প্রবৃদ্ধি অর্জনে রফতানি আয়ের গুরুত্ব

প্রবৃদ্ধি অর্জনে রফতানি আয়ের গুরুত্ববাংলাদেশের রফতানি আয়ের খাত খুবই সীমিত। বর্তমানে রফতানি খাতগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প খাতই অন্যতম আর এই অন্যতম খাতকে সরকার আরো পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে, দেয়াটাই স্বাভাবিক কিন্তু অন্য খাতগুলোকেও গুরুত্ব দেয়া উচিত। কারণ, একমুখী রফতানি খাত পোশাক শিল্পকে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে। যদি কোনো কারণে একমাত্র রফতানি আয়ের এই খাতে বিপর্যয় আসে, তাহলে দেশের গোটা অর্থনীতিকে মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। ফলে তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি সম্ভাবনাময় খাত মাটির তৈরি টালি রফতানিতে সরকারের বিশেষভাবে নজর দেয়া জরুরি।

বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার মুরারীকাটি ও শ্রীপতিপুরের কারিগরদের হাতে তৈরি মাটির টালি ইউরোপ-এশিয়ার সাতটি দেশ-ইতালি, দুবাই, ফ্রান্স, ইউকে, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসে রফতানি হচ্ছে। মূলত মংলা সমুদ্রবন্দর দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিমাসে ৫০ হাজার ডলার মূল্যের মাটির টালি রফতানি হচ্ছে। সাতক্ষীরা জেলার ২০টিরও বেশি কারখানায় রফতানিযোগ্য মাটির টালি তৈরি হচ্ছে। যেহেতু মাটির টালি দ্বারা পরিবেশবান্ধব এবং শীত ও গরম নিরোধক ঘর তৈরি করে আরাম-আয়েশে বসবাস করা সম্ভব, সেহেতু মাটির টালির কদর আমাদের দেশের চেয়ে বিদেশে বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। এখন শুধু সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আরো বেশি বাণিজ্যিকভাবে মাটির টালি তৈরি এবং রফতানিতে নগদ প্রণোদনা দিলে এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

সূত্রমতে, এখন যে পরিমাণ মাটির টালি প্রস্তুত হচ্ছে, তুলনামূলক সেভাবে রফতানি না হওয়ার কারণে অনেকেই আগ্রহ হারাচ্ছেন। কথায় আছে, প্রচারে প্রসার। অনেক সময়ই পণ্যের বিক্রি বাড়াতে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হয়। ঠিক একই কারণে মাটির টালি রফতানির ক্ষেত্রকে আরো সম্প্রসারিত করতে হবে। এ জন্য ক‚টনৈতিকভাবে ব্যবসায়িক তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে। আমরা মনে করি, এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবসায়ী মালিকদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইকে এগিয়ে আসতে হবে। মাটির টালি কারখানাগুলোকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে পারলে দেশীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি আরো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

শুধু মাটির টালি কেন, রফতানি পণ্যকে বহুমুখীকরণ করতে হবে। কারণ রফতানি খাতকে বহুমুখীকরণ করতে পারলে আমাদের অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধ হবে। যেমন: আইটি পণ্য, ওষুধ, জাহাজ ভাঙা এবং নির্মাণ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, আসবাবপত্র, হোম-টেক্সটাইলের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে আমাদের দেশের ওষুধ শিল্প এখন অনেক বেশি সমৃদ্ধ। পৃথিবীর এক শতেরও বেশি দেশে এখন বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ ভালোমানের স্বীকৃতি লাভ করায় এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ওষুধ রফতানি হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় এপিআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ও সিরাজগঞ্জে বিএসসিআইসি শিল্প পার্ক স্থাপন হলে এবং ওষুধের কাঁচামাল সহজলভ্য হবে এবং বাংলাদেশের শুধু বিদেশে রফতানির হার নিকট ভবিষ্যতে আরো বৃদ্ধি পাবে। ওষুধ শিল্পের পাশাপাশি বাংলাদেশের আসবাবপত্রের রফতানি বাজারও সমৃদ্ধ হয়েছে। উন্নত দেশের ঘরে ঘরে এখন বাংলাদেশের আসবাবপত্রের কদর বেড়েছে। এখনো জাহাজ বলতে মানুষ বুঝে, বিদেশ ছাড়া জাহাজ তৈরি হতেই পারে না। কিন্তু সবাইকে তাক লাগিয়ে বাংলাদেশের কারিগররা এখন ভালোমানের জাহাজ তৈরি করছেন। আরো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নিকট ভবিষ্যতে জাহাজ নির্মাণ শিল্পও অর্থনীতিতে ভালো অবদান সক্ষম হবে।

কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। স্বাধীনতা-উত্তর গত ৪৭ বছরে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণে চাল, সবজি এখন দেশেই উৎপাদন হচ্ছে। প্রাকৃতিক বড় ধরনের কোনো দুর্যোগ না হলে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত খাদ্যশস্যে খাদ্য নিরাপত্তা অনেকাংশেই নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে গম ব্যতীত অন্যান্য খাদ্যপণ্য তেমন একটা আমদানি করতে হয় না অথচ এমন এক সময় ছিল, যখন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হতো। এখন আমদানি খরচ মেটানো কমে আসায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভও সেভাবে কমছে না। ফলে দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হচ্ছে। তবে, পাটচাষ ও পাটজাত পণ্যের উৎপাদন এবং বিপণনে সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সময় পাটচাষিরা পাটের ন্যায্যমূল্য পান না আবার পাটকলগুলোয় উৎপাদিত পাটপণ্য বিক্রির সংকটেও পড়তে হচ্ছে। ফলে পাটচাষিরা পাটকলে পাট বিক্রি করে মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও পাওনা টাকা পাচ্ছেন না।

এ কারণে পাট উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং পাটজাত পণ্য উৎপাদন করে ভর্তুকি দিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে বিপণন করতে হবে। যেন সাধারণ ভোক্তারা তুলনামূলক কমমূল্যে পাটপণ্য কিনে ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ অতীতের মতো পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে আর পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হলে সর্বপ্রথম দেশে পিপি ব্যাগ ও পলিথিন কারখানা বন্ধ করতে হবে। কারণ পলিথিন সিনথেটিকের উৎপাদন অব্যাহত রেখে পাটপণ্যের ব্যবহারকে শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এ জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে যৌক্তিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

যেমন: ১. পিপি ব্যাগ প্রস্তুতকারী কারখানাগুলোকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে একপর্যায়ে উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। এমনকি কারখানাগুলোর অনুক‚লে প্রদেয় ঋণ পরিশোধে ঋণ গ্রহীতাদের যৌক্তিক সময় এবং সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। ২. মোড়কে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার যে ১৮টি পণ্যে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তার শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিতে পাটের ব্যাগের সহজলভ্যতাকে যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি সরকারিভাবে ভর্তুকি দিয়ে সহনীয় এবং যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাড়লে পাটকলগুলোয় উৎপাদিত বস্তাও ক্রেতার অভাবে মিলে পড়ে থাকবে না। অন্যদিকে পাটচাষিদের উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

ধান উৎপাদনে এ দেশের কৃষকের সফলতা পাহাড় সমান। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরপরে সাত কোটি মানুষের দু’বেলা পেট ভরে খাবার সংস্থানই ছিল না। দেশের সিংহভাগ মানুষকে জঠর জ্বালা নিয়েই ঘুমাতে হতো। সে দেশটির জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটিরও বেশি। আবার প্রতিনিয়তই নানা কারণে কমছে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ। এরপরও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য সংকট আর আগের মতো নেই। মানুষ এখন দু’বেলা পেট পুরে খেতে পারছে। যা সম্ভব হয়েছে কৃষিবিজ্ঞানীদের উচ্চফলনশীল জাতের খাদ্যশস্য উদ্ভাবন এবং কৃষকের শত প্রচেষ্টার ফলে। দেশ এখন সবজি চাষেও অনেক বেশি সফল। আমাদের উৎপাদিত সবজি দেশীয় চাহিদা পূরণ করে দেদার বিদেশে রফতানি হচ্ছে। যদিও উৎপাদনের তুলনায় রফতানির পরিমাণ খুব বেশি নয়। এ ধারাকে সম্প্রসারিত করতে হবে। সবজির বাইরে ফলমূল উৎপাদনেও দেশে অনেক বেশি অগ্রগতি এসেছে।

ফলমূল উৎপাদনের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ফলমূলও কাক্সিক্ষত পর্যায়ে রফতানি করা সম্ভব হবে। অবশ্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় উদ্বৃত্ত আলু বিদেশে রফতানির উদ্যোগও নিয়েছে।

আমাদের ঘন জনসংখ্যার দেশে কর্মসংস্থানের বড়ই অভাব। উন্নত প্রযুক্তির চাষাবাদে এখন দেশের শিক্ষিত শ্রমশক্তি কাজ করছে। আবার সরকারিভাবে কৃষি উপকরণের সহজ জোগান পাওয়ায় উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব মিলে এখন কৃষিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। এখন পরিকল্পিত চাষাবাদের পাশাপাশি উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে কৃষিতে আরো ব্যাপক সফলতা অর্জন করা সম্ভব হবে। তাহলে কৃষিও হতে পারে রফতানি আয়ের অন্যতম খাত।

যদিও সরকার দাবি করছে, রফতানিপণ্যের বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, এ উদ্যোগকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে। যেন সম্ভাবনাময় চামড়া খাতও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ দু-একমুখী রফতানি আয়ের ওপর নির্ভরশীল না থেকে রফতানি আয়ের সম্ভাবনার প্রতিটি খাতকে সরকারিভাবে প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি প্রণোদনার আওতায় এনে গতিশীল করতে হবে। তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বিনির্মাণ করা হয়তো কঠিন হবে না। – লেখক: কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এএম