পেঁয়াজ চাষে ভাগ্য বদল

অন্যান্য ফসল চাষ যেখানে ক্রমশ অলাভজনক হয়ে উঠছে সেখানে পেঁয়াজ লাভজনক ফসল হিসেবে চাষির কাছে আদৃত হচ্ছে। পেঁয়াজকে কৃষক রক্ষাকারী ফসল বললেও ভুল হয় না। লাভজনক হলেও দেশের সব অঞ্চলে তো আর পেঁয়াজ ভালো হয় না! দেশের সবচেয়ে ভালো পেঁয়াজ জন্মে পাবনায়। এ জেলার সুজানগর ও সাঁথিয়া উপজেলায় তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। পেঁয়াজের মাঠ এ দুটি উপজেলার সীমানাকে এক করে একটি গ্রামে পরিণত করে দেয়। এখন পেঁয়াজের মৌসুমে এ দুটি উপজেলা শুধুই একটি পেঁয়াজের গ্রাম বা পেঁয়াজ পল্লীতে পরিণত হয়েছে। এ অঞ্চলের পেঁয়াজ সারাদেশে বিক্রি হয়।
গাজনা পাড়ের পেঁয়াজ: দেশের অন্যতম বৃহত্তম একটি বিল গাজনা। সুজানগর উপজেলার আত্রাই ও পদ্মা নদীর সংযোগে সৃষ্ট বিল গাজনার (গণ্ডহস্তী বলেও পরিচিত) আয়তন প্রায় ছয় বর্গমাইল। বর্ষা শেষে কার্যত এই বিশাল বিলপাড়টি পেঁয়াজ চাষে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অধিক ফলন, উচ্চমূল্য হওয়ায় চাষিরা লাভবান হচ্ছেন। ফলে এক সময় পিছিয়ে থাকা এ অভাবী জনপদে এখন সমৃদ্ধির ছোঁয়া লেগেছে। বিল গাজনা সন্নিহিত বামনদি, দুলাই, চরদুলাই, পাইকপাড়া, শান্তিপুর, মধুপুর, খয়রান, মথুরাপুর, বগাজানি, রাইশিমুল, উলাট, বনকোলা, দুর্গাপুর প্রভৃতি গ্রামের চাষিরা শুধু এই একটি ফসল চাষেই সংসারের চেহারা পাল্টে ফেলেছেন।
কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, দেশের এক-তৃতীয়াংশ পেঁয়াজ আবাদ হয় পাবনা জেলায়। তার মধ্যে এ বিল অঞ্চলই হচ্ছে সবচেয়ে বড় পেঁয়াজের মাঠ। গত বছর এ জেলায় চারা পেঁয়াজ আবাদ হয় ৩৯ হাজার ৮৪৫ হেক্টর জমিতে, মুড়িকাটা বা কন্দ পেঁয়াজ আবাদ হয় ৮ হাজার ৪৫ হেক্টরে। গতবার চারা পেঁয়াজের ফলন ছিল ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৪২৬ মেট্রিক টন। এবার কৃষি বিভাগের হিসাবে চারা পেঁয়াজ রোপণ হচ্ছে ৪০ হাজার হেক্টরে, ফলনের আশা ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৯৯৫ মেট্রিক টন। এর মধ্যে এই বিলেই পেঁয়াজ আবাদি এলাকা ১৮ হাজার হেক্টর।
বামনদি দেশের বৃহত্তম পেঁয়াজের মাঠ: পাবনার সুজানগর উপজেলার এক নিভৃত পল্লী বামনদি। পাবনা-নগরবাড়ী মহাসড়কের দুলাই থেকে হেরিংবন্ড রাস্তা পেরিয়ে এ গ্রাম। বিলগাজনা দুহিতা এ গ্রামটি বিশাল বর্ষায় ডুবে যায়। বর্ষা শেষে এর মাটি জেগে ওঠে এক বিশাল পাললিক স্তর নিয়ে। যে মাটিতে ফলে সোনালি ফসল, সোনার ডিমখ্যাত ‘গোল্ডেন বল’ পেঁয়াজ। সুদৃশ্য আকারের পেঁয়াজ দেশজুড়ে খ্যাত। এ মাঠে অন্য ফসলের মধ্যে গ্রীষ্মকালে বোনা আমন কিংবা পাটের চাষ হয়।
