প্রথম হইয়াও প্রথম পুরস্কার পাইলেন না প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

প্রথম হইয়াও প্রথম পুরস্কার পাইলেন না প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

আচার্য প্রফুল্ল রায়ের জন্ম ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট, রবীন্দ্রনাথের জন্মের তিন মাসের মধ্যে, খুলনার পাইকগাছা উপজেলায়। তিনি যখন কলকাতার মেট্রোপলিটন কলেজে (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) বি.এ ক্লাসের ছাত্র, তখন গোপনে ইংল্যান্ডের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গিলক্রাইস্ট স্কলারশিপের’ জন্য পরীক্ষা দেন এবং স্কলারশিপটা পান। তখন চারধারে হৈচৈ পড়ে যায়। ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকায় কৃষ্ণদাস পাল তার ভূয়সী প্রশংসা করে একটি প্রবন্ধ লেখেন। ১৮৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি বিলেত যাত্রা করেন এবং অক্টোবরে এডিনবার্গ পৌঁছেন। তার বিষয় ছিল রসায়ন। ১৮৮৫ সালে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার স্ট্রাফোর্ড নর্থকোট একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার ঘোষণা দেন। বিষয় ‘ইন্ডিয়া বিফোর অ্যান্ড আফটার মিউটিনি’ (India Befor and After Mutiny)। স্যার নর্থকোট এক সময় ভারতের সেক্রেটারি অব স্টেট ছিলেন। প্রফুল্ল চন্দ্র উক্ত প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই উদ্দেশ্যে ভারতের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অবস্থার ওপর ব্যাপক পড়াশোনা শুরু করেন। লেখাটি লিখতে যে সময় ও পরিশ্রমের প্রয়োজন ছিল, একজন রসায়নের ছাত্র হিসেবে তার কিছুই পাননি।

ক্লাস ও ল্যাবরেটরির ফাঁকে ফাঁকে যেটুকু সময় পেতেন, সেই সময়টুকুর সদ্ব্যবহার করে এই বিশাল প্রবন্ধটি লেখেন। রসায়নের ছাত্রের পক্ষে প্রাচীন গ্রিস থেকে বর্তমান পর্যন্ত অজস্র তথ্যে ঠাসা প্রবন্ধটি পড়লে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। সরবরাহকৃত প্রতিটি তথ্যের মধ্যে সুপ্ত ছিল তার স্বদেশপ্রেম এবং ইংরেজ শাসনের প্রতি তার ক্ষুব্ধ মনোভাব। সময়টা মনে করুন। সে বছর ইংরেজের সঙ্গে দেনদরবার করে ভারতীয়দের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা আদায় করার জন্য ইংরেজদেরই সহায়তায় গড়ে ওঠে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। সে সময় ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলা ছিল দেশদ্রোহিতার শামিল। সেই সময় খোদ ইংল্যান্ডে বসে প্রফুল্ল চন্দ্র যা লিখেছেন, সেটাই তার সাহসের মস্ত বড় পরিচয়। রায়ের বয়স তখন চব্বিশ। বিচারকবৃন্দ তার প্রবন্ধটিকেই শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেন কিন্তু সঙ্গত কারণে তাকে সে পুরস্কারটি দেয়া হয়নি। রাজনীতি ও দেশপ্রেমের দৃঢ়তা লক্ষ্য করে বিচারকবৃন্দ অবাক হয়ে যান। জনৈক বিচারক প্রফেসর সুঈর ছাত্রদের সামনে রায়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন। কিন্তু রায় দমে যাননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় ছাত্রদের সাহায্যে অনেক খড়কাঠ পুড়িয়ে প্রবন্ধটি একটি বই আকারে প্রকাশ করতে সমর্থ হন। প্রবন্ধটিতে প্রকারান্তরে তিনি ভারতের স্বাধীনতা দাবি করেছিলেন। ব্রিটিশ সংসদের প্রখ্যাত সদস্য জন ব্রাইটকে বইটির একটি কপি পাঠিয়েছিলেন।

