প্রমিত বাংলার চর্চা: মননে উচ্চারণে বানানে

প্রমিত বাংলার চর্চা: মননে উচ্চারণে বানানেদুই

প্রমিত বাংলা শেখার এবং বলার ব্যাপারে উচ্চারণের গুরুত্ব খুব বেশি। কেউ কেউ বলছেন, প্রমিত বাংলায় মান্য উচ্চারণ করতে হবে। এই মান্য উচ্চারণটা কী তা কেউ বলছেন না। কেউ কেউ বলছেন, প্রতিটা বর্ণের মান্য উচ্চারণ করতে হবে। কিন্তু বর্ণের মান্য উচ্চারণটা কী, তাও কেউ বলছেন না। বিষয়টা অন্ধের হাতি দেখার মতো হয়ে যাচ্ছে। অবাকের কথা, কেউ জিগ্যেসও করছেন না, মান্য উচ্চারন মানে কী? এটা কী অনীহা না স্রেফ অজ্ঞতা, নাকি লুকিয়ে থাকার প্রবণতা? যেটাই হোক, ভালো কথা নয়। উত্তরটা আমি জানি। কিন্তু এখন নয়, এখানেও নয়। আরো অনেকের কথা শুনতে চাই।

বাংলা একাডেমির উচ্চারণ অভিধান আছে একখানা। সেখানে ‘মান্য উচ্চারণ’ শব্দের কোনো ব্যাখ্যা আমি পাইনি। নরেন বিশ্বাসের উচ্চারণ অভিধান বেশ সহায়ক। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, রোমান হরফের প্রতিবর্ণগুলো। বিশেষ করে ‘হ-যুক্ত’ শব্দের উচ্চারণের ক্ষেত্রে রোমান হরফের বিন্যাসে যথেষ্ট বিভ্রান্তি আছে। মাত্র কয়েকটা শব্দ নিয়ে লেজে গোবরে একেকার হয়ে থাকে আবৃত্তি গোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা। যেমন, আহ্বান, আহ্লাদ, বিহ্বল, জিহ্বা, আহ্নিক, অপরাহ্ণ, ইত্যাদি শব্দের উচ্চারণ সব আবৃত্তি গোষ্ঠীর এলাকায় অভিন্ন নয়। কেউ কারো মত মানতে চায় না। এসব উৎসাহী উচ্চারণ প্রশিক্ষকদের কাছেও জানতে চেয়েছি, ‘বর্ণের বা শব্দের মান্য উচ্চারন’ মানে কী? বিজ্ঞানসম্মত কোনো উত্তর পাইনি।

বিটিভি-তে ‘বাংলাভাষা’ (যদি ভুল না হয় নামটা) নামে একটা অনুষ্ঠান হয়। কিছু কিছু অনুষ্ঠান আমি দেখেছি। মনে হয়েছে, সংস্কৃত নিয়মে বাংলা উচ্চারণের ব্যাখ্যা এবং উচ্চারণ শুনছি। বিশেষ করে ‘জিওভা/ জিউভা’ উচ্চারণ শেখানো যেদিন শুনেছি। প্রমিত বাংলায় আমরা অনবরত বলে যাচ্ছি, ‘জিব’। কিন্তু শেখানো হচ্ছে অন্যরকম। আজ পর্যন্ত কাউকে বলতে শুনিনি যে, ‘আমার জিউভা/জিওভা’ লাল হয়েছে, খেতে গেলে কষ্ট হচ্ছে। আমি তো বলি, ‘জিব’ লাল হয়েছে, তরকারি খেতে গেলে জ্বলছে। ডাক্তার বলেন, ‘জিবটা দেখান’। কক্ষনো কোনো ডাক্তারের কাছে শুনিনি ‘জিওভা/জিউভা’ দেখান। বিটিভির বাংলাভাষা অনুষ্ঠানেও ‘জিহ্বা’ উচ্চারণ শেখানো হয়েছে, ‘জিউভা’। এখানেও মান্য উচ্চারণের ব্যাখ্যা কেউ দেননি।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯২ সালে দুটো বক্তৃতা দিয়েছিলাম। বিষয় ছিল, ‘বর্ণের ধ্বনি সৌন্দর্য’। রবীন্দ্রভারতীতে নাটকের ক্লাসে, আর কল্যাণীতে বাংলা বিভাগে। সেখানে বোর্ডে এঁকে লিখে অঙ্ক করে ধ্বনি সৌন্দর্যের বিষয়টা বিশ্লেষণ করেছিলাম। কিছু পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ’-এ একই বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলাম। তখন সেখানকার পরিচালক ছিলেন গুণী মানুষ ড. কোরেশি। এই বিষয়ে আমার লেখা প্রবন্ধও প্রকাশিত হয়েছে। মান্য উচ্চারণের কথা সেখানে বিশদ বলেছি। কিন্তু এখন এখানে নয়। বলা হবে যথাস্থানে।