এ গ্রামের চাষিরা একেকজন দুই বিঘা থেকে সর্বোচ্চ ৪০ বিঘা পর্যন্ত পেঁয়াজের চাষ করেন। চাষির বাড়ি থেকে মাঠের গহীন ভেতর পর্যন্ত পেঁয়াজের ক্ষেত দেখে মনে হয় যেন আদিগন্ত পেঁয়াজেরই মাঠ। পেঁয়াজের জগত। মাঠের সঙ্গে মাঠজুড়ে গ্রাম, ইউনিয়নের সীমা পেরিয়ে সুজানগর আর সাঁথিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা একটি বৃহৎ পেঁয়াজের গ্রামে পরিণত হয়েছে। রূপসীর বিল, গ্যারকার বিল, ঘুঘুদহ বিল, গাঙভাঙা বিল, জিয়লগাড়ির বিল, সোনাপাতিল বিল পাড়সহ সাঁথিয়া সুজানগর এলাকায় মাঠের পর মাঠ পাড়ি দিলে এখন শুধু পেঁয়াজ আর পেঁয়াজ।
ফলন ও মুনাফা: মুড়ি পেঁয়াজ বিঘাপ্রতি ৪০-৬০ মণ, চারার পেঁয়াজ বিঘাপ্রতি ৪০-৮০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। মুড়ি পেঁয়াজ, চারার পেঁয়াজ মাস দুয়েক আগে বিক্রি করে চাষি অসময়ে কিছু টাকা পান। এ টাকাতেই মাঠের চারা পেঁয়াজ ক্ষেতের পরিচর্যা চলে। ভরা মৌসুমে পেঁয়াজের দাম নেমে গেলেও হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়। যা অন্য ফসলের চেয়ে অধিক লাভজনক। বছরের শেষের দিকে পেঁয়াজের ঝাঁজ বাড়তে থাকে। প্রতি বছরই দর দুই হাজার টাকার উপরে চলে যায়, কখনো তিন হাজার বা তার বেশি দরে বিক্রি হয়। ফলে চাষির খরচ বাদ দিয়েও বিঘাপ্রতি ভালো মুনাফা থাকে।
ফিরে দেখা- দুই যুগ আগে: ১৯৯০ সালের আগের আর তার পরবর্তী সময়ের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ আলাদা। পূর্ববর্তী হতাশা, অভাব আর ফসল চাষে উৎপাদন খরচ না ওঠার জায়গা দখল করেছে সমৃদ্ধি, আশা আর পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য। দুই যুগ আগে এ অঞ্চলের চাষিরা পেঁয়াজ চাষের প্রতি ততটা উৎসাহিত ছিলেন না। পলি সমৃদ্ধ এঁটেল-দোআঁশ মাটিতে চাষিরা শীত মৌসুমে চাষ করতেন গম, যব আর খরিপ মৌসুমে চাষ করতেন বোনা আমন। তখন চাষির ঘরে অভাব ছিল বার মাস। এখন সেদিন শুধুই অতীত।
বদলে যাচ্ছে বহু গ্রাম: সুজানগরের বামনদি, শান্তিপুর, মধুপুর প্রভৃতি গ্রামে যেন উন্নয়নের জোয়ার বইছে। আর ঢেউ লাগছে চাষির বাড়িতে। প্রত্যেক বাড়িতে এখন সুদৃশ্য টিনের ঘর, টিনের বেড়া। পেঁয়াজু ধনীরা গ্রামে গড়ছেন অট্টালিকা, কাটছেন বিশাল দীঘি আর ঘরে আসছে রঙিন টিভি, ভিসিডি, ডিশ সংযোগ। গ্রামের জীবন ধারা পাল্টে যাচ্ছে। লাগছে নগরায়নের দোলা। আর্থিক সচ্ছলতায় এখন চাষির পরিবারের খাবার দাবার, পোশাক পরিচ্ছদ, সন্তানের লেখাপড়ায় সহযোগিতা সবকিছুতেই উন্নয়ন ঘটছে। পেঁয়াজ চাষ প্রধান গ্রাম সাঁথিয়ার বামুনডাঙ্গা গ্রাম দেখলে বোঝা যায় না, এটি গ্রাম না শহর। শান্তিপুর গ্রামের কোবাদ হোসেন বলছিলেন, পেঁয়াজের টাকাতেই উন্নয়নের ছোঁয়া, কেউ বাড়ি করছে, কেউ মাইক্রোবাস, হোন্ডা কিনছে, কেউ যাচ্ছে বিদেশে। পেঁয়াজু গ্রামগুলোর জীবনধারা পাল্টে যাচ্ছে।