একজন ভারতীয় ছাত্রের রাজনৈতিক জ্ঞান ও প্রখর যুক্তিজাল বিস্তারের ক্ষমতা দেখে তিনি বিস্মিত হয়ে যান এবং সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তর দেন। রায়ের প্রতি সহানুভূতির নিদর্শনস্বরূপ তিনি তাকে তার চিঠিটা যে কোনোভাবে ব্যবহারের অনুমতি দেন। রায় তখন চিঠিটা ছাপানোর জন্য বিভিন্ন ব্রিটিশ সংবাদপত্রে প্রেরণ করেন। চিঠির শিরোনাম দিয়েছিলেন ‘একজন ভারতীয় ছাত্রের কাছে জন ব্রাইটের চিঠি’ (Letter of John Bright to an Indian student). লন্ডন টাইমসে চিঠিটি ছাপা হলে প্রফুল্ল রায় রাতারাতি বিপুল খ্যাতির অধিকারী হন। রয়টার সে চিঠি ভারতীয় কাগজে ছাপানোর জন্য প্রেরণ করে। কিন্তু বইটি কখনো ভারতে ছাপা হয়নি। বইটি এডিনবার্গে ছাপা হয় ১৮৮৬ সালে। রায়ের পঞ্চাশতম মৃত্যুবার্ষিকীতে কলকাতার ‘রামমোহন লাইব্রেরিতে ফ্রি রিডিং রুম’ বইটি ভারতীয় পাঠকের উদ্দেশ্যে প্রথম প্রকাশ করে ১৯৯৫ সালে। মাঝখানের ১০৮ বছর ভারতবাসী বইটি থেকে বঞ্চিত ছিল। ১৩১ বছর পরে আজ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ১৫৭তম জন্মবার্ষিকীতে বইটির পরিচয় বাংলাদেশের মানুষের সামনে উপস্থিত করতে পেরে আমি ধন্য।

বইটা তিনি নিজ নামে ছাপেননি। লেখক ‘একজন ভারতীয় ছাত্র’ (By an Indian Student)। বইটি প্রকাশ করেন এস. লিভিংস্টোন প্রকাশক, ১৫, টেভিয়ট প্লেস, এডিনবার্গ। বইটি তিনি এডিনবার্গ ছাত্রদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। বই হিসেবে ১৩৪ পৃষ্ঠার বই মোটেই বড় নয়। কিন্তু প্রবন্ধ হিসেবে অবশ্যই বড়। এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গপত্রে বলেন, প্রবন্ধ হিসেবে এটি সফলকাম হয়নি ঠিকই, কিন্তু আমি প্রবন্ধটি আপনাদের গোচরে আনছি। কারণ এটি পড়ে আপনাদের মধ্যে ভারত সম্পর্কে সামান্য আগ্রহের জন্ম হবে। বলেন যে, আজ ভারতের শোচনীয় অবস্থার জন্য দায়ী ভারত সম্পর্কে ইংল্যান্ডের নিন্দনীয় নিস্পৃহতাও তাদের গুরুতর ঔদাসীন্য। ভারতের প্রতি তাদের কর্তব্য পালনে ইংল্যান্ড ব্যর্থ হয়েছে- ভয়ঙ্করভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তাই বইটি আমি ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের উঠতি প্রজন্মের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি যেন আপনারা বড় হয়ে এর একটা সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে পারেন। ভারত ও ইংল্যান্ডের মধ্যে সম্পর্ক যেন আরো আন্তরিক ও ঘনীভূত হয়। সাম্রাজ্যের হাল ধরে আপনারা ২৫০ মিলিয়ন ভারতবাসীর প্রতি সদয় দৃষ্টি দেবেন এবং বর্তমানের অ-ইংরেজসুলভ শাসকশ্রেণির মৃত্যুঘণ্টা বাজাবেন এবং উজ্জ্বলতর ও সুখী ভারতের নতুন প্রভাতের দ্বার উন্মুক্ত করবেন।

দুই.
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথশীল ও আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়- এই তিন মনীষী ভারত ইতিহাসের ওপর এক নতুন উজ্জ্বল আলো ছড়ান। প্রফুল্ল চন্দ্র কেবল স্বপ্নদ্রষ্টা মানবতাবাদী ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথের মতো তারও ছিল দেশ ও জনগণের ওপর অপার ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। কিভাবে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ বন্ধ হয়ে আছে, সে বিষয় বর্তমান প্রবন্ধে বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে। তিনি ঋষীর মতো জীবনযাপন করতেন কিন্তু মনের দিক থেকে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক। তবে তিনি তার প্রবন্ধের মধ্যে শতচেষ্টা করেও জাতীয়তাবাদী চেতনা লুকিয়ে রাখতে পারেননি। তাই তার ভাগ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রবন্ধের প্রথম পুরস্কারটি জোটেনি। তিনি যদি জনৈক ভারতীয়ের মতো “Englands work in India” বই লিখতে পারতেন, তাহলে তার বইটিও উক্ত বই-এর মতো ইংরেজ সরকার হাই স্কুলের পাঠ্যসূচিতে স্থান দিত।

‘ভারতের দারিদ্র্য: তার কিছু কারণ এবং তা থেকে উদ্ধারের উপায়’ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে প্রথমেই স্যার জন কেরির বিখ্যাত উক্তিটির উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘ব্রিটিশদের অধীনে দরিদ্র কৃষকশ্রেণির কাছ থেকে আদায়কৃত রেভিনিউ-এর অপচয় এবং যুদ্ধের ফলে অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন সম্ভব হয়নি।’ ‘ইন্ডিয়া অফিস’ থেকে প্রকাশিত ‘নীল বইতে’ বলা হয় ‘শতাব্দীর (উনিশ) শুরু থেকে এ পর্যন্ত ষোলো মিলিয়ন মানুষ না খেয়ে মারা গেছে অর্থাৎ প্রতি পাঁচ বছরে এক মিলিয়ন মানুষ ভারতের মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এদেশের ঐত্যবাহী সেচ ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়। কিন্তু নতুন কোন সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় না। ‘আমেরিকার কৃষি বিভাগ’ থেকে প্রকাশিত তথ্যও প্রবন্ধে সরবরাহ করা হয়। ‘উক্ত রিপোর্টে বলা হয় যে অনাদিকাল থেকে তাঁত শিল্প ছিল ভারতের শিল্পাঞ্চল। সেটা গুঁড়িয়ে দেয়া হয় ইংল্যান্ডের কলে তৈরি কাপড়ের বাজার তৈরি করার জন্য। রায়ের আধুনিক মনের পরিচয় পাওয়া যায় যখন তিনি বলেন যে, ভারতের দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ হলো যে ভারতকে আজও কৃষির ওপরই নির্ভর করতে হয়। কুটির শিল্প ধ্বংসের ফলে তাঁত শিল্পীরা কোনো আধুনিক শিল্পাঞ্চলে যাওয়ার সুযোগ পায় না। গ্রামে গিয়ে পুনরায় কৃষি কাজেই নিয়োজিত হতেন। এটা যে আধুনিক পুঁজিবাদবিরোধী সে কথা ভালোভাবেই বিশ্লেষণ করেছেন প্রফুল্ল চন্দ্র। কিন্তু ব্রিটেনে এর উল্টোটি ঘটে। তাই সেখানে শিল্প-বিপ্লব ঘটে। ব্রিটিশ নীতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। তাই তিনি এদেশের শিক্ষিতশ্রেণিকে দোষারোপ করেন এই বলে যে, তারা শিল্প ও ব্যবসায়ে মনোযোগী হয়নি। এ বিষয়ে অনেক আগে তিনি একটি প্রবন্ধ লিখে মনের এই ক্ষোভের কথা উল্লেখ করেন। নাম “Misusi of Beugali Brain”। রবীন্দ্রনাথও বাঙালির বিরুদ্ধে এই একই অভিযোগ তুলেছিলেন। বাঙালির মন বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-শিল্প-ব্যবসাবিরোধী। ‘বাণিজ্যেতে যাবই’ বলে রবীন্দ্রনাথ ছেলেকে আমেরিকা থেকে কৃষির ওপর বিদ্যালাভের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আর প্রফুল্ল চন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস ও ফার্মাসিউটিক্যালস ওয়ার্কস।’ এটি বাঙালির শিল্পোদ্যোগের প্রতীক। তিনি মারকিউস নাইট্রেট আবিষ্কার করেন।

প্রফুল্ল চন্দ্র ঋষীর মতো জীবনযাপন করতেন। তার চাহিদা ছিল সামান্য। প্রয়োজনটুকু রেখে বেতনের টাকা জনহিতকর কাজে এবং দরিদ্র ছাত্রদের জন্য খরচ করতেন। ‘যশোর-খুলনার ইতিহাস’ রচয়িতা সতীশ চন্দ্র মিত্র বই-এর ভূমিকায় জানান যে, প্রফুল্ল রায় ও তার পরিবারের সাহায্য ছাড়া পঁচিশ বছর ধরে তার পক্ষে এই গবেষণা পরিচালনা সম্ভব হতো না।

