প্রজন্ম ঠিকই পথ খুঁজে নেবে

প্রজন্ম ঠিকই পথ খুঁজে নেবে

সম্প্রতি আমরা এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখেছি। স্কুলের শিশুরা আমাদের মনে দাগ কেটে দিয়েছিল। সহপাঠী হারানোর শোককে ওরা শক্তিতে পরিণত করে দেখিয়েছিল-আমরাও পারি অনিয়মের শিকল ভাঙতে। অন্যান্য দৃশ্যের মতো সেই দৃশ্যও হারিয়ে গেছে। নোংরা থাবা আর কুচক্রে সেই দাগের রেখা নিয়ে শেষে শঙ্কাই জেগেছিল, নিরাপদে শিশুরা ঘরে ফিরতে পারবে তো? শঙ্কা দূর হয়েছে, বড় কোনো অঘটনের আগেই তারা মায়ের কোলে ফিরেছে। কিন্তু ফেরার আগে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে যে পথ দেখিয়েছিল, ভেবেছিলাম সেই পথ মসৃণ হবে। আমরা চোখ বন্ধ না করে খুলে রাখব। খুলে রাখব দখিনা জানালা, যাতে হাওয়া আসতে পারে। তা হয়নি। আমরা আবারো ফিরে গেছি পুরনো নিয়মে। আবারো আমাদের প্রতিদিন সড়কে হত্যাকাণ্ডের খবরের ভেতরে ডুবে যেতে হচ্ছে। খবরের কাগজের পাতা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে হচ্ছে। এই ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা, এই যে উট পাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে থাকার চেষ্টা তা কি আদৌ সফল? তা আমাদের কি স্বস্তি দিচ্ছে?

উৎসবের আনন্দে মানুষ পাশে চায় প্রিয়জনকে। তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে চায়। তাই ছুটে চলে। কিন্তু সেই ছুটে চলার পথে-ঈদের কয়েকদিনের ছুটিতে সারাদেশের সড়কে ঘটেছে অসংখ্য দুর্ঘটনা। নামে দুর্ঘটনা হলেও যার বেশিরভাগকেই দুঘর্টনা বলা যায় না। সংবাদপত্রে আসা প্রতিবেদনে গত সাত দিনে সারাদেশে সড়কে ১০৯ জন নিহতের কথা বলা হয়েছে। আহতের সংখ্যা গুণতিতে যে নেই, তাও সহজেই অনুমেয়। সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে নাটোরের লালপুরে। বাস-লেগুনার সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে ১৫ জন। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বলছে লেগুনার চালক গাড়ি চালানোর সময় তার সেলফোনে কথা বলছিল। নিহত শতাধিক মানুষের মধ্যে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ত্রিশজন। অন্য একটি পরিসংখ্যান বলছে, দেড় বছরে সড়কে প্রাণ হারিয়েছে চার হাজার নয়শত ৬৬ জন। এর মানে যে কোনো প্রাণঘাতী রোগের চেয়ে সড়ক দুর্ঘটনা এগিয়ে। নানারকম প্রতিষেধক আবিষ্কার, পর্যাপ্ত এবং সহজলোভ্য ওষুধ প্রাণঘাতী রোগে মৃত্যুর হার কমিয়ে এনেছে। অথচ আধুনিক জীবন আমাদের যে গতি দিয়েছে, সেই গতিই এখন সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হয়ে দেখা দিয়েছে। এর কারণ আমরা এই আধুনিকতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি। আধুনিক জীবনের জন্য যে নিয়ম-কানুন তা মেনে চলতে পারিনি। গতির নাগাল আমরা পেয়েছি, কিন্তু গতির নিয়ন্ত্রণে আমাদের ব্যর্থতা রয়েছে। সড়ক উন্নয়নের পেছনে আমাদের যে বরাদ্দ। সড়কের নিরাপত্তার জন্য সেই অনুপাতে বরাদ্দ নেই। সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে সেই গতি নেই। শুধু নেই আর নেই। কারণ সড়কে চলা অধিকাংশ গাড়ির ফিটনেস নেই। চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। নিয়ম মানার বালাই নেই। তবে এই নেই-এর মাঝেও একটি বিষয় আশার সঞ্চার করেছে। শিশুদের আন্দোলনের শিক্ষা আমরা পুরো যে ভুলে বসে নেই, তার আলামত কোথাও কোথাও মিলছে।

ঈদের আগে মহাসড়কে থাকে বাড়তি গাড়ি। ফলে ঘরমুখো মানুষের পথেই কেটে যায় অনেক সময়। সবেধন নীলমণি তিন দিনের সরকারি ছুটির অর্ধেকের বেশিই কাটে পথে। তবু মানুষ ঘরে ফিরতে চায়। এই ঘরমুখো মানুষের দলে আমিও। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম আমাদের সব মহাসড়কে ঈদযাত্রায় ভোগান্তি হয়। এর পেছনে সড়কের বেহাল দশা যতটা না দায়ী তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী আমাদের নিয়ম না মানার প্রবণতা। ছুটির শুরুতে সপরিবারে উত্তরের মহাসড়ক ধরে বাড়ি ফিরছি। গাড়ির স্বাভাবিক গতি নেই। চলছে থেমে থেমে। এর মাঝে আমাদের ছোটগাড়ি ফাঁক-ফোকর খুঁজে নিয়ে এদিক-ওদিক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। পথ তৈরি করে নিচ্ছে। কখনোবা উল্টো লেন ধরেও। আমরা চুপচাপ থাকলেও, আমার সাত বছরের ছেলে বারবার বলছে, বাবা, গাড়ি অন্যদিক দিয়ে যাচ্ছে কেন? তুমি কিছু বলো না? কেউ কিছু বলে না? তুমি না বলো-বিদেশে এরকম করলে জরিমানা করা হয়। শাস্তি পায় চালক। এখানে তো কিছুই হচ্ছে না। সারাদিন হিন্দি কার্টুন ‘মোটুপাতলু’ দেখা ছেলে, সারা পথ এ রকম নানান নীতিকথায় ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে আমাদের। হঠাৎ টাঙ্গাইলের কাছাকাছি কোথাও আমাদের গাড়ির চালক একটু ফাঁক পেয়েই উল্টো লেনে উঠে বাড়িয়ে দিল গাড়ির গতি। কিছুটা এগুলোও ভালোভাবে। কিন্তু বিধিবাম। সামনে মৃত্যুদূত হয়ে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক পুলিশের সদস্য। হাতের লাঠি উঁচিয়ে আটকে দিলেন গাড়ির গতি। চালককে বললেন, গাড়ি ঘুরিয়ে পেছনে নিয়ে যেতে, না হলে রেকার করবেন। চালক রাজি না। নানান অনুরোধ, ওস্তাদ-ছেড়ে দেন, সামনের চিপা দিয়ে ঢুকে যাব। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য কোনোভাবেই ছাড়লেন না। অবশেষে নিরস মুখে গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে বাধ্য হলো আমাদের চালক। আমার ছেলে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। বলে উঠল-বাবা, এতদিন সিংগাম স্যারের মুখে শুধু শুনে এসেছি ‘কানুনকো হাত বহুত লাম্বে হতে হ্যায়’ আজ তার প্রমাণ দেখলাম। ছেলের মুখে হাসি ফুটল। আমিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম, যাক-সভ্যতার অগ্রযাত্রায় আমার মতো অসচেতন মানুষ পথ চললেও আমাদের আগামী প্রজন্ম ঠিকই- তাদের সঠিক পথ খুঁজে নেবে।
-লেখক: সাংবাদিক, কবি

মানবকণ্ঠ/এসএস