প্রশ্নপত্র ফাঁস: অবক্ষয়ের চরম চিত্র

mk3s6ykeসম্পাদকীয়
এসএসসির গণিত প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এই অভিযোগ ওঠার পরও এ প্রশ্নপত্র দিয়েই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, আগের দিন রাত ১১টায় ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষা নেয়া প্রশ্নের মিল না থাকলেও সকাল সাড়ে ৯টায় যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে সেটির সঙ্গে পরীক্ষা নেয়া প্রশ্নের শতভাগ মিল ছিল বলে জানিয়েছেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান। তিনি বিষয়টি স্বীকার করে পরবর্তীতে আবার অন্যভাবে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন। প্রশ্নপত্র যখনই ফাঁস হোক ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষা নেয়ার প্রশ্নের মিল রয়েছে এটিই হলো মূল কথা।
প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার মতো ব্যাধির এতকিছুর পরও উপশম করা সম্ভব হচ্ছে বিস্ময়ের বিষয় সেটিই। এমন চিত্র যে চরম অবক্ষয়ের এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিষয়টি যেমন লজ্জা ও গ্লানির তেমনি চরম উদ্বেগেরও। যে দেশে পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরিচালিত বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়, সে দেশে এসএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি তুলনামূলক বিচারে যতই খাটো হোক তা অবশ্যই ধিক্কারযোগ্য। আমাদের স্মরণে আছে, অতীতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে একবার যে পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছিল সেই পরীক্ষা দ্বিতীয়বার অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেও একই ঘটনা ঘটেছিল। এ থেকে খুব সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, অবক্ষয়কারীদের শিকড়-বাকড় কতটা বিস্তৃত ও সামগ্রিকভাবে সমাজচিত্র কতটা বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। বিষয়টি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে এবং এ ব্যাধি যে টোটকা কোনো দাওয়াইয়ে সারবে না তাও অনুধাবন করা কষ্টকর নয়। অতীতে স্কুল-কলেজ এবং বিসিএসসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারি বারবার উদ্ঘাটিত হয়েছে বটে কিন্তু এর পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা যায়নি। কেন যায়নি এর সদুত্তর মেলা দুরূহ কোনো বিষয় নয়। অতীতে যতবার এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে তারপর মিডিয়ায় কিছুদিন হৈ চৈ হয়েছে এবং সে কারণেই প্রশাসনের সাময়িক তৎপরতাও পরিলক্ষিত হয়েছে। কিন্তু একপর্যায়ে যখন আবার সব থেমে যায় তখন অশুভ শক্তি তাদের হীনকর্ম সাধনে আবার তৎপর হয়ে ওঠে।
মানবিক মূল্যবোধ কীভাবে ক্রম লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এ বিষয়টি এর একটি দৃষ্টান্ত। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ব্যাধি কিংবা অপক্রিয়া অনতিবিলম্বে বন্ধ ও অপশক্তির শিকড় উৎপাটন যদি করা না যায় তাহলে প্রকট হয়ে উঠবে আস্থার সংকট এবং তা হবে দেশ-জাতির জন্য আরো ক্ষতিকর। প্রতারকদের দৌরাত্ম্য ও অশুভশক্তির সব রকম কারসাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। এসব বিষয়ে এ যাবৎ কথা হয়েছে বিস্তর কিন্তু কাজের কাজ কতটা কী হয়েছে বিদ্যমান বাস্তবতা এই প্রশ্ন পুনর্বার দাঁড় করিয়েছে। আস্থার সংকট, অবিশ্বাস এর নেপথ্যের মূল কারণ সামাজিক অবক্ষয়। সামাজিক পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে গিয়ে ঠেকছে যেখানে ব্যক্তি বা মহলবিশেষ প্রধান হয়ে দেখা দিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে ফিরতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ ঢেকে যাবে অন্ধকারে যা শুভবোধসম্পন্ন কারোরই কাম্য হতে পারে না। এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ সামাজিক মূল্যবোধগুলো নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক দণ্ড নিশ্চিত করা।
শর্ষের ভেতরে ভূত রয়েছে এমন অভিযোগ ইতোমধ্যে বহুবার উত্থাপিত হয়েছে। এই অভিযোগ যে অমূলক নয় এরও প্রমাণ ইতোমধ্যে আমরা পেয়েছি। ভবিষ্যতে যেন এমন কোনো ঘটনা আর না ঘটে এ ব্যাপারে সব রকম ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে কালক্ষেপণ না করে। আমরা আশা করব, দুষ্টচক্রের হোতাদের মূলোৎপাটনে সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা নির্মোহ অবস্থান নিয়ে যথাযথসহ প্রতিকারে নিষ্ট হবেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্র অনেক দিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। চিরাচরিত অভ্যাসমতো ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি’, ‘এটা স্রেফ গুজব’ ইত্যাদি বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা চলবে না। এই ন্যক্কারজনক অপরাধের যথাযথ প্রতিকার নিশ্চিত হোক।

মানবকণ্ঠ/এসএস