প্রবাসী নারী শ্রমিকের কান্না শোনার কেউ নেই

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে অভিবাসী নারীশ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে খুব করে ভাবছেন। বিশেষ করে বাসাবাড়ি কিংবা কর্মক্ষেত্রে অভিবাসী নারীরা বিভিন্নভাবে যৌন হেনস্তার শিকারের ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সরকারের টনক নড়েছে। তারা নারীশ্রমিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে হোস্টেলে রাত যাপনের সিদ্ধান্তে উপনীত হতে যাচ্ছেন।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে নারীশ্রমিকরা নির্বিঘ্নে রাত যাপন করবেন হোস্টেলে। সেখান থেকে সকালে বিভিন্ন কর্মস্থলে গিয়ে আবার সন্ধ্যালগ্নে হোস্টেলে ফিরে আসবেন। তাতে করে কারো বাসাবাড়িতে রাত যাপনের প্রয়োজন পড়বে না। কারণ দেশগুলোর সরকার ইতোমধ্যে জেনে গেছে তাদের নাগরিকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য; যা রীতিমতো আমাদেরকেও ভাবাচ্ছে। সেই ভাবনার বিষয়টি পরিষ্কার করে না বললে নারীশ্রমিকদের ব্যাপারে সতর্ক হতে পারব না আমরাও।

আমরা জানি, সমগ্র বিশ্বে বাঙালিদের পদচারণা ক্রমেই বেড়ে চলছে, নিঃসন্দেহে আমাদের জন্যে এটি একটি সুখবর। এই মানুষগুলো আমাদের কাছে প্রবাসী বাঙালি হিসেবেই পরিচিত। এদের কেউ কেউ ভালো অবস্থানে থেকে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেলেও অধিকাংশই শ্রমজীবী মানুষের তালিকায় রয়েছে। শ্রমজীবী হলেও তারা আমাদের কাছে অতি সম্মানিতদের একজন। আমরা জানি ট্যাঁকের টাকা খরচ করে পঁইপঁই করে ঘুরতে বিদেশে ভ্রমণে যাননি তারা, গিয়েছেন দৈহিক শ্রমের বিনিময়ে অর্থকড়ি উপার্জন করতে। যে অর্থের ভাগিদার হচ্ছি আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে।

বিশ্বদরবারে আমাদের এ শ্রমজীবী মানুষগুলোর দারুণ খ্যাতি রয়েছে। দুটি কারণে সাধারণত এ খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। বিশ্বস্ততা এবং স্বল্পমূল্যে শ্রম বিক্রি করার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে রীতিমতো বাঙালিদের জয়জয়কার শোনা যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে অপ্রীতিকর কিছু ঘটনা ঘটে থাকলেও তা ধর্তব্যের আওতায় পড়ছে না। বিদেশি প্রভুরাও তা মেনে নিচ্ছেন, আর কিছু না হোক বাঙালিদেরকে সহজে ঠকিয়ে দেয়া যায়। বাঙালিদের দেহঝরা প্রতি ফোঁটা ঘামের মূল্য গুনে গুনে পরিশোধ করতে হয় না, শুধু দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার অনুমতি মিললেই বাঙালিরা খুশি হয়ে যান। সেটি বুঝেই বিদেশিরা আমাদের শ্রমিকদের কদর করেন। কদর করেন নারীশ্রমিকদেরকেও অধিক।

বাঙালি নারীশ্রমিকদেরকে মধ্যপ্রাচ্যের ধনাঢ্যরা তাদের শয্যায় নিতে কার্পণ্যবোধ করেন না। কারণ এরা প্রতিবাদ করতে অপারগ, এছাড়া বিনিময়ে বাড়তি রিয়েল, ডলার, পাউন্ড খরচ করতে হয় না তাদেরকে। মাইনের সঙ্গেই সব হিসেব চুকিয়ে দেয়া যায়। অনিচ্ছা থাকা সত্তে¡ও আমাদের অধিকাংশ নারীশ্রমিক তা মেনে নিতে বাধ্য হন। বাধ্য হন অনাকাক্সিক্ষতভাবে গর্ভধারণ করতে। অনেকেই গর্ভপাত ঘটাতে সক্ষম হলেও কারো কারো পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। সে কারো কারো জন্যই তখন ভয়ানক বিপদটি নেমে আসে সন্তান প্রসবের মাধ্যমে।