দিনমজুর থেকে লাখোপতি: সুজানগরের বামন্দি গ্রামের জামাল উদ্দিন এই পাঁচ বছর আগেও ছিল ভ্যানচালক, নিঃস্ব ভূমিহীন। এখন সংসারে তার সচ্ছলতা, দু’লাখ টাকা দামের দু’বিঘা জমির মালিক। পেঁয়াজের চাষে তার সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। শুধু জামাল উদ্দিন নয়, ওই গ্রামের রায়হান খাঁ, মতি বিশ্বাস, বজলু শেখ, মতলেব শেখ, দায়েন মোল্লা, হান্নান মোল্লা আজ সচ্ছল। তাদের সংসারে অভাব দূর হয়েছে। নিজস্ব দুই থেকে পাঁচ বিঘা জমি হয়েছে। জানা গেল পার্শ্ববর্তী শান্তিপুর গ্রামের আ. জলিল, আ. রহিম, কুতুব আলীদের উঠে আসার গল্প। যারা শূন্য থেকে শুরু করে পেঁয়াজ চাষ করে আজ সফল। পেঁয়াজ চাষ করে দিন মজুররা হয়েছেন লাখোপতি আর অনেক মধ্যবিত্ত কোটিপতি হওয়ার পথে!
পেঁয়াজ উৎসব: দেশের এ বিশাল পেঁয়াজ পল্লীতে পেঁয়াজ উৎসব বছরের ছয়-সাত মাস পর্যন্ত চলে। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে মুড়ি (রেটুন) পেঁয়াজ লাগানো থেকে শুরু করে ক্ষেতের চারা পেঁয়াজ উত্তোলনের সময় বৈশাখ পর্যন্ত গ্রামগুলো ভিন্ন এক আমেজে ভরপুর থাকে। মুড়ি পেঁয়াজ লাগানোর জন্য ছোট্ট আকৃতির বীজ পেঁয়াজ সংগ্রহ, জমি ঠিক করা, লাগানো এর কয়েক দিনের মধ্যে আবার পেঁয়াজের চারা তৈরির জন্য পিঁয়াজ বীজ সংগ্রহে চাষি ব্যস্ত হয়ে ওঠে। প্রায় বছরই বীজ সংকট থাকায় বীজ উৎপাদকরা দেড় থেকে দু’ হাজার হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রির সুযোগ পায়। পুরো এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। ফলে এ সময়টা এই পেঁয়াজ পল্লীতে মাঠজুড়ে শ্রমিকের বিচরণ থাকে। এসব গ্রামে এত শ্রমিক না থাকায় দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে শ্রমিক নিয়ে আসা হয় কিংবা শ্রমিকরা আসে। মুড়ি পেঁয়াজ, চারা পেঁয়াজ, কদমের পেঁয়াজ বপন, উত্তোলন, পরিচর্যা, পেঁয়াজ কাটা ও ঘরে সংরক্ষণ, হাটে বিক্রি- সব মিলিয়ে ছয় মাস গ্রামগুলোতে এক এলাহী কাণ্ড চলতে থাকে। গ্রামগুলো বর্ষার স্নান শেষে যেন এক মচ্ছবে মেতে ওঠে।
কুঁড়েঘরেও শত মণ পিঁয়াজ মজুদ: গ্রামের মানুষ পেঁয়াজের প্রতি এমনভাবে ঝুঁকেছে যে, একটি প্রান্তিক চাষির কুঁড়েঘরেও শত মণ পেঁয়াজ স্টক করা থাকে। যে ঘরে এই এক যুগ আগেও হা-অন্ন হা-ভাত ছিল এখন সে সব ঘরে সমৃদ্ধি দেখা দিয়েছে।
