চীন ও ভারতের তৈরি বস্ত্র। অথচ কৃষি বিজ্ঞানীরা পাটের আঁশ দিয়ে উন্নতমানের সুতা উদ্ভাবন করেছেন। যে সুতা দিয়ে উন্নতমানের বস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। যেহেতু আমাদের দেশের শ্রমিকের শ্রমের মূল্য এখনো অনেক কম, সেখানে উৎপাদিত পণ্যের মূল্যও কম হবে, এটাই স্বাভাবিক।

শুধুমাত্র জনকল্যাণমুখী পরিকল্পনার অভাব ও শ্রেণী স্বার্থের কারণে আমাদের বস্ত্রশিল্প ও পাট শিল্প ধ্বংসের মুখে।
যদিও বর্তমান সরকার পাট শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে পাটজাত পণ্য ব্যবহারে বাধ্যতামূলক নীতিমালা প্রণয়ন করে, তা বাস্তবায়নে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সেখানেও বিপত্তি! কারণ প্লাস্টিক, পলিথিন পণ্যের উৎপাদন বন্ধ না করলে দেশীয় পণ্যের ব্যবহারকে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। অথচ সোনার এই দেশটিতে কৃষিনির্ভর বহু প্রকারের শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থানের পথকে সম্প্রসারিত করা সম্ভব। তাহলে দেশের কর্মক্ষম কোটি কোটি হাতকে অলস বসে থাকতে হবে না। মনে রাখতে হবে, সময় কারো জন্যই অপেক্ষা করে না। কাজ না পেয়ে অলস বসে থাকলে কর্মক্ষম শক্তির সময় অপচয় যেমন হবে, তেমনি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের পথে বড় অন্তরায় হবে। আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের তালিকায় যাওয়ার যে স্বপ্ন দেখছি বাস্তবে কর্মসংস্থানের পথ সুগম করে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে না পারলে সে স্বপ্ন আদৌ পূরণ করা কঠিন। মোদ্দকথা, দক্ষ মানবসম্পদ, বেকারত্ব দূরীকরণ, দেশীয়ভাবে কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ, বিশেষ করে চিনিকল পাটকল, বস্ত্রকলকে পুনরুজ্জীবিতকরণ, সর্বোপরি দুর্নীতি, লুটপাট বন্ধ করা সম্ভব হলে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বসবাস উপযোগী সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ করা কঠিন কোনো কাজ হবে না।

লেখক : কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/আরএ