প্রমিত বাংলা উচ্চারণের ব্যাপারে এখন অনেকেই বাংলা বর্ণ সংস্কারের কথা নিয়ে আসছেন। উচ্চারণের জন্যই। কেউ অনেক বর্ণ বর্জনের কথা বলছেন। কেউ অনেক নতুন বর্ণ আমদানির কথা বলছেন। রবীন্দ্রনাথও বিদেশি শব্দের উচ্চারনানুগ বানান বাংলায় লেখার জন্য নতুন বর্ণ আমদানির কথা বলেছিলেন। সেই ব্যাপারে বৈয়াকরণ ভাষাবিদ সুনীতিকুমারকে অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু তিনি বাংলায় নতুন বর্ণ আমদানির সাহস দেখাননি। তবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ‘অ্যা’ বর্ণের আমদানি করেছিল ১৯৩৪-৩৬ সালে। সেও উচ্চারনানুগ বানান লেখার জন্য। কাজটা শুধু সাহসের নয়, বৈপ্লবিকও ছিল। একবিংশ শতকে আবার সেই কথা এসেছে প্রজন্মের কাছ থেকে। কথাটার যুক্তি আছে, প্রয়োজনও আছে। তাছাড়া বানান দেখে উচ্চারণ ঠিক হয় না বিধায় রেফের পর দ্বিত্ব বর্জন করেছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। সেটাও করা হয়েছিল উচ্চারণের সাত্তিকতার কথা ভেবেই। উচ্চারণ আর বানান যেন সমতাপূর্ণ হয়। এতদিন পর সেগুলোকে ভুল বলছেন কিছু কিছু প্রবীণ জন। আসলে পেছনে পা দিয়ে হাঁটার মানুষ আমরা। সামনে যেতে ভালোই লাগে না।

প্রমিত বাংলায় উচ্চারণকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য, বিশেষ করে ইংরেজি শব্দ আত্তীকরণের ব্যাপারে, ইংরেজি উচ্চারণ অনুকরণ করতে চাই আমরা। যেমন,ÔZOO, ZERO, ZYLOPHONE, ZEBRA-CROSSING, ইত্যাদি শব্দের বেলায় দন্ত-জ উচ্চারণ করি। সচেতনভাবেই করি। এই দন্ত-জ-এর জন্য বাংলায় কোনো বর্ণ নেই। তাই নতুন একটা বর্ণের কথা এসেছে নানা আলোচনায় আর শব্দের অনুকরণকৃত অ-বাংলা উচ্চারণকে বাংলা লিপিতে, তথা বাংলা বানানে লেখার জন্যও তাগিদ এসেছে। মানে, নতুন বর্ণ আমদানির মূল দর্শনেও ছিল উচ্চারনানুগ বানান লেখা।

অথচ এই কথাটা শুনলে অনেকে বলেন, বানান কোনোদিন উচ্চারনানুগ হয় না। উচ্চারণ আর বানানে ফারাক আছে সব ভাষাতেই। আমি বলি, একটা বর্ণ দিয়ে যারা একাধিক ধ্বনি উচ্চারণ করে, তাদের বেলায় খাটে কথাটা। যেমন ইংরেজি, জার্মান ভাষা। ইংরেজিতে একটা স্বরের ৪/৫টা উচ্চারণ। জার্মান ভাষায় ‘এস’-এর কয়েক রকম উচ্চারণ। বাংলা তেমন ভাষা নয়। বাংলায় একটা বর্ণ একটাই ধ্বনি দেয়। বাংলা ‘ক’-কে ‘খ’ , বা ‘চ’-কে ‘ক’ কিংবা অ-কে ৪/৫ রকমে উচ্চারণ করার উপায় নেই কিংবা বর্ণ আছে তার উচ্চারণ হবে না, সেটাও সম্ভব নয়। তাই বানানে যে ধ্বনির উচ্চারণ পাওয়া যায় না, লিপিতেও তার কোনো প্রয়োজন নেই বলেই আমি মনে করি। এটাই বাংলা ভাষার ছাঁচ। এভাবেই বুঝতে হবে বাংলা ভাষাকে।

