পেইড নেক্সটের অবৈধ ব্যাংকিং আট দেশে

অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পেইড নেক্সটের বিরুদ্ধে অবৈধ ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন গোয়েন্দারা। বাংলাদেশসহ আটটি দেশে মাস্টারকার্ড দিয়ে অবৈধ ব্যাংকিং করছে প্রতিষ্ঠানটি। চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে গ্রাহক তৈরি করছে পেইড নেক্সট। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার কাছে পেইড নেক্সটের অবৈধ ব্যাংকিং সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছেন তদন্ত ও অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ব্যাংকের ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের মতোই মাস্টারকার্ড ও ভিসা কার্ড গ্রাহকদের দিয়ে থাকে পেইড নেক্সট। এই কার্ডের নম্বরের বিপরীতে যত টাকা রিচার্জ করা যাবে তত টাকাই উত্তোলন করা সম্ভব। দুইভাবে এ টাকা রিচার্জ করা যায়। সরাসরি পেইড নেক্সটের অফিসে নিজ কার্ডের বিপরীতে বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা জমা দেয়া যায়। এ ধরনের আর্থিক লেনদেনের অসংখ্য তথ্য এখন গোয়েন্দাদের হাতে রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে পেইড নেক্সটের অবৈধ ব্যাংকিং লেনদেন নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন সংশ্লিষ্টরা। পরে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত খতিয়ে দেখার পর আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। আর এতে বিশ্বের আটটি দেশের সঙ্গে মাস্টার কার্ড লোগো সংবলিত বুথ ব্যবহার করার তথ্যও হাতে আসে। দায়িত্বশীল এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তাদের আর্থিক লেনদেন কার্যক্রম চালাচ্ছে। চটকদার বিজ্ঞাপনে তরুণ ও তরুণীদের ছবিও ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন (বিনি আমিন) একজন উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তির আত্মীয়। তবে তাকে যে কোনো সময় আইনের আওতায় আনা হবে।
সম্প্রতি সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা পেইড নেক্সটের পান্থপথের ঢাকা অফিসে অভিযান চালায়। কিন্তু অভিযানের আগে প্রতিষ্ঠানের আইটি বিশেষজ্ঞরা তাদের তিনটি কম্পিউটার থেকে প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য-উপাত্ত মুছে ফেলেন। পরে অধিকতর ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে মুছে ফেলা সব ডকুমেন্ট উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এতে করে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এর মধ্যে অবৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থার তথ্য প্রমাণিত হয়। উদ্ধার ডকুমেন্টগুলো খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। আর এতে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। এসব দেশের মাস্টারকার্ড সংবলিত বুথে প্রতিষ্ঠানটির মাস্টারকার্ড ব্যবহার হয়েছে।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টরা জানান, পেইড নেক্সটের রয়েছে উচ্চশিক্ষিত মার্কেটিং টিম। টিমের সদস্যরা সোশ্যাল যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও বিভিন্ন অফিসে তাদের কর্মতৎপরতা ও যোগাযোগ করেন। নজরকাড়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন নতুন নতুন গ্রাহক তৈরি করছে। যে কোনো অঙ্কের টাকা পৃথিবীর যে কোনো দেশে লেনদেনের সুযোগ রয়েছে পেইড নেক্সটের মাস্টারকার্ড বা ভিসা কার্ড দিয়ে। এই কার্ড ব্যাংকের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মতোই। কিন্তু পেইড নেক্সটের কোনো ধরনের কার্যক্রম ও কার্ডের অনুমোদন নেই বাংলাদেশ ব্যাংকের।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, প্রতিষ্ঠানটি এক ধরনের অবৈধ ব্যাংকিং করে যাচ্ছে, এসব তথ্য-প্রমাণের পর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে। প্রতিষ্ঠানের মালিক ও এর সঙ্গে জড়িতরা অর্থ পাচার করছেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশের একটি ইউনিট কাজ শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের ব্যাংকিং মাধ্যম জঙ্গি ও অপরাধীদের জন্য খুবই নিরাপদ ব্যবস্থা। তাই জঙ্গি লেনদেন ও অর্থ পাচারের বিষয়টি তদন্তে প্রাধান্য পাচ্ছে।
জানতে চাইলে র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক এডিশনাল ডিআইজি খন্দকার লুৎফুল কবীর মানবকণ্ঠকে বলেন, বিডি কার্ডের নতুন রূপ পেইড নেক্সট। বেশ কিছুদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির পান্থপথ কার্যালয়ের দিকে নজরদারি করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের অবগত করা হয়েছে। পেইড নেক্সটের কার্যক্রম সন্দেহজনক বলে মনে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, অর্থ লেনদেনের জন্য পেইডনেক্সট খুলেছে কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস সেন্টার। কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিলেই কার্ড সচল করে দেয়া হয়। পরে বিশ্বের যে কোনো দেশের বুথ থেকে টাকা তোলা যাবে। শপিং মলে গিয়ে কেনাকটা করা সম্ভব। এমনকি যে কোনো অঙ্কের অর্থ এই কার্ডের বিপরীতে উত্তোলন করা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, কোনো তফসিলি ব্যাংক ছাড়া ক্রেডিট প্রদানে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনুমোদন নেই। আইন অনুযায়ী এ ধরনের কার্ড ইস্যু দণ্ডনীয় অপরাধ।
সিআইডির এক বিশেষ পুলিশ সুপার মানবকণ্ঠকে জানান, আগে বিডি কার্ড নামে পরিচতি ছিল প্রতিষ্ঠানটি। পরে পেইড নেক্সট নামে নতুন করে কার্যক্রম চালায়। এই পেইড নেক্সট ব্যাংকের ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের মতো কার্ড দিয়ে অবৈধ ব্যাংকিং করে যাচ্ছে। বিভিন্ন মেগা সিটিতে কেনাকাটা, খাওয়া-দাওয়া, হোটেল বুকিংসহ বিশ্বের যে কোনো দেশে ওয়েবসাইটে কার্ড দিয়ে অনলাইনে কেনাটাকা করা যায় এই কার্ডে। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করছে। তদন্তের স্বার্থে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামটি গোপন রাখা হলো। তবে ওই দেশের পুলিশকে বাংলাদেশ থেকে মেইল পাঠানো হয়েছে। সম্প্রতি পাঠানো ই-মেইল বার্তায় পেইড নেক্সটের সঙ্গে বিদেশি প্রতিষ্ঠানটির কী ধরনের সম্পর্ক আছে তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম মানবকণ্ঠকে বলেন, পেইড নেক্সটের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনুসন্ধান ও যাচাই-বাছাই শেষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

One Response to "পেইড নেক্সটের অবৈধ ব্যাংকিং আট দেশে"

  1. Pingback: নির্বাচিত হেডলাইন - ২১ এপ্রিল ২০১৭ ⋆ সাম্প্রতিক ডটকম