প্রবীণ সাংবাদিকদের সামগ্রিক অবস্থা

বাংলাদেশে সাধারণত যাদের বয়স ৬০ বছর, তারাই প্রবীণ ব্যক্তি। আধুনিক যুগ বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানের অবদানে চিকিৎসা ব্যবস্থার ফলপ্রসূ উন্নতি সাধিত হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি এবং মানুষের নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়ে দিচ্ছে আয়ু। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসাধারণ সাফল্যে বর্তমান বিশ্বে মানুষ প্রায় ১২০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। বয়স বৃদ্ধির এ হারে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও।
একসময় বার্ধক্যজনিত সমস্যা উন্নত বিশ্বের সমস্যা মনে করা হলেও বর্তমানে এটি বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা এ ইস্যুতে জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করেছে। ১৯৯০ সালে সর্বপ্রথম জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত এক প্রস্তাবে ১৯৯১ সাল থেকে বিশ্ব প্রবীণ দিবস পালিত হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর অর্থ হলো, জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশ এ দিবসটি গুরুত্বসহকারে পালন করবে। তাই সারাবিশ্বে যথাযথভাবেই একটি দায়বদ্ধতা চলে আসে প্রবীণদের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের।
বাংলাদেশে ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত বার্ধক্য বা প্রবীণজনিত সমস্যাটি তেমন গুরুত্ব পায়নি। ২০০০ সালের পর থেকে বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে আগামীতে প্রবীণদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সমস্যাটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বলে দেখা দিতে পারে বলে ভাবা হয়। সতেরো বছর পর বর্তমানে কিন্তু তৎকালীন গবেষণার আলোকপাতগুলোই সত্যি হচ্ছে। এই মুহূর্তে কেমন আছেন আমাদের দেশের প্রবীণেরা? বর্তমানের নানা গবেষণা বলছে, তারা ভালো নেই। বিশ্বায়নের এ যুগে আমাদের দেশের যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে তৈরি হচ্ছে একক পরিবার, এতে পরিবারগুলোতে প্রবীণরা ছিটকে পড়ে অসহায় হয়ে পড়ছে। রাষ্ট্রও প্রবীণদের দেখভালের দায়িত্ব নিচ্ছে না। একটি মানুষের যে সময়টাতে প্রয়োজন পড়ে পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ঠিক তখনই আমাদের দেশের একটি বিশালসংখ্যক প্রবীণ বিপদে পড়ে যাচ্ছেন। অর্থনৈতিক, সামাজিক, শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় তারা নিজেদের অনেকটাই বোঝা ভাবতে শুরু করেন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল বাংলাদেশে প্রবীণদের অবস্থা, সমস্যা, প্রবীণদের প্রতি সমাজের ও পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি, প্রবীণ জনসংখ্যার আকৃতি প্রকৃতি এবং তাদের কল্যাণে পরিচালিত সরকারি ও বেসরকারি প্রস্তুতি প্রায় সর্বাংশেই ভিন্ন ধরনের।
এদেশের প্রবীণদের বেশিরভাগই হচ্ছে গ্রামীণ, দরিদ্র, নিরক্ষর, কৃষিজীবী, সনাতনী মনোভাবাপন্ন। ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতির কারণে এদেশের প্রবীণরা এখনো অনেকটাই সম্মানিত হচ্ছেন কিন্তু উল্টোচিত্রে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রবীণদের প্রধান সমস্যা হলো দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। প্রবীণ বয়সে কর্মক্ষমতা লোপ পায় তাই চাকরিজীবীরা অবসরে চলে যান আর অন্যান্য শ্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত যারা তারা ধীরে ধীরে তাদের কর্মপরিধি গুটিয়ে ফেলেন। তাই একসময় তাদের উপার্জনের আর কোনো পথই খোলা থাকে না। বার্ধক্যে তাই দারিদ্র্যে আক্রান্ত হয় বেশিরভাগ প্রবীণ। ২০১৩ সালের একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, আমাদের দেশে দুই-তৃতীয়াংশ প্রবীণই দারিদ্র্য, আটান্ন ভাগ প্রবীণের মৌলিক চাহিদা পূরণের সামর্থ্য নেই। এছাড়াও বার্ধক্যকালে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের ফলে প্রবীণরা নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক রোগে ভুগে থাকেন। সবকিছু বিবেচনা করলে আমাদের দেশের প্রবীণরা এই মুহূর্তে ভালো নেই। তারা অনেকটা মানবেতরভাবেই দিন পার করছেন।
কেমন আছেন বাংলাদেশের প্রবীণ সাংবাদিকরা?