তিন.
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। রবীন্দ্রনাথ ও প্রফুল্ল চন্দ্র কেউই তাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি। ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ ও ১৯৪৪ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র মারা যান। ঔপনিবেশিক শাসনাবসানের পর সত্তরটা বছর পার হয়ে গেছে। কাজেই এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, এই সত্তর বছরে স্বাধীন ভারতের অর্জন কী? এ নিয়ে বেশি কথা বলার সুযোগ এখানে নেই। সংক্ষেপে বলি। ১৯৫০ সালে সংবিধান প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করে ভারত ১৯৫২ সাল থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে আসছে যা গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ বলে স্বীকৃত। তাই ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম সংসদীয় গণতন্ত্র বলে স্বীকৃত। গত নির্বাচনেও মোদির বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। মোদি সরকারকে কোনোমতেই অগণতান্ত্রিক সরকার বলা যাবে না। কিন্তু মোদি সরকার গত সাড়ে চার বছরের শাসনে দেশকে কোথায় নিয়ে গেছে তার একটা হিসাব নিলে আত্মতুষ্টির কোনো উপায় থাকে না। নিজের ব্যক্তিগত মতামত বলব না।

গত ৯ জুলাই রোববার ২০১৮ নয়াদিল্লিতে জঁ দ্রেন্ধের সঙ্গে যৌথভাবে লেখা অমর্ত্য সেনের ‘অ্যান আনসার্টেন গ্লোরি: ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইটস কনট্রাডিকশন’-এর হিন্দি ভার্সনের প্রকাশনা উৎসবে উভয়ে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ এনেছেন। অমর্ত্য সেন বলেন, ‘দেশকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। পাকিস্তান আমাদের বাঁচিয়ে দিল নিকৃষ্টতম হওয়া থেকে।’ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৫ জুলাই, ২০১৮)। নিচের দিক থেকে ভারতের অবস্থান আজ দ্বিতীয়। মোদির শিক্ষানীতিকে আক্রমণ করে দ্রেজ বলেন, ‘দেশের চূড়ান্ত বৈষম্য মেটাতে সকলের জন্য উন্নতমানের শিক্ষাই দরকার। কিন্তু গত পাঁচ বছরে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে কোনো বড় পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।’

তাদের বক্তব্যের মাত্র চারদিন পর ১২ জুলাই, ২০১৮ ভারতের লোকসভার সদস্য শশী থারুর ‘টাইম অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় লিখেছেন, ‘২০১৯ সালের নির্বাচনে যদি বিজেপি জয়লাভ করে, তাহলে ভারত হবে ‘হিন্দু পাকিস্তান।’ আরো বলেন, ‘বিজেপি বর্তমানের গণতান্ত্রিক সংবিধান ছিঁড়ে ফেলে হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংবিধান প্রণয়ন করবে।’ ১৯৪৭ সালের পর দেশের কোনোই উন্নতি হয়নি, একথা তিনি স্বীকার করেন না। বলেন, ‘১৯৪৭ সালে দেশে শিক্ষিতের হার ছিল শতকরা ১৭ ভাগ, এখন তা শতকরা ৭৯ ভাগ। সে সময় দারিদ্র্যের হার ছিল ৯০ শতাংশ, আজ তা ২০ শতাংশ। সে সময় মানুষের গড় আয়ু ছিল -২৭, আজ প্রায় ৭০। তাদের এই বক্তব্য প্রমাণ করে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র আজ সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসের কাছে জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘ সত্তর বছর গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমেই আজ ‘গণতন্ত্র’ ধ্বংস হয়ে গেছে। আজ ভারত হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হতে চলেছে। অর্থনৈতিক উন্নতির অগ্রযাত্রা হয়েছে। কিন্তু তা বৈষম্যের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের অনেক নিচে ভারত।

চার.
সবশেষে বলতেই হয় ঔপনিবেশিক শক্তি এদেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে নিয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র একটি জনকল্যাণমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারল কেন? রবীন্দ্রনাথ ও প্রফুল্ল চন্দ্রের দুঃখ মিটিয়েছে স্বাধীন ভারত। বাংলা তথা ভারতবাসী আজ শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রথম সারিতে স্থান করে নিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যই আজ সারা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তার বাইরে থাকা কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব নয় আজ। কিন্তু উত্তর-উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রসমূহ সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের উদ্বোধন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। দীর্ঘ সত্তর বছর গণতন্ত্র চর্চার পর আজ ভারত সরকার রবীন্দ্রনাথ ও প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের আকাক্সক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ভারত আজ সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসের পথে পা বাড়িয়েছে। প্রফুল্ল চন্দ্র ছিলেন এত আত্মভোলা মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি। স্বাধীন ভারবর্ষে তার ১৮৮৬ সালের স্বপ্ন হারিয়ে গেছে।
লেখক : সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মানবকণ্ঠ/এসএস