কেউ কেউ বলছেন, রোমান হরফে বাংলা বর্ণগুলো লেখা উচিত। কেউ কেউ বলছেন, বাংলার ‘কার’গুলো সব অক্ষরের ডান দিকে রাখতে হবে। কেউ কেউ বলছেন, বাংলায় যুক্তাক্ষর থাকবে না। কেউ বা বলেছেন, অল্পপ্রাণ বর্ণের নিচে ডট বা কোনো ডায়াক্রিটিক মার্ক দিয়ে মহাপ্রাণ বর্ণ লেখার কথা। তাতে অনেক কম বর্ণ দিয়েই বাংলা লেখা যাবে। আমার কাছে এগুলোর কোনোটাই গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। কারণ বর্ণ কমানোর জন্য জিহাদ ঘোষণার দরকার নেই। বাহুল্য কিছু বর্ণ বর্জনের কথা বলতে হবে যুক্তি দিয়ে। পণ্ডিত এবং বৈয়াকরণদের গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েই কাজ করতে হবে আমাদের। ভাষার মাথায় জোর করে কিছু চাপানো যায় না। সে আপনিই রাজা। মানুষের লালনে তার সজ্জা। মানুষের মুখে তার চর্চা। মানুষের বুদ্ধি ও শ্রমে তার অর্জন।

বারবার বলেছি, উপমহাদেশের প্রখ্যাত বৈয়াকরণেরা বলেছেন, বাংলায় দীর্ঘ স্বর নেই। তারা আরো বলেছেন, ‘ণ ষ’ প্রাচীন বাংলাতেই লুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে ওই দুটি ধ্বনির উচ্চারণ বাংলায় অজ্ঞাত। আমরা সেটা মানব না। বানানে বর্ণ দুটোকে রেখে দিয়েছি পরম সন্তোষের সঙ্গে কিন্তু মুখের উচ্চারণে তারা পলাতক। শতাব্দীর অর্বাচীন চর্চাতেও তারা আমাদের উচ্চারণে ধরা দেয়নি। আসল উচ্চারণটা করে শোনালে যে কোনো কানসচেতন ব্যক্তি বুঝতে পারবেন, বানানের সঙ্গে উচ্চারণের মিল নেই। অবাক হতে হয়, তারপরও কেউ মানবেন না। উচ্চারণ করতে পারবেনও না, ছাড়বেনও না। একেই আমি বলি, বুদ্ধিবৃত্তিক মৌলবাদিতা। তবে আমি আশাবাদী এর পরিবর্তন হবে। মুখের উচ্চারণে, মানে প্রমিত বাংলা উচ্চারণে যা নেই এবং এখন যুক্তিতে যা টিকতে পারছে না, তার বিদায় ঘণ্টা বেজেই গেছে। প্রজন্মেরা এখন দুই ‘ন’, তিন ‘স’ পছন্দ করছে না।

তাদের মনন তৈরি হয়ে গেছে। এখন প্রয়োজন, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষদের সামান্য সমর্থন আর সরকারি হুকুমজারির প্রজ্ঞাপন। সেটাও হবে।

উচ্চারণের পর আসে লেখা তথা বানানের কথা। আমাদের সাহিত্য চর্চার বাহন হলো প্রমিত বাংলা। পাঠ্যপুস্তকের ভাষা হলো প্রমিত বাংলা। সর্বস্তরের পরীক্ষা দেয়া এবং চিঠিপত্র লেখার ভাষাও প্রমিত। তাই বানানের বিষয়টা এসেই পড়ে সামনে। প্রশ্ন, কোন বানান লেখা হবে? উনিশ শতকের সুচনায় ব্রাহ্মণপণ্ডিতদের নির্মাণ করা গদ্যের সেই ততসম রীতির অ-বাংলা বানান, নাকি প্রমিত বাংলার উচ্চারণানুগ বানান?