সমাজের যে কোনো কিছু উন্নয়নের কথা ভাবতে গেলেই গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা আসবেই। সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী মাধ্যম হলো এই গণমাধ্যম। রাষ্ট্রের শক্তিশালী একটি স্তম্ভ হিসেবে সংবাদ মাধ্যমকে বিবেচনা করা হয়। শক্তিশালী গণমাধ্যম রাষ্ট্রযন্ত্রকে সঠিকভাবে পরিচালনার চালিকাশক্তি। সংবাদপত্রের মাধ্যমে সমাজের যে কোনো বিষয়ের সমস্যা, অর্জন, চাহিদা, জনমত সৃষ্টি ও সমাজের ভালোমন্দ সব তুলে ধরা হয়। শুধু তাই নয়, শিশুসহ বড়দের নৈতিকতা শেখাতে, জ্ঞান বৃদ্ধিতে এবং বিনোদন প্রদানে গণমাধ্যমের বিকল্প নেই। গণমাধ্যমকে যে কোনো সমাজবিষয়ক উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের প্রতিনিধি বলা যায় আর গণমাধ্যমের প্রধানতম প্রাণ হলো সাংবাদিক। একজন সাংবাদিক হলেন সমাজের প্রধানতম নির্মাতা। সংবাদকর্মীরা সমাজের সংকটগুলো, সম্ভাবনাগুলো খুঁজে বের করে তা দেশ ও দশের সামনে তুলে ধরেন। একটি অবহেলিত জনগোষ্ঠী বা জনপদের খবর লেখনীর মাধ্যমে সবার কাছে পৌঁছে দিতে ও সমাধান খুঁজে বের করতে গণমাধ্যম ও সংবাদকর্মীর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সমাজের হাতিয়ার এই সাংবাদিকরাই যখন বার্ধক্যে পৌঁছান তখন তারা কেমন থাকেন? প্রবীণ বন্ধুর জরিপ বলছে, তারা খুব একটা ভালো নেই। বার্ধক্যকালীন বয়সটাকে সাধারণত তিনভাগে ভাগ করা হয়- ইয়ং ওল্ড বা তরুণ প্রবীণ (৬০ থেকে ৭০ বছর), মিডল ওল্ড বা মধ্যম প্রবীণ (৭০ থেকে ৮০ বছর) এবং ওল্ড ওল্ড বা অতি প্রবীণ (৮০ বছরের ঊর্ধ্বে)।
সারা পৃথিবীসহ বাংলাদেশেও ওল্ড ওল্ড বা অতি প্রবীণের সংখ্যা বাড়ছে। সাংবাদিকদের মধ্যেও এই সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রবীণদের নিয়ে কাজ করছে তরুণদের সংগঠন প্রবীণ বন্ধু’র সদস্যরা গত ৩ মাস ধরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য, গাজীপুর প্রেসক্লাবের সদস্য, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, সাংবাদিক অধিকার ফোরাম এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিট থেকে প্রবীণ সাংবাদিকদের সামগ্রিক তথ্য সংগ্রহ করে বের করেছে মধ্যম প্রবীণ ও অতি প্রবীণ সাংবাদিকদের নানা দুর্দশার চিত্র। সাধারণত এই কলম সৈনিকরা বার্ধক্যে এসে খুবই অসহায় হয়ে পড়েন। তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তুলে ধরা হলো- হিসাব বলছে, সাংবাদিকদের মধ্যে প্রায় ১১ শতাংশই প্রবীণ এবং ৬ শতাংশ অতি প্রবীণ (জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকার বাইরের প্রেসক্লাবগুলোর তালিকাভুক্ত সদস্যদের বর্তমান তথ্যানুযায়ী)।
* তরুণ প্রবীণ সাংবাদিকরা কিছু কিছু কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলেও মধ্যম প্রবীণ ও অতি প্রবীণ সাংবাদিকরা প্রায় সবাই কর্মহীন। ১১ শতাংশ প্রবীণ সাংবাদিকের মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশই অসচ্ছলতা ও দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন। অনেক প্রবীণ সাংবাদিকদের এখনো কর্মশক্তি ও কর্মোদ্দম থাকলেও তারা কোনো কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে পাচ্ছেন না বা চাকরি পাচ্ছেন না। রাষ্ট্র তথা সরকার সামগ্রিক প্রবীণ সাংবাদিকদের কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি বা তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন না। দুস্থ অসহায় প্রবীণ সাংবাদিকরা কেউ কেউ সরকার বা বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক কিছু কিছু আর্থিক সহযোগিতা পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
* সারাদেশে প্রেসক্লাবগুলো বাদে প্রবীণ সাংবাদিকদের জন্য সময় কাটানো বা বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। কিন্তু প্রেসক্লাবগুলোতেও প্রবীণদের জন্য কার্যকরী কোনো বিনোদনমূলক ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।
প্রায় ৯ শতাংশ প্রবীণই সঠিক চিকিৎসাসেবা নিতে পাচ্ছেন না, সর্বোপরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