ভূমিষ্ঠ হওয়া সন্তান নিয়ে তখন বেচারিকে পড়তে হয় নানা বিপাকে। শিশুটাকে কদিন লালন-পালন করলেও দেশে ফিরে আসার সময় হƒদয়বিদারক ঘটনার সৃষ্টি হয়। মান-ইজ্জতের ভয়ে ওই সন্তানকে ফেলে আসতে বাধ্য হন তখন মা। এতসব নির্যাতন হজম করার ফলেও ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ও দেশে ফিরতে পারছেন না নারীরা। প্রথমত চিন্তাটা থাকে নিজের ভিটেমাটি উদ্ধারের দিকে।

চিন্তা থাকে মহাজনের টাকা শোধ করতে হবে কিংবা বিক্রীত জমিনটুকু চড়া দামে কিনতে হবে। এসব চিন্তায় মুখ বুঝে সহ্য করে যান শত নির্যাতন। দেশে ফিরে বিষয়টা কাউকে বলতে পারেন না। স্বামী-সংসার হারানোর ভয়ে। অথবা বিভিন্ন ধরনের অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে বয়ে বেড়াতে হবে। সেরকম অনেক ঘটনা আমরা খবরের কাগজের মাধ্যমে ইতোমধ্যে জানতে পেরেছি। তেমনি একটি খবরের কাগজে প্রকাশিত হলে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয় তখন।

রাজশাহীর নারীশ্রমিকদের ঘটনাটি। জর্ডান ফেরত দুজন নারী জানিয়েছিলেন তারা জর্ডান গিয়েছেন একটি সংস্থার ব্যবস্থাপনায়। অতঃপর তারা খালি হাতে দেশে ফিরে আসতেও বাধ্য হয়েছেন। ওই দলে ছিলেন মোট ১৮ জন নারী। জর্ডানে ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন দুজন নারী। এই দুজন নারী জর্ডান থেকে ফেরত এলেও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে হাজার হাজার মা-বোন ফেরত আসতে পারেননি।
আমরা খবরের কাগজ মারফত জানতে পারি, ১৮ নারীকে প্রথমে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে একটি কক্ষে রাখা হয়েছিল। ওখান থেকে লোকজন এসে তাদের পছন্দ করে বাসাবাড়িতে কাজের উদ্দেশ্যে নিয়ে যায়।

জানা যায়, ওই রাতে তাদের একজন মালিকের লালসার শিকার হয়েছেন। বিষয়টা গৃহকর্ত্রীর কাছে অভিযোগ করলে তাকে বাথরুমে আটকে রাখা হয়েছিল। আরো অমানবিক বিষয় হচ্ছে বাথরুমে আটকরত অবস্থায় তাকে একটা রুটি, একগ্লাস পানি বরাদ্দ দেওয়া হয় সারাদিনের জন্যে। বিষয়টা অফিসে জানালে তাকে দ্বিতীয় একটি বাড়িতে কাজের জন্য পাঠানো হয়। দ্বিতীয় বাড়িতে কাজ করতে গিয়েও তিনি নিরাপদে থাকতে পারলেন না। একইভাবে নির্যাতনের শিকার হলেন। আবারো অফিসে অভিযোগ করলেন তিনি। এবার তৃতীয় একটি বাড়িতে পাঠালেন। একই অবস্থা সেখানেও। মোট ২২ দিনে স্বস্তি না পেয়ে তিনি দেশে আসতে চাইলে তাকে পদাঘাত করে বিমানে উঠিয়ে দেন এবং শূন্যহাতেই দেশে ফেরেন তিনি। এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে; যা ইজ্জতের ভয়ে প্রকাশ করতে পারছেন না নারীশ্রমিকরা।

উল্লেখ্য, বিদেশগামী নারীদেরকে রাজশাহী জেলার টিটিসিতে প্রশিক্ষণ দেয়ার খবরও আমরা জানতে পেরেছি। এটি অবশ্যই সংস্থাটির ভালো একটি উদ্যোগ। বিদেশ-বিভূঁইয়ে কাজকর্মের প্রশিক্ষণ নিয়ে গেলে শ্রমিকদেরকে আর পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয় না। কিন্তু দুখঃজনক বিষয় হচ্ছে, তাদেরকে সেখানে ওই ধরনের প্রশিক্ষণ না দিয়ে বরং শেখানো হচ্ছে নিরাপদ যৌনাচার, সুরক্ষা ও এইচআইভি প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতন হতে। এ ধরনের তথ্যসহায়িকাও সরবরাহ করা হয়েছিল একসময়। এমতাবস্থায় প্রশিক্ষণরত অনেক নারী আশঙ্কা করছেন গৃহপরিচারিকার নামেই কি তবে তাদেরকে মধ্যপ্রাচ্যে দেহব্যবসার জন্য পাঠাচ্ছেন! অনেক নারী প্রশিক্ষণ নেয়ার পরও জর্ডানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করেছেন পর্যন্ত এসব তথ্যসহায়িকা দেখে।

প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপরায়ণ। ধর্মভীরুতা এদেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে লক্ষ করা যায়। এরফলে নারায়ণগঞ্জের টানবাজার এবং ঢাকার ইংলিশ রোডের মতো অসামাজিক কার্যকলাপের স্থানগুলো উচ্ছেদ করতে পিছপা হননি মানুষ। ঘটনাগুলো ঘটেছে বর্তমান সরকারের বিগত সময়ে। আমরা দেখেছি তখন সরকার মানুষের নৈতিকতাবোধের বিপরীতে অবস্থান নেয়নি। গণমানুষের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়েছে। দেশের দুটি প্রধান শহর থেকে অসামাজিক কার্যকলাপকে বিদায় করেছেন মানুষ।

কিন্তু অতীব দুঃখের সঙ্গে জানাতে হচ্ছে যে, আমরা অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে প্রধান দুটি শহরকে মুক্ত করলেও জনশক্তি রপ্তানির (নারীশ্রমিকদের) মাধ্যমটাকে কলুষমুক্ত করতে পারিনি। পারিনি শক্তিশালী করতেও। বলতে হয় বিষয়টি নিয়ে আমরা ক‚টনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হইনি অদ্যাবধি। জানি না এটি কেন হয়নি। হয়তো নারীশ্রমিক রপ্তানি বন্ধের আশঙ্কায় এটি হয়নি। প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, মন্ত্রী, সিটি মেয়র ও এমপি নারীরা, সেই দেশের নারীর ইজ্জত এত ঠুনকো কেন? শুধু তাই-ই নয়, মনে রাখতে হবে এ দেশে প্রায় ২৭ বছরের অধিক নারী শাসিত। তথাপিও প্রবাসী নারীশ্রমিকদের ইজ্জত বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারিনি আমরা।

এ ব্যর্থতার দায়ভার কার কাঁধে চাপাব? নাকি সেই সময় এখনো আমাদের আসেনি? যদি এসেই থাকে মনে করি তাহলে এক্ষুনি যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে আমাদেরকে; হতে হবে সচেষ্ট। তাহলেই বোধকরি এ থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব হতে পারে। এতে করে দেশের ভাবমূর্তি যেমনি বৃদ্ধি পাবে তেমনি নারী নেতৃত্ব সার্থক হবে বলে আমাদের বিশ্বাস রয়েছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আর্কষণ করছি এবং বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ভাবার জন্যে। কারণ তিনি শুধু বঙ্গবন্ধুর কন্যাই নন, তিনি হচ্ছেন একজন সফল প্রধানমন্ত্রীও; যার দক্ষ নেতৃত্বের ফলে দেশ বিশ্বের দরবারে সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছেছে এবং উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশের তকমা লাগতে যাচ্ছে। লেখক: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণীবিশারদ

মানবকণ্ঠ/এএম