পোল্ট্রিতে বিশাল সম্ভাবনা

গার্মেন্টস শিল্পের পরই এ দেশের বিশাল সম্ভাবনাময় খাত হচ্ছে পোল্ট্রি। ’৮০-এর দশকে গুটিকয়েক মানুষ এ ব্যবসা শুরু করে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তা এখন দাঁড়িয়ে আছে শক্ত ভিতের ওপর। বর্তমানে এখাতে কর্মরত আছে ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ। তাদের ৪০ শতাংশই নারী। নারীর ক্ষমতায়ন ও আর্থিক সচ্ছলতায় এটা অনেক বড় ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে এ খাতে বিনিয়োগ অর্থের পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ২০৩০ সালে এতে কর্মসংস্থান হবে ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষের। মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এ খাত। জাতীয় অর্থনীতিতে এ শিল্পের অবদান ২ দশমিক ৪ শতাংশ।

পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশের পোল্ট্রি শিল্পে সরাসরি ২৫-৩০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের মতে ২০৩০ সালে এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যাবে। আবার পোল্ট্রি শিল্পে নিয়োজিত জনশক্তির শতকরা ৪০ ভাগই নারী। ফলে পরিবারে নারীদের স্বাবলম্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নে বিশেষ অবদান রাখছে। বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতিতে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) জানায়, পোল্ট্রি শিল্পের অবদান প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ; যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সারাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার ছোট-বড় খামার আছে। বর্তমানে দেশে মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৮৫১ টন। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ থেকে ২ কোটি ২৫ লাখ ডিম উৎপাদিত হচ্ছে।

সংগঠনের সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, ‘২০২১ সাল নাগাদ এ খাতে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।’ সারাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার ছোট-বড় খামার আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১৪ সালে দেশে বার্ষিক ডিম উৎপাদন ছিল ৬৩৯ কোটি, ২০১৫ সালে ৭১২ কোটি এবং ২০১৬ সালে ডিম উৎপাদন ছিল ৮২১ কোটি। ২০২১ সাল নাগাদ বার্ষিক ডিমের চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৪৮০ কোটি। দেশীয় পুঁজি এবং দেশীয় উদ্যোগে তিলে তিলে গড়ে ওঠা পোল্ট্রি শিল্পটি দেশের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখছে।

এফএওর মতে জনপ্রতি ন্যূনতম ডিম খাওয়া উচিত বছরে ১০৪টি। উন্নত দেশগুলোতে জনপ্রতি গড়ে প্রায় ২২০টির মতো ডিম খাওয়া হয়। জাপানে জনপ্রতি ডিম খাওয়ার পরিমাণ বছরে প্রায় ৬০০টি। অথচ বাংলাদেশে বছরে মাথাপিছু ডিম খাওয়ার হার বর্তমানে প্রায় ৭০টি। অনুরূপভাবে, মাছ ও মাংস মিলে বছরে প্রাণিজ আমিষ খাওয়া দরকার বছরে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ কেজি। কিন্তু বাংলাদেশে এর হার প্রায় ২৩ কেজি (মাংস ৮ কেজি, ১৫ মাছ)। সুষম খাদ্যের মধ্যে ডিম প্রথম সারির একটি খাদ্য। ডিম রক্তে লোহিত কণিকা তৈরি করে। ডিমে আছে ভিটামিন এ, ই, বি৬, বি১২, ফোলেট, ফসফরাস, প্রায় সব ধরনের ক্যালসিয়াম, আইরন, জিংক, ম্যাঙ্গানিজ, সেলিনিয়াম, থিয়াসিন, এমিনো এসিড ইত্যাদি। একটি সিদ্ধ ডিম থেকে প্রায় ৮০ ক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। বর্তমানে সাধারণ দরিদ্রও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য কম দামে প্রাণিজ আমিষের জোগান দিচ্ছে এ শিল্প। শিশুর পেশী গঠন ও মেধার বিকাশ, শ্রমজীবী মানুষের শক্তির যোগান দেয়াসহ সর্বোপরি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। মানুষের আয় বৃদ্ধি ও জীবনমানের উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আগামীতে পোল্ট্রির চাহিদা অনেক বৃদ্ধি পাবে। সেই চাহিদা মেটানোর জন্য পোল্ট্রি উৎপাদনে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা দরকার। এর জন্য দরকার পোল্ট্রি শিল্পের সমস্যাগুলোর আশু সমাধান। দরকার পোল্ট্রি শিল্পের দ্রুত বিকাশ। সে লক্ষ্যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকা দরকার। তবে পোল্ট্রি শিল্পের মালিক ও শ্রমিকদের উচিত হবে দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদন পরিচালনা করা। এতে উৎপাদন খরচ কমবে, বাজার সম্প্রসারিত হবে, মুনাফা বৃদ্ধি পাবে। নতুবা দেশের গরিব ভোক্তাদের ও ছোট খামারিদের অদক্ষতার মাশুল গুনতে হবে। ডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার জানান, দেশে বর্তমানে মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৭০০ টন। প্রতিদিন ডিম উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় দুই থেকে সোয়া দুই কোটি। একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চার সাপ্তাহিক উৎপাদন প্রায় এক কোটি। ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মনসুর হোসেন বলেন, পোল্ট্রি ফিডের বার্ষিক উৎপাদন ২৭ লাখ টন। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ফিড মিলে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ২৫ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টন এবং লোকাল উৎপাদন প্রায় ১ দশমিক ৫০ লাখ। তিনি বলেন, বর্তমান বাজারে মুরগির মাংস ও ডিম সবচেয়ে নিরাপদ খাবার। মুরগির বিষ্টা দিয়ে এখন বায়োগ্যাস ছাড়াও তৈরি হচ্ছে জৈব সার।