* বেশিরভাগ প্রবীণ সাংবাদিকই অসংক্রমিত রোগ যেমন- ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, দুশ্চিন্তাজনিত রোগ এবং বাত-ব্যথায় বেশি ভুগে থাকেন। জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতে প্রবীণ সাংবাদিকরা বিশেষ করে মধ্যম প্রবীণ ও অতি প্রবীণ সাংবাদিকদের মধ্যে অনেকেই মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। মোটকথা সর্বোপরি সামগ্রিক চিত্র বিবেচনা করলে বাংলাদেশে প্রবীণ সাংবাদিকরা ভালো নেই।
প্রবীণ সাংবাদিকরা যাতে ভালো থাকেন তার জন্য সরকারের কাছে আমার কয়েকটি প্রস্তাবনা রয়েছে:
১. জাতীয় বাজেটে প্রবীণ সাংবাদিকসহ অন্য প্রবীণদের জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
২. কর্মক্ষম প্রবীণ সাংবাদিকদের জন্য কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে প্রত্যেকটি মিডিয়া হাউসে প্রবীণ সাংবাদিকদের জন্য কোটা চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।
৩. বিশ্বায়নের এই যুগে যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে গড়ে উঠছে একক পরিবার প্রথা। এতে পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা অসহায় হয়ে পড়ছেন। তাই এই মুহূর্তেই বাংলাদেশে প্রতিটি জেলাতেই প্রবীণ নিবাসের প্রয়োজন রয়েছে। যেখানে সমবয়সী প্রবীণরা একসঙ্গে আনন্দে বসবাস করতে পারেন। প্রবীণ সাংবাদিকদের জন্য প্রতিটি বিভাগে সরকার কর্তৃক একটি করে ‘প্রবীণ সাংবাদিক নিবাস’ তৈরি করা যেতে পারে।
৪. সরকার এদেশের প্রবীণদের ‘সিনিয়র সিটিজেন’ ঘোষণা করেছে এবং সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে নির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে প্রবীণরা তাদের সেসব অধিকার পাচ্ছেন না। সরকার ঘোষিত সিনিয়র সিটিজেন সুবিধাগুলোতে প্রবীণ সাংবাদিকদের জন্য আলাদা সুযোগ সুবিধার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
৫. সমাজের প্রতিষ্ঠিত সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গকে প্রবীণ সাংবাদিকদের জন্য হিতৈষীমূলক কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
৬. সরকারি ও বেসরকারি যে সব প্রতিষ্ঠান, যারা প্রবীণদের নিয়ে কাজ করছে, তাদের কর্মকাণ্ডগুলোতে প্রবীণ সংবাদিকদের বিষয়টি আলাদাভাবে পরিলক্ষিত করতে হবে।
৭. প্রবীণ সাংবাদিকদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার মাধ্যমে কার্যকরী করার সুযোগ সৃষ্টির প্রতি গুরুত্বারোপ করতে গণমাধ্যম মূখ্য ভুমিকা পালন করতে পারে।
৮. প্রবীণ সাংবাদিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলোতে প্রবীণবান্ধব স্কিম বা বীমা ব্যবস্থা চালু করার জন্য প্রস্তাব প্রদান করা যেতে পারে।
৯. জাতীয় প্রেসক্লাবসহ সারাদেশের প্রেসক্লাবগুলো থেকে প্রবীণ সাংবাদিকদের আলাদা করে কার্ড প্রদান করা যেতে পারে এবং সেই কার্ডের আলোকে নানা সুযোগ-সুবিধা যেমন- মাসিক হেলথ ক্যাম্প, প্রবীণ সাংবাদিকদের জন্য আলাদা বসার জায়গা, বিনোদন, প্রেসক্লাবগুলোতে স্বপ্লমূল্যে খাবারের ব্যবস্থাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেয়া যেতে পারে।
১০. সাংবাদিকদের নানামুখী সংগঠনগুলো থেকে প্রবীণ সাংবাদিকদের স্বস্তিময় জীবন দিতে ও সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিতে বাস্তবতার আলোকে আলাদা করে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। * সারাদেশের অসহায় প্রবীণ সাংবাদিকদের জীবনের গল্প প্রকাশের মাধ্যমে সমাজের বাস্তবচিত্রটি গণমাধ্যমে সবার সামনে তুলে ধরে এক ধরনের সামাজিক আন্দোলন তৈরি করতে এবং নবীনদের প্রবীণ কল্যাণে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রবীণ সাংবাদিকদের সমস্যা সমাধানে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সবার সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। আমাদের সদিচ্ছা এবং বাস্তবমুখী নানা পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবীণ সাংবাদিকদের সমস্যার ব্যাপকতা কমিয়ে আনা অনেকাংশেই সম্ভব। তাই এখন থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। সব গণমাধ্যমকর্মী সারাদেশের প্রবীণ কল্যাণে তথা নিজ গোষ্ঠী প্রবীণ সাংবাদিকদের সমস্যা সংকট মোকাবিলায় জোরালো ভূমিকা পালন করবেন এবং সেই সঙ্গে আমরা সবাই আজ থেকেই নিজেদের স্বস্তিময় বার্ধক্যকালের প্রস্তুতি নিতে শুরু করব-এই প্রত্যাশাই করি।
ডা. মহসীন কবির