উচ্চারনানুগ বানানের কথায় বহু মানুষের এলার্জি। একেবারে চিটবিটিয়ে ওঠেন। কিছুতেই ভাবতে পারেন না যে, ভাষা আর মানুষ বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষের জীবন এগিয়ে গেছে। আমাদের জীবনেই দেখলাম চার পুরুষের জীবনাচার। এখন চতুর্থ প্রজন্মের বয়স দশ/এগারো বছর। তাদের হাতে থ্রিজি মোবাইল। স্কুলের পাঠ তারা ডাউনলোড করে পড়ে। আর আমরা দশ বছর বয়সে টিভি তো দূরের কথা, রেডিও পর্যন্ত শুনিনি। ছেলেমেয়েদের শাসন করার ভাষা পর্যন্ত বদলে গেছে। বদলে গেছে নিন্দামন্দের শব্দাবলি। অসনে বসনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। বসে থাকবে জুজুবুড়ি হয়ে শুধু ভাষা? অহল্যার মতো পাষাণ নিথর জড় হয়ে থাকবে শুধু বানান? তাই কি হয়? না, সত্যি হয় না। বানানও বদলে গেছে। ‘আপোষ, তোষক, গাড়ী, বাড়ী, ষ্টেশন’, ইত্যাদি বানান এখন লেখা হয়, ‘আপোস, তোশক, গাড়ি, বাড়ি, স্টেশন’। স-এর সঙ্গে ট যুক্ত হওয়ার রীতি এসেছে ইংরেজি শব্দের উচ্চারণ লিখতে গিয়ে। আমাদের ছাত্রজীবনেই ‘স্ট’ লেখা ছিল ভুল বানান। আমরা লিখেছি ‘ষ্টেশন’ বানান। সংস্কৃত রীতি অনুসারে বাংলাতেও ট-বর্গীয় বর্ণের সঙ্গে সর্বদা ‘ষ’ যুক্ত হবে, এই ছিল নিয়ম কিন্তু উচ্চারণানুগ বানান লেখার জন্য পরিণত জীবনে লিখতে শিখেছি, স্টেশন, স্টাডি, ইনস্টিটিউট, স্টোর ইত্যাদি। এখনো অনেকে লেখে, ষ্টাডি, ষ্টেশন, ইনষ্টিটিউট। কেউ কিছু ব্যাখ্যা করে না।

প্রজন্মের বাংলা বানানে এখন উচ্চারণানুগ বানান লেখার প্রবণতা দেখা যায়। কেউ কেউ লেখেন, ‘শাদা, শকাল, শরল’। স্পষ্টই বলেন তারা, এটাই প্রমিত বাংলা বানান। উচ্চারণের সঙ্গে সমতা আছে। বিষয়টা এখানেই থেমে যাবে না। ‘য এবং জ’ নিয়েও মতান্তর আছে। সেটা সৃষ্টি করে গেছেন ফোঁটাকাটা অনুস্বরবাদী সংস্কৃতমন্য পণ্ডিতরা। রবীন্দ্রনাথও এই স্বেচ্ছাচারের কথা উল্লেখ করেছেন বিরক্তির সঙ্গে। বর্তমানে আমরা তো মহা বিরক্ত। দুই জ-এর উচ্চারণে বিন্দুমাত্র ফারাক নেই আমাদের মুখে। বানানেও তার আসন টলেছে। দেখা যায়, যাদু/জাদু বানানে।

সমস্যা হলো, বানান সম্বন্ধে কেউ কথা বলতে চান না। সংস্কৃতকে না হয় মনে করা হয় দেব-ভাষা। সংস্কৃত ভাষার বানানকে দেব-বানান। ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না। যেমন আছে, তেমন থাকবে। কিন্তু বাংলার বানান তো দেব-বানান নয়। বাংলা আমজনতার ভাষা। ভ‚মিজ ভাষা। ব্রাহ্মণদের ভাষ্যে ব্রাত্যজনের ভাষা। বিশাল বাংলার সমস্ত আঞ্চলিক ভাষাই হচ্ছে প্রাকৃতজনের ভাষা। মায়ের ভাষা। মাতৃভাষা। এই ভাষার সংস্কার আমরা না করলে কে করবে? পানিনির শিষ্যরা? আবার বলছি, বাংলা বানানে সংস্কৃত রীতির নিয়মারোপ করেছেন উনিশ শতকের সূচনায় কতিপয় বাংলাবিদ্বেষী ব্রাহ্মণ পণ্ডিত। এই সত্যটা আজ আর অস্বীকার করার জো নেই। প্রমিত বাংলা বানান সংস্কারের ক্ষেত্রে এই সত্যটা বাংলাভাষীর মননে প্রোথিত করতে হবে। মন প্রস্তুত করতে হবে বাংলা বানান সংস্কারের জন্য। তবে তো বাংলার প্রকৃত রূপ এবং শক্তি প্রকাশ পাবে! তবে তো প্রমিত বাংলার চর্চা হবে! মনে রাখতে হবে, প্রমিত বাংলা সজ্জিত, অর্জিত, চর্চিত। – লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মানবকণ্ঠ/এএম