পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল বাণিজ্যের দায় কার?

আবাসিক এলাকায় কোনো রাসায়নিক কারখানা বা গুদাম করা আইনত নিষিদ্ধ। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সুপারিশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পুরান ঢাকার রাসায়নিকের কারখানা আর গুদামগুলো সরিয়ে নেয়া। কিন্তু ৯ বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এরই মধ্যে আবারো ঘটলো চকবাজার ট্র্যাজেডি। রাসায়নিক দ্রব্যের কারণে এভাবে একের পর এক ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও এর দায় নেয়নি কেউই। এমনকি সংশ্লিষ্ট কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে এখনো আইনের মুখোমুখিও করা হয়নি। আর তাই সচেতন মহলের জিজ্ঞাসা পুরান ঢাকায় অবৈধভাবে রাসায়নিক বাণিজ্যের দায় কার? তবে অনেকের অভিযোগ এ ঘটনার জন্য মূলত শিল্প মন্ত্রণালয়ই দায়ী।

জানা গেছে, কোথাও রাসায়নিক কারখানা স্থাপন করতে হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী রাসায়নিক আমদানি-রফতানি, ব্যবসা ও ব্যবহার করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে অনুমতি নিতে হয়। এরপর ছাড়পত্র নিতে হয় বিস্ফোরক পরিদফতর, পরিবেশ অধিদফতর ও ফায়ার সার্ভিসের। গুদামের নকশা, আমদানি-রফতানির লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপণ সনদসহ কমপক্ষে ১৫টি শর্ত পূরণ করতে হয়। অথচ পুরান ঢাকার বেশির ভাগ রাসায়নিক ব্যবসায়ীর একমাত্র সনদ সিটি কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন রাজধানীতে অবৈধভাবে রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম স্থাপন এবং এর কারণে একের পর এক ব্যাপক প্রাণহানি ঘটলেও এ ব্যাপারে রাজউক, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা জেলা প্রশাসন, বিস্ফোরক অধিদফতর, পরিবেশ অধিদফতর, ঢাকা ওয়াসা এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদফতর বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করছে না। এমনকি মাঠপর্যায়ে তাদের তদারকিও নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমাদের দেশের প্রশাসনে দীর্ঘসূত্রতা যেন একটি স্বাভাবিক চিত্র। নিমতলীর মতো ঘটনার পরে প্রকল্প তৈরি করে অনুমোদন করতেই সাত-আট বছর লেগে যাওয়া দায়িত্বে অবহেলা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও দীর্ঘসূত্রতার ফল।

তিনি বলেন, ‘দুঃখজনক হলো কোনো পরিবর্তন আনতে জাতীকে বড় কোনো ট্র্যাজেডির জন্য অপেক্ষা করতে হয়।’

অপরদিকে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে উদাসীনতা বা শৈথিল্যের পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কোনো নির্দেশনাকে পাত্তাই দেয় না পুরান ঢাকার রাসায়নিক ব্যবসায়ীরা। বড় ধরনের দুর্ঘটনার জন্য ব্যবসায়ীদের মনোভাবও দায়ী বলে মনে করেন আইনজীবীরা।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন বলেন, এখানে অনেকের অবহেলা রয়েছে। আইন অনুযায়ী কারখানা পরিদর্শকের নিয়মিত পরিদর্শন করার কথা। সিটি কর্পোরেশন কিসের ভিত্তিতে ওই ভবন থেকে ট্যাক্স আদায় করে সেটি দেখার বিষয়। যদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ট্যাক্স নিয়ে থাকে, তবে তারা শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেয়েছে কিনা দেখার বিষয়। হয়তো দেখা যাবে দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে খুশি করার মাধ্যমে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালানো হচ্ছে। এটি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে। এ ছাড়া ভবন মালিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা হতে পারে, যেমনটি হয়েছে রানা প্লাজা ও তাজরীন গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্তরাও মামলা করতে পারে।

নিমতলী ট্র্যাজেডির পর কয়েকটি সংগঠনের করা এক রিট আবেদনের পর ২০১০ সালের জুনে হাইকোর্ট পাঁচ দফা নির্দেশনাসহ পুরান ঢাকার বাসাবাড়ি থেকে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। এতে পুরান ঢাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্প, কলকারখানা ও রাসায়নিক গুদাম সরানোর নির্দেশ ছিল। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে এবং একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো নির্দেশই কার্যকর হয়নি।

জানা গেছে, পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নিতে ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী’ নামের ২০২ কোটি টাকার একটি অনুমোদিত প্রকল্প বাস্তবায়নে মাত্র কাজ শুরু করেছে বিসিক। এর আওতায় কেরানীগঞ্জে ৫০ একর জমিতে একটি পল্লী গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে ৯৩৬টি প্লট পাবেন ব্যবসায়ীরা। ২০২১ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটির উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের মৃত্যুর পর। ২০১১ সালে প্রকল্পটির বিস্তারিত পরিকল্পনা বা ডিপিপি তৈরির কার্যক্রম শুরু করে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা বিসিক। ২০১৫ সালে বিসিক একটি ডিপিপি তৈরি করে, যেখানে কেরানীগঞ্জের সোনাকান্দা মৌজায় ২০ একর জমিতে রাসায়নিক পল্লী তৈরির কথা বলা হয়েছিল। এতে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। প্রকল্পে বহুতল ভবন তৈরি করে কারখানা ও গুদাম সরানোর কথা বলা হয়েছিল। প্রকল্পের ব্যয় বহনের কথা ছিল ব্যবসায়ীদের। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বহুতল ভবনে রাসায়নিক কারখানা ও দোকানের বিষয়ে আপত্তি তোলেন। ফলে ওই পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। ২০১৭ সালের মার্চে আবার নতুন একটি ডিপিপি তৈরি করে শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠায় বিসিক, যেখানে কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নে রাসায়নিক পল্লী স্থাপনের কথা বলা হয়। ডিপিপি যাচাই-বাছাই করে শিল্প মন্ত্রণালয় সেটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।

সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এতে ব্যয় ধরা হয় ২০১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। নিয়ম অনুযায়ী, প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ার পরবর্তী বাজেটে প্রকল্পের বরাদ্দ মেলে। ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ নেই। চলতি বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বই ঘেঁটে এ প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।

রাসায়নিক পল্লী প্রকল্পের পরিচালক সাইফুল আলম বলেন, ‘আমি এখন কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ও জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক কাজ করে রাখছি। প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ পেলেই যাতে দ্রুত জমি অধিগ্রহণ করা যায়।’

এদিকে সদ্য সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুকে দোষারোপ করে সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়া বলেছেন, আমু যদি গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন, তাহলে হয়তো এত দিনে পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউন সরানো সহজ হতো।

তিনি বলেন, ‘আমাদের যিনি শিল্পমন্ত্রী (আমু) ছিলেন, তিনি যদি সিরিয়াসলি নিতেন, তাহলে পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন রিলোকেট করা সহজ হতো। কেমিক্যাল বিজনেস রিলোকেট করার জন্য আমি মন্ত্রী থাকাকালে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কেমিক্যাল মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং বিসিক, তারা মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা ঢাকার বাইরে একটি জমিতে স্থানান্তরিত হবে। এটা আমাদের প্রতিজ্ঞা ছিল। কিছু ডিসক্রিট ব্যাপারের কারণে পুরো ব্যাপারটি এগোয়নি।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক হিসাবে দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় রয়েছে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিক দাহ্য বস্তুর গুদাম। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে বাসাবাড়িতেই। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। ২শ’ ধরনের ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা রয়েছে এলাকায়।

জানা গেছে, পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের কারখানা ও গুদামগুলো সরানোর দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ২০১৭ সালের মার্চে একবার অভিযান শুরু করলেও কয়েকদিনের মাথায় তা থেমে যায়।

এ ব্যাপারে ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের দাবি, রাসায়নিকের কারখানা ও গুদামগুলো উচ্ছেদ অভিযানের ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশনের আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয় এবং ব্যবসায়ীদের বড় সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের অনুরোধে তারা তৎকালীন সময়ে ওই অভিযান এগিয়ে নিতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘আমরা একটা ম্যাসিভ ড্রাইভ দিলাম। অনেকগুলো কারখানা বন্ধ করলাম, মামলা করলাম, সিলগালা করলাম। তখন এফবিসিসিআই এবং শিল্পমন্ত্রী (তৎকালীন) আমাকে বলেন, বিসিক শিল্প নগরী হলে এগুলো উঠিয়ে দিত। আমাকে অনুরোধ করা হলো তাদেরকে কিছুটা সময় দিয়ে স্থানান্তর করতে। তখন এ প্রক্রিয়াটা থেমে গেল। নইলে ওই সময়েই একটা ধাক্কা দিয়ে দিতাম।’

তবে এ বছর আবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছেন জানিয়ে সাঈদ খোকন বলেন, ‘গত ১১ ফেব্রুয়ারি মোবাইল কোর্ট করেছি। এর আগে এফবিসিসিআই এবং কেমিক্যাল কারখানার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। সেখানে আমরা বলেছি ২৯টা দাহ্য পদার্থ স্টক করা যাবে না। স্যাম্পল কিছু রাখতে পারবে। তাদের গোডাউন কেরানীগঞ্জে নিয়ে যাবে। এখানে তারা ট্রানজেকশন করবে। ডেলিভারি দেবে সেখান থেকে। এর মধ্যেই চকবাজারের ঘটনাটা ঘটে গেল।’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর লালবাগ, ইসলামবাগ, হাজারীবাগ, কোতোয়ালি, চকবাজার, বংশাল, কামরাঙ্গীরচর, শ্যামপুর ও কদমতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় অলিগলিতেই গড়ে উঠেছে হাজার হাজার কারখানা। অবৈধ কারখানার মধ্যে রয়েছে, ব্যাটারি তৈরি, নকল ওষুধ, নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিক সরঞ্জাম, নকল বৈদ্যুতিক কেবল, ঝালাই, খেলনা ও জুতা-স্যান্ডেলসহ শতাধিক পণ্য তৈরির কারখানা।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (ঢাকা) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, পুরান ঢাকার এসব রাসায়নিকের গুদামের ৯৮ শতাংশই অনুমোদনহীন। অগ্নি দুর্ঘটনার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে এসব গুদাম। প্রসঙ্গত, নিমতলীতে আগুনের নয় বছরের মাথায় এর এক কিলোমিটারের মধ্যে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আবারো একই বীভৎস রূপ দেখল পুরান ঢাকাবাসী। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে রাসায়নিক থেকে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ ওই আগুনে মৃত্যু হয়েছিল ১২৪ জনের। এবার চকবাজারে মৃত্যু হয় ৬৭ জনের। এর মধ্যে পুরুষ ৫৬ জন, নারী সাত ও শিশু রয়েছে চারজন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৫০ জন। নিখোঁজ রয়েছেন ২৬ জন। তবে হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চকবