প্রস্তুত গাজীপুর, প্রস্তুত ইসি

উৎসব-আমেজে শুরু হতে যাচ্ছে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোট। আগামীকাল মঙ্গলবার ভোট অনুষ্ঠানের সব ধরনের প্রস্তুতি এরই মধ্যে সেরে ফেলেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটের মাঠের দায়িত্ব গতকাল রোববার সকাল থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। চার স্তরের নিরাপত্তায় থাকবে ১০ হাজারেরও বেশি ফোর্স। সিটি এলাকার মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে নিরাপত্তা তল্লাশি। কমিশনের অনুমোদিত স্টিকার ছাড়া মোটরসাইকেল চলাচলেও আরোপ হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। ভোটার ব্যতীত সব ধরনের বহিরাগতদের এলাকা ছাড়তে আগেই পরিপত্র জারি করেছে কমিশন।

এদিকে, আজ সোমবার থেকে নির্বাচনের সামগ্রী প্রিসাইডিং অফিসার এবং কেন্দ্র পাহারায় থাকা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টরা। রিটার্নিং অফিসারের নির্বাচনের ফল প্রকাশ করা সমন্বয় কেন্দ্র থেকে এসব সামগ্রী হস্তান্তর করা হবে।
গাজীপুর সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে ৩৯ রাজনৈতিক দলের মধ্যে মাত্র ৬টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সব ছাপিয়ে আলোচনায় রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী। সেইদিক বিবেচনায় বলা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে নৌকা-ধানের শীষের লড়াই হবে। প্রধান দু’দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে শঙ্কাও কম নয়। এখন দেখার বিষয় আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নিরপেক্ষ থেকে কিভাবে নির্বাচনের বৈতরণী পার করে সাংবিধানিক এই সংস্থাটি।

নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে কমিশন সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, কমিশনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এরই মধ্যে মাঠে নেমেছেন। আশা করছি, কুমিল্লা, রংপুর ও খুলনা সিটির মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন হবে।

এদিকে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিবউদ্দিন মণ্ডল বলেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। এখনো শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা এবং ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাসহ প্রায় ২০ হাজার কর্মকর্তা এই নির্বাচনে যুক্ত আছেন। তিন স্তরের নিরাপত্তায় থাকবে র‌্যাব, বিজিবি ও পুলিশ।

প্রচারণা: গাজীপুর সিটি নির্বাচনের প্রচারণা রোববার মধ্যরাত থেকেই শেষ হয়েছে। সিটি নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী ভোট গ্রহণ শুরুর ৩২ ঘণ্টা আগে এ প্রচারণা শেষ হয়। তাই সিটির মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সির প্রার্থীরা রোববার মধ্যরাতের পর আর কোনো ধরনের প্রচারণা চালাতে পারেননি। আগামীকাল ২৬ জুন ভোট, এর আগের দিন নিজস্ব বলয়ে নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে সাক্ষাতে প্রার্থীদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকবে।

তৎপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী: সিটি নির্বাচনে ১০ হাজারেরও বেশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কেন্দ্র এবং কেন্দ্রের বাইরে এসব সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে কেন্দ্র পাহারায় থাকবে পুলিশ, আনসার ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। ইসি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গাজীপুরের ৫৭টি ওয়ার্ডে পুলিশ, এপিবিএন এবং ব্যাটালিয়ন আনসারের ৫৭টি মোবাইল ও ২০টি স্ট্রাইকিং ফোর্স, র‌্যাবের ৫৮টি টিম ও ২৯ প্লাটুন বিজিবি দায়িত্ব পালন করবে।

প্রার্থী ও ভোটার: এই সিটিতে ৫৭টি সাধারণ ওয়ার্ড, ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড, ভোট কেন্দ্র ৪২৫টি এবং ভোটকক্ষ ২ হাজার ৭৬১টি। মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৬ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৩৫ জন এবং নারী ভোটার ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮০১ জন। ভোটার সংখ্যানুপাতে নারীর চেয়ে পুরুষ ভোটার ২ হাজারের মতো বেশি। নির্বাচনে মেয়র পদে ৭ জন এবং ৫৭টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২৫৪ জন, ১৯টি সংরক্ষিত আসনে ৮৪ জন নারী কাউন্সিলর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা প্রায় ৯ হাজার: এ নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং এবং পোলিং অফিসার (ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রায় ৯ হাজার জন। এর মধ্যে ৪২৫টি ভোট কেন্দ্রে ৪২৫ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ২ হাজার ৭৬১টি ভোট কক্ষের জন্য ২ হাজার ৭৬১ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, প্রতিটি ভোট কক্ষে ২ জন করে মোট ৫ হাজার ৫২২ জন পোলিং অফিসার থাকবেন। ভোটার শনাক্ত এবং ব্যালট দিয়ে ভোট কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে এসব কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

ইসির নিজস্ব পর্যবেক্ষক: ভোটের দিন প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট কার্যক্রমের গতি-প্রকৃতি, ভোটার, প্রার্থী-কর্মী সমর্থকদের গতিবিধি এবং সর্বোপরি নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনসহ সব কিছু সাধারণ পোশাকে পর্যবেক্ষণ করবেন ইসির নীরব পর্যবেক্ষকরা। ভোটে অনিয়ম দেখলে তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ, রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবহিত এবং প্রয়োজনে কমিশনকে ঘটনার তথ্য সম্পর্কে জানাবেন তারা।

ছয় কেন্দ্রে ইভিএম ও সিসি ক্যামেরা: ভোটার সচেতন এবং শিক্ষিত ও শহরকেন্দ্রিক ২৪, ২৬ ও ২৮ নং ওয়ার্ডের ২টি করে কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট নেয়া হবে। যান্ত্রিক জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ যাতে বুঝে-শুনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সেজন্য নগরীর ওই ২টি ওয়ার্ডকে বেছে নেয়া হয়েছে। আর ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিবেচনায় সিটির কয়েকটি ভোট কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরার সহায়তায় নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

সব কলকারখানা বন্ধ: গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ভোটের দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া ভোটারদের ভোট প্রদানের সুবিধার্থে গার্মেন্টস, স্পিনিং মিলসহ সব ধরনের কলকারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমই, বিআরটিএ, গাজীপুর জেলা প্রশাসন, হাইওয়ে পুলিশ, শিল্প পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে মতবিনিময় করে এই নির্দেশ দিয়েছে ইসি।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