সমস্যা- সম্ভাবনা: চাষিরা জানান, ২০১২ সালে বা ২০১৫ সালে পেঁয়াজ চাষে সব চাষি ব্যাপক লাভবান হন। আবার ২০১৬ সালে অনেকেই ক্ষতির শিকার হন। চাষিরা জানান, পেঁয়াজ আমদানি হলে বাজারমূল্য কমে যায় এ বাস্তবতা সবাই জানার পরও আমদানিটা কয়েক দিন পিছিয়ে দেয়ার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না। অনেকের অভিযোগ, ভরা মৌসুমে এলসির মাধ্যমে ব্যাপক হারে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে ভারত থেকে। এতে কৃষক বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।
চাষিরা জানান, বীজ, রোপণ, সার, জমি চাষ, ৩-৪ বার সেচ, নিড়ানি, কীটনাশক, রোপণ, আবার সেচ, কীট ও ছত্রাকনাশক, পেঁয়াজ তোলা ও জমি লিজ সব মিলিয়ে এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদের খরচ ৩৫ হাজার টাকা। যাদের নিজের জমি তাদের লিজ মানি বাদ দিলে এ ব্যয় দাঁড়ায় ২০ হাজার টাকায়। কিন্তু ২০-৩৫ হাজার টাকা ব্যয় করে বাজারমূল্য যদি ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা না পাওয়া যায় তাহলে কৃষকের এ শ্রমের আর কোনো দাম থাকে না।
বাংলাদেশ ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও পাবনার খ্যাতিমান চাষি আলহাজ শাহজাহান আলী বাদশা জানান, দেশের চাহিদাও পূরণ করতে হবে, কৃষকের স্বার্থও দেখতে হবে। কৃষকের লোকসান করে চাহিদা পূরণের নীতি সুষ্ঠু কোনো নীতি হতে পারে না। বিষয়টি সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভেবে দেখা দরকার।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর পাবনার উপ-পরিচালক বিভূতিভূষণ সরকার জানান, লাভজনক হওয়ায় এ অঞ্চলের চাষিরা পেঁয়াজ আবাদে ব্যাপকভাবে ঝুঁকেছে। কৃষি বিভাগ থেকে প্রদর্শনী প্লট করাসহ চাষিদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হচ্ছে।
পাবনার সুজানগর-বেড়া এলাকার এমপি খন্দকার আজিজুল হক আরজু জানান, গাজনার বিল ও সংলগ্ন সব ক’টি বিল এখন পেঁয়াজ আবাদি এলাকা। বর্ষায় এটি হাওরের মতো বিস্তীর্ণ জলাশয়ে পরিণত হয়। বর্ষার পর জেগে ওঠে উর্বর জনপদ হিসেবে। পেঁয়াজ আবাদের সঙ্গে কৃষকের গড়ে উঠেছে গভীর সম্পর্ক। তিনি চান, পেঁয়াজই এ বিলের প্রধান ফসল হয়ে থাক। গাজনা বিল উন্নয়নে এ সরকার চার শতাধিক কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এতে বিলের জলাবদ্ধতা দূর হয়েছে, সেচ সুবিধা বেড়েছে। সব চাষিই বিশেষ করে পেঁয়াজ চাষিরা ব্যাপক উপকৃত হচ্ছেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস