পেশিশক্তি দমন ও কালো টাকা রোধে আইন চায় ইসি

পেশিশক্তির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা এবং কালো টাকার অবাধ ব্যবহারের মাধ্যমে নির্বাচনে নিজেদের বিজয় সুনিশ্চিত করতে চায় রাজনৈতিক দলগুলো। যে কারণে ভোটে সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাইসহ অন্য অনিয়মগুলোও বেড়ে যায়। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও এ কারণে ‘ফেয়ার নির্বাচন’ জাতিকে উপহার দিতে পারে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাই আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে এ বিষয়টির ওপর জোর দেয়া হবে। কেএম নুরুল হুদা নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন মনে করে, ভোটের সিংহভাগ অনিয়ম কমে আসবে পেশিশক্তি ও কালো টাকার ব্যবহার বন্ধ করতে পারলে। সংসদ নির্বাচনের জন্য ইসির করা চূড়ান্ত রোডম্যাপে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণে আরপিওতে আইনের সংস্কার আনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আরো ৭টি বিষয়ে প্রাধান্য দিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে কমিশন। বই আকারে তৈরি করা এই কর্মপরিকল্পনা আজ রোববার সবার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।

ইসির পরিচালক (জনসংযোগ) এসএম আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় একাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হবে। এ রোডম্যাপ ধরেই কাজ বাস্তবায়ন হবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে। এ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে সবার কাছে ইসির সব কাজ তুলে ধরা হবে। তাদের মতামত নিয়ে সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে।

রোডম্যাপে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত সময়ে সংসদ নির্বাচন করতে দৃঢ়তার সঙ্গে ও সুচিন্তিত পন্থায় এগিয়ে যাচ্ছে। দেশবাসী একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছেন। সার্বিকভাবে দেশে জাতীয় নির্বাচনের একটি অনুকূল আবহ সৃষ্টি হয়েছে। ইসি কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে অংশীজন, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্টদের সামনে উপস্থাপন করে সবার মতামত নেবে। সবার মতামতের আলোকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আইনানুগ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব বলে ইসি বিশ্বাস করে।’

ইসি সূত্রে জানা গেছে, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস, আইন সংস্কারসহ অন্তত সাতটি বিষয়ে অংশীজনের সঙ্গে সংলাপসূচি নিয়ে নির্বাচন পর্যন্ত দেড় বছরের কাজের এই ‘রোডম্যাপ’ ৯ জুলাই অনুমোদন করে (ইসি)। এতে নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে জনআকাক্সক্ষা পূরণে অন্যতম সাতটি বিষয়ে রাজনৈতিক দলসহ ছয় ধরনের অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ইসির চূড়ান্ত করা রোডম্যাপে যে সাতটি বিষয়ে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- আইনি কাঠামোগুলো পর্যালোচনা ও সংস্কার; কর্ম-পরিকল্পনার ওপর পরামর্শ গ্রহণ; সংসদীয় এলাকার নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ; জাতীয় পরিচয়পত্র প্রস্তুতকরণ এবং বিতরণ; ভোটকেন্দ্র স্থাপন; নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নীরিক্ষা এবং নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট সবার সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ। ইসির সংলাপে এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ নেয়া হবে।

এ ছাড়া রোডম্যাপে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের গেজেট প্রকাশের সময় নির্দিষ্ট করে দেয়া, রাজধানীর মতো বড় শহরের আসন সীমিত করে নির্দিষ্ট করে দেয়া, আরপিও-সীমানা নির্ধারণ অধ্যাদেশ বাংলায় রূপান্তরের প্রস্তাবও থাকছে। সংলাপে শেষ মুহূর্তে নারী সংগঠনের নেত্রীদের সঙ্গে বসার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ৩১ জুলাই থেকে অক্টোবর নাগাদ এ সংলাপে পর্যায়ক্রমে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন পর্যবেক্ষক, নারী সংগঠনের নেত্রী ও নির্বাচন পরিচালনা বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানো হবে।

রোডম্যাপে অন্যতম এজেন্ডা ‘আরপিও’ সংশোধন: ইসির চূড়ান্ত করা রোডম্যাপে বলা হয়েছে, নির্বাচন পরিচালনায় বিদ্যমান আইন-বিধি প্রয়োগ করে অতীতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব হয়েছে। এখন আইনি কাঠামোর আমূল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে ইসি বিবেচনা করে না। তবে পরিবেশ-পরিস্থিতির পরিবর্তনের মুখে এগুলো আরো যুগোপযোগী করার সুযোগ রয়েছে। যাতে ভোট প্রক্রিয়া আরো সহজতর ও অর্থবহ হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ও নির্বাচন পরিচালনা বিধি অনুযায়ী ‘পোস্টাল ব্যালটে’ ভোটে দেয়ার প্রক্রিয়াটি জটিল। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরতদের সহজ পদ্ধতিতে ভোট দেয়ার কাঠামো বের করা প্রয়োজন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত প্রার্থীর গেজেট প্রকাশ নিয়ে বিধিতে অস্পষ্টতা রয়েছে। এটি দূর করতে হবে। সেই সঙ্গে আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করে আরো অসঙ্গতি পেলে তা দূর করতে উদ্যোগ থাকবে ইসির।

এতে বলা হয়েছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এ পর্যন্ত দুই শতাধিক সংশোধনী আনা হয়েছে। এ আইনটিও যুগোপযোগী করতে আরো সংস্কারের প্রয়োজন হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ অধ্যাদেশ বাংলা ভাষায় রূপান্তর করা গেলে ভোটার, প্রার্থী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবার কাছে সহজবোধ্য হবে বলে মনে করছে ইসি। সীমানা পুনর্বিন্যাসে নতুন প্রশাসনিক এলাকা ও বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোকে নিয়ে নির্বাচনী এলাকা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে কমিশনের। ইসির প্রস্তাব হচ্ছে- আইন সংস্কার করে শুধু জনসংখ্যাকে বিবেচনা না করে জনসংখ্যা, ভোটার সংখ্যা ও আয়তনকে বিবেচনায় আনা যেতে পারে। রাজধানীর মতো বড় শহরের আসন সংখ্যা সীমিত করে নির্দিষ্ট করা যায়। অবৈধ অর্থ ব্যবহার রোধ ও পেশিশক্তির ব্যবহার দমনে আইনি সংস্কার ও তা প্রয়োগে সংশ্লিষ্ট সবার সুপারিশ পেলে শান্তিপূর্ণ ভোট করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে ইসি। এ সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনারদের নিয়ে গঠিত কমিটি সব পর্যালোচনা করে তা চূড়ান্ত করবে। এ ছাড়া ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও বিতরণ, দলের নিবন্ধন হালনাগাদ, ইসির জনবলের সক্ষমতা বাড়াতে কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে রোডম্যাপে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.