প্রদূষণ ও মানব সমাজ

পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের পরই তাকে প্রকৃতি লালন করে। মাতৃদগ্ধের প্রয়োজন ফুরাতেই তাকে প্রকৃতির ওপর নির্ভর করতে হয়। আদিম মানুষ এক সময় গুহাবাসী ছিল, জীবন ছিল যাযাবরের। ধীরে ধীরে আগুন ও তারও পরে কৃষির আবিষ্কার তাকে বনবাস থেকে অব্যাহতি দিল। কৃষির আবিষ্কারে মানুষের গৃহপালিত জন্তু ও স্থায়ী বসবাসের প্রয়োজন হলো।

মানুষের প্রয়োজন ও অভাব ভাবনাই মানুষকে অনুসন্ধিৎসু করে আবিষ্কারের পথে নামতে সহায়ক হলো। ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হলো জীবনযাপন, কৃষিক্ষেত্রে হলো পরিবর্তন, প্রয়োজন হলো অধিক উৎপাদন। বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের আবিষ্কার ঘটাল মানব সমাজের আমূল পরিবর্তন। শুরু হলো শিল্প বিপ্লবের। কুটির শিল্পের জায়গায় এলো বৃহৎ ভারি শিল্প। পানি, স্থল ও বায়ুযোগে পরিবহন হলো সহজ। মানব সমাজ এগিয়ে গেল আধুনিক যুগে। চাহিদা ও সুযোগের জন্য চলল নিত্যনতুন প্রচেষ্টা- মানুষের আহরণ ও সঞ্চয় ইচ্ছা প্রভাব বিস্তর করল পানি, বায়ু, ভূমি ও প্রাণীকুলের ওপর। মানব মনের অসীম অভিলাষ করে তুলল তাঁকে অসংযমী ও অহংকারী। সে ছিনিয়ে নিতে শুরু করল প্রদূষণ ও মানব সমাজ যা তার চাই, ভুলে গেল মাতৃবক্ষের ক্ষরণ জ্বালা।

সভ্যতার ক্রমবিকাশ, জনবিস্ফোরণ, অসীম সঞ্চয় ভাবনা, উন্নয়ন ও সুবিধা ভোগের অভিলাষ অচিরেই বয়ে আনল প্রদূষণের দুর্ভাবনা। প্রকৃতি তার বক্ষে লালিত মানুষের জ্বালা সইতে অধৈর্য হলো। প্রদূষণজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ডেকে আনল বিপদ। পৃথিবীর পরিবেশ ব্যবস্থার চার মূল উপাদান পানি, বায়ু, ভূমি ও প্রাণীকুল আজ প্রদূষণের ভয়াবহ শিকার। সামগ্রিকভাবে পরিবেশ দূষণকে তার উপাদানগুলোর দূষণের নিরিখে দেখা যায়। যথা (১) বায়ু প্রদূষণ (২) পানি প্রদূষণ (৩) শব্দ দূষণ (৪) ভূমি দূষণ।

বায়ু প্রদূষণ : বায়ু দূষণের প্রধান পাঁচটি প্রাথমিক উপাদান যার ৭০ শতাংশ বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করে। সেগুলোর অন্যতম কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন, সালফার অক্সাইড। যদিও প্রকৃতিতে একশ’ ভাগ অদূষিত বায়ুর উপস্থিতি অসম্ভব তথাপি বায়ু দূষণের ৯৫ শতাংশ কারণ মনুষ্যপুষ্ট উদ্যোগ, যানবাহন, যথেচ্ছ বন ধ্বংস। বিভিন্ন উদ্যোগে সৃষ্ট কার্বন মনোক্সাইড এমন একটি গ্যাস যার ০.৫ শতাংশ উপস্থিতি মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট। জ্বালামুখের উদ্গিরণ বনপতি ও অরণ্য দহন এবং এ জাতীয় প্রাকৃতিক বিড়ম্বনায় বায়ু প্রদূষিত করলেও প্রাকৃতিক নিয়মেই এর প্রকোপ প্রশমিত হয়। মনুষ্য সৃষ্ট দূষণ মানুষ সীমিত রাখতে পারে কেবল সঠিক অনুধাবন ও সংযমী ব্যবহারে। HNO3 এবং H2SO4 এর সঙ্গে HCL মিলে যে অ্যাসিড ঘনীভবন ও পরে অ্যাসিড বৃষ্টির সৃষ্টি করে তা কৃষি, স্মৃতিসৌধ, অট্টালিকা ইত্যাদির ভয়ঙ্কর ক্ষতি সাধন করে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মার্বেল, চুনাপাথর, শ্লেট আদি দ্বারা নির্মিত সৌধগুলো এবং আগ্রার তাজমহল এর অসুখ অ্যাসিড বৃষ্টির প্রভাবে হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। মানুষের মাত্রাতিরিক্ত লোভ, অহং পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যত যুদ্ধ ও আগ্রাসন উপহার দিয়েছে তা যে বায়ুমণ্ডলকে কিভাবে দূষিত করেছে তার পরিসংখ্যান মানুষের অস্তিত্বকে প্রশ্নচিহ্নের পাশে দাঁড় করায়।

