প্রার্থী শঙ্কায় আওয়ামী লীগ নিশ্চিন্ত বিএনপি

নওগাঁ জেলার রানীনগর ও আত্রাই দুই উপজেলা নিয়ে নওগাঁ-৬ ও জাতীয় সংসদের ৫১ নম্বর আসনটি গঠিত। আগামী একাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পদচারণায় মুখরিত এই নির্বাচনী এলাকা। এই আসনে মূলত ভোটের লড়াই হবে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীর মধ্যেই। প্রার্থী বাছাইয়ের দিক দিয়ে বিএনপি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও আওয়ামী লীগে রয়েছে একাধিক প্রার্থীর দৌড়ঝাঁপ।

নওগাঁ-৬ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৯ হাজার ৩৯৭ জন। গত ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এ আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন তৎকালীন বিএনপিদলীয় প্রার্থী আলমগীর কবির। ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আলমগীর কবির গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে আলমগীর কবির বিএনপি দল ত্যাগ করে এলডিপিতে দলে যোগ দেন। আলমগীর কবির বিএনপি দল ত্যাগ করার ফলে রানীনগর ও আত্রাই উপজেলার বিএনপি নেতাকর্মীরা এক সংকটময় সময় অতিবাহিত করে। বিএনপির সেই দুঃসময়ে দলের হাল ধরেন আলমগীর কবিরের ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আনোয়ার হোসেন বুলু। বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এ আসন ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দখলে আসে। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মো. আনোয়ার হোসেন বুলুকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন তৎকালীন ঢাকা মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইসরাফিল আলম। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবার নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগ: নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমপি ইসরাফিল আলম ছাড়াও দল থেকে আরো কয়েকজন আগামী নির্বাচনে এ আসনে মনোনয়ন চান বলে জানা গেছে। তারা হলেন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলী, নওগাঁ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক সুমন, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহীন মনোয়ারা হক, রানীনগর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন হেলাল।

মিডিয়ায় খুব পরিচিত নওগাঁ-৬ আসনের বর্তমান এমপি ইসরাফিল আলমের দলীয় অবস্থান বেশ ভালো। তিনি ২০০৮ সালে বিএনপিদলীয় প্রার্থী আনোয়ার হোসেন বুলুকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। পরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন ইসরাফিল আলম। তিনি গত ৯ বছরে এলাকার যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেশ ভালো অবদান রেখেছেন। নাগর নদীর ওপর দুটি ব্রিজ, আত্রাই নদীর ওপর একটি ব্রিজ, ছোট যমুনা নদীর ওপর দুটি ব্রিজ অত্র এলাকায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের উন্নয়ন হয়েছে। এ ছাড়াও তিনি রাস্তাঘাট ও শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। এ ছাড়া নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় পতিসরে অবস্থিত রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পতিসরকে জাতীয়ভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন। রানীনগর-আত্রাইবাসীর প্রাণের দাবি ছিল পতিসরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের। কিন্তু কোনোভাবেই সেই দাবি পূরণ হয়নি। তবে পতিসরে একটি কৃষি ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়েছে।

এসব উন্নয়নের পরেও ইসরাফিল আলম এমপির প্রতি অনেক প্রবীণ ও ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর ক্ষোভ রয়েছে। ত্যাগী ও প্রবীণদের মূল্যায়ন না করে নির্দিষ্ট কিছু নেতাকর্মীর দ্বারা পরিবেশিষ্ট থাকেন। তার বিরুদ্ধে অল্প সময়ে প্রচুর বিত্ত বৈভবের মালিক হওয়ার ব্যাপারেও ক্ষোভ রয়েছে।

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা নওশের আলী ২০০১ সাল থেকে নওগাঁ-৬ আসনের দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সামনে একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি এলাকায় বিভিন্ন দলীয় কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। তবে তিনি বাস করেন রাজশাহীতে।

নওগাঁ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক সুমন মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি সাবেক এমপি ওহিদুর রহমানের ছেলে। পেশায় একজন আইনজীবী। এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি জড়িত।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহীন মনোয়ারা হক ও রানীনগর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন হেলাল নওগাঁ-৬ আসনে মনোনয়ন পাওয়ার আশায় দৌড়ঝাঁপ করছেন।

বিএনপি: দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আনোয়ার হোসেন বুলু ছাড়াও বিএনপির মনোনয়ন চান নওগাঁ জেলা তাঁতী দলের সভাপতি এছাহক আলী।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আনোয়ার হোসেন বুলু দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন বলে দলীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার পর হতেই নওগাঁ-৬ আসন তথা রানীনগর-আত্রাই উপজেলায় বিএনপির নেতাকর্মীরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। সে দুঃসময়ে শক্ত হাতে দলের হাল ধরেন আনোয়ার হোসেন বুলু। কঠোর পরিশ্রম ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এলাকার নেতাকর্মীদের মাঝে দলের এবং নিজের অবস্থান দৃঢ় করেন। ২০০৮ নির্বাচনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. ইসরাফিল আলমের কাছে পরাজিত হন। এরপরও তিনি অত্র এলাকায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।

রানীনগর ও আত্রাই উপজেলায় কোনো গ্রুপিং না থাকায় দলীয় শক্ত অবস্থানে রয়েছেন আনোয়ার হোসেন বুলু। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে আনোয়ার হোসেন বুলুর সরব উপস্থিতি দলের নেতাকর্মীদের অনেকটাই চাঙ্গা ভাব লক্ষ্য করা যায়। এ অবস্থা ধরে রাখতে পারলে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ভালো ফলাফল পেতে পারে- এমনটাই নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা।

অপরদিকে নওগাঁ জেলা তাঁতী দলের সভাপতি এছাহক আলী বিএনপির দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী। এছাহক আলী ২০০৮ সালের ৮ম সংসদ নির্বাচন থেকেই বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী। সেই লক্ষ্যে নিজেকে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছেন। তিনি থাকেন ঢাকায়। মাঝেমধ্যে এলাকায় দেখা গেলেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তেমন সরব নন।

রানীনগর-আত্রাই উপজেলার আইনশৃঙ্খলা বিষয়টি নিয়ে এলাকার লোকজন সবসময় বড় সমস্যায় থাকেন। এই এলাকায় ছিল সর্বহারা অবাধ বিচরণ। সর্বহারাদের হত্যা, নির্যাতন ও চাঁদাবাজির কথা মানুষ এখনো ভুলতে পারেনি। সেই সঙ্গে ছিল বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবির তাণ্ডব। পাশাপাশি যোগাযোগ সমস্যা, বিদ্যুৎ সমস্যা ও শিক্ষার দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকা এলাকা। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে। আগামী সংসদ নির্বাচনে এই ইস্যুগুলোর ভিত্তিতেই ফলাফল নির্ধারিত হবে বলে এলাকার অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

মানবকণ্ঠ/আরএ