সূত্র জানায়, দেশের পোল্ট্রি শিল্প বেশকিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্টদের কথা থেকেই বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। পোল্ট্রি শিল্পের সাতটি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, মাত্র তিন দশক আগেও পোল্ট্রি একটি শতভাগ আমদানিনির্ভর খাত ছিল। কয়েক বছর আগে সরকার এ শিল্প খাতটিকে কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করে। সরকার প্রদত্ত এ সুবিধার কারণেই ২০০৭, ২০০৯ এবং ২০১১ সালে বার্ড ফ্লুর ভয়াবহ সংক্রমণে এ শিল্পের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রায় ৫০ শতাংশ খামার বন্ধ হওয়ার পরও এ শিল্পের অগ্রগতি থেমে থাকেনি।

পোল্ট্রি খাতে আর একটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, চলতি অর্থবছর থেকে পোল্ট্রি শিল্পের ওপর আয়কর, বেশকিছু কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক, অগ্রিম আয়করসহ (এআইটি) আরো বেশকিছু রেগুলেশনস নতুন করে আরোপিত হয়েছে। বিপিআইসিসির যুগ্ম-আহ্বায়ক শামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, মূল চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে পোল্ট্রি পণ্যের দাম ক্রেতার জন্য সহনীয় রাখা কিংবা প্রাণিজ আমিষের মধ্যে সবচেয়ে সস্তায় ডিম ও মুরগির মাংসের সরবরাহ নিশ্চিত করা। দাম সহনীয় রাখা তখনই সম্ভব যখন অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই অধিকাংশ কাঁচামালের চাহিদা মিটবে, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে কোনো শুল্ক আরোপ করা হবে না, চাহিদা পূরণ ও উৎপাদন বাড়ানোর স্বার্থে সরকার ক্ষেত্র বিশেষে প্রণোদনা প্রদান করবে, নতুন করে কোনো করের বোঝা বাড়বে না। মোটকথা উৎপাদন খরচ বাড়বে না, প্রসেসড ফুডের মার্কেট বাড়বে, রফতানির মাধ্যমেও আয় বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কাঁচামালের মধ্যে কেবলমাত্র ভুট্টাই দেশীয়ভাবে উৎপন্ন হচ্ছে, তাও মোট চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ। বাকি সবকিছুই আমদানি করতে হচ্ছে। হাতেগোনা কিছু ওষুধ দেশে তৈরি হচ্ছে, বেশিরভাগই আসছে বাইরে থেকে। কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। আয়কর এবং অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হয়েছে। কাস্টমস জটিলতায় বন্দরে মাল আটকে পড়ে থাকছে। বাজার ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে। ব্যাংকের সুদের হারও বেশি। বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে দেশীয় খামারিরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিইএ) মহাসচিব ডা. এমএম খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ২০২১ সাল নাগাদ জনপ্রতি বার্ষিক ডিম খাওয়ার গড় পরিমাণ ১০৪টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে। প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে সরকারের এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে ২০২১ সাল নাগাদ দৈনিক প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ডিম এবং দৈনিক প্রায় ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন মুরগির মাংস উৎপাদনের প্রয়োজন হবে। বিনিয়োগ দরকার হবে প্রায় ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকা। প্রাসঙ্গিক কারণেই বাস্তবসম্মত স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা সংশোধনের প্রয়োজন হবে। তা ছাড়া নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে সামগ্রিকভাবে পোল্ট্রি খাতে আরো বেশি আধুনিকায়ন এবং মানোন্নয়নের প্রয়োজন হবে।

মানবকণ্ঠ/এআর

Leave a Reply

Your email address will not be published.