পানি প্রদূষণ : জীবজগতের অস্তিত্বের জন্য অক্সিজেনের পরই বিশুদ্ধ পানি প্রয়োজন। পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশ বা প্রায় ১.৩ বিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার পানিমগ্ন।

প্রকৃতির সাভাবিক নিয়মেই পানি প্রদূষণ শুরু হয়। তবে শিল্প উদ্যোগ ও কারখানা, নদ-নদী, হ্রদকে ক্রমাগত দূষিত করছে। দ্রুত অপরিকল্পিত শহরীকরণ, জনবিস্ফোরণ দিনের পর দিন কঠিন ও তরল বর্জ্য জলাধারগুলোকে বিষাক্ত করছে। খনিজ নিষ্কাশন বৈদ্যুতিক প্রকল্প স্থাপন, কৃষিক্ষেত্রে রসায়ন প্রয়োগ পানিকে ব্যবহারের অনুপযুক্ত করছে। ইতিমধ্যে মানব সমাজের অন্ন ও উন্নয়নের চাহিদা ভূগর্ভস্থ পানি স¤পদের ভাগ বসিয়ে কুফল লাভ করছে।

দেশ ও জাতির প্রগতি বহুল পরিমাণে নির্ভর করে জনসাধারণের সুস^াস্থ্যের ওপর। স^াস্থ্য সুরক্ষার পূর্বশর্ত বিশুদ্ধ পানীয়জলের জোগান ও উপযুক্ত নিকাশি ব্যবস্থা। উন্নয়শীল ও অনুন্নত দেশে প্রতি বছর কয়েক লাখ নাগরিক ও শিশু পানিবাহিত সংক্রামক রোগের শিকার হন। এর মধ্যে লক্ষাধিক প্রাণও হারান।

শব্দ দূষণ : শব্দ দূষণ বলতে আমরা বুঝি অপ্রার্থিত এবং অবাঞ্ছিত শব্দ। মুক্ত বায়ুমণ্ডলে অথবা বদ্ধ ক্ষেত্রে শব্দ তখনই দূষণ সৃষ্টি করে যখন শব্দ মাত্রা কোলাহল সৃষ্টি করে এবং বিরক্তি ও অস^স্তির কারণ হয়। বিরক্তি ও অস^স্তি উৎপন্নকারী উচ্চ শব্দ জীবজগৎ ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। শব্দ পরিমাপে একক ডেসিবেল। বিশ্ব স^াস্থ্য সংস্থার মতে, শব্দসীমা মানুষের বাসস্থানের আশপাশে দিনে ৪৫ ডেসিবেল ও রাতে ৩৫ ডেসিবেল এর ভিতর হওয়া বাঞ্ছনীয়।

শব্দ দূষণের প্রধান উৎসসমূহ হলো ভারি ও মাঝারি শিল্প-ভারি ও মাঝারি নির্মাণকল্প, পরিবহন ক্ষেত্রে যানবাহন ও তাদের হর্ন, লাউডস্পিকার, বোমা ও আতশবাজি, উপগ্রহ নিক্ষেপ, বিভিন্ন প্রকার উচ্চশব্দযুক্ত বাদ্য। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র শব্দ দূষণ মানুষের বিশেষত শিশুদের ব্যক্তিত্বের বিনাশ ঘটায় এবং অসংলগ্নতার জš§ দেয়। শব্দ দূষণের প্রকোপে নানা রোগ-পাকস্থলীর ঘা, শিরঃপীড়া, স্মৃতিভ্রষ্ট, মানসিক বিকার দেখা দেয়। দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দ শ্রবণে নিদ্রাহীনতা সৃষ্টি করে, উচ্চ শব্দ মস্তিষ্কের অতিসূক্ষ্ম কেন্দ্রগুলোকে আঘাত করে নিষ্ক্রিয় করার ক্ষমতা রাখে। বিনোদনের স^ার্থে তরুণ সম্প্রদায়ের কাছে উচ্চ শব্দের বাদ্য আনন্দদায়ী বলে প্রতীয়মান হলেও তা বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তির পক্ষে অত্যন্ত অসহনীয় ও পীড়াদায়ক।

ভূমি প্রদূষণ : মানব জীবনে ভূমির সম্পর্ক তার জন্মদাতার পরেই মাটির গুরুত্ব বায়ু, পানি, আদির ন্যায় অনস^ীকার্য। অথচ মানুষ স^ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় এ মাটি বা ভূমিকে নিয়ত ব্যবহার করে এর ওপর প্রভাব ফেলেছে। দূষণ হয়েছে এর স^াভাবিকতার।

খাদ্য শস্যের বাড়তি চাহিদা ও আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে কৃষিকার্য, খনিজ উত্তোলন, শিল্প উদ্যোগ জনবসতি স্থাপন ইত্যাদি বিভিন্নভাবে মাটিকে পরিবর্তিত করে তুলছে। সর্বংসহা পৃথিবীর, সমুদ্র, নদ-নদী, মরুভূমি, মালভূমি আর সুজলা-সুফলা শস্যভূমি আজ অসুস্থতার শিকার। যে ভূমিতে এক সময় বন জঙ্গল ছিল তা কোথাও মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে, মাটির লোনার অংশে বৃদ্ধি মাটিকে ধীরে ধীরে নি®ফলা করে ফেলছে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউটের প্রাক্কলন অনুসারে মানুষের অপব্যবহার পৃথিবীর ভূমি সম্পদের ১১ শতাংশকে এরূপ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে যে, এ ভূমির শস্য উৎপাদন ক্ষমতা বহুলাংশে বিনষ্ট হয়েছে।

যদিও নির্মাণকল্প, শহরীকরণ, যুদ্ধ, খনি উত্তোলন এবং সেরূপে অন্যান্য প্রক্রিয়া ভূমিক্ষয় ও ভূমির বিভিন্ন স্তরের গঠনের পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ, তবে ভূমিক্ষয়ের অন্যতম কারণ বন ধ্বংস ও কৃষি। বন জঙ্গল ভূমিকে ঢেকে রাখে, ঘর্ষণ, রোদ, বৃষ্টি থেকে ভূমিক্ষয় রোধ করে। এ ভূমির বন ধ্বংস হলে বা কৃষি কাজ শুরু হলে বিপরীত ফল হয়। তাছাড়া উš§ুক্ত ভূমির অভ্যন্তরে কৈশিক আকর্ষণ ও বিকর্ষণে মাটিকে পানি করে লবণযুক্ত করে।

প্রদূষণ ১০০ শতাংশ নিরসন সম্ভব না হতে পারে তবে গণসচেতনতা, নৈতিক শিক্ষা, সুচারু সংযমী সম্পদ আহরণ ব্যবস্থা, পরিবেশ বিষয়ক পাঠ্যসূচি, সুস্থ বণ্টন ও দারিদ্র্য দূরীকরণ, যৌথ অংশীদারিতে বন সৃজন, পানি ও বায়ু সুরক্ষা আইন, জীববৈচিত্র্যের অনুকূলে প্রকল্প গ্রহণ, ভূমি সংরক্ষণ ব্যবস্থা সর্বোপরি নিয়ন্ত্রিত ও সংযমী মানব স¤পদ উন্নয়ন প্রদূষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা সৃষ্টি করতেও পারে। প্রতিটি মানুষের সদিচ্ছা ও স^চেষ্টায় বায়ু, পানি, ভূমি ও সমাজকে দূষণ মুক্ত রাখা সম্ভব। নিজের জন্যই প্রত্যেকের এ বিষয়ে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন আবশ্যক। সমাজবদ্ধ জীব মানুষ তার সুবুদ্ধি, সংহত চেতনা ও উদ্যমের সঙ্গে পরিবেশকে সুরক্ষা করতে পারে। – লেখক : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

মানবকণ্ঠ/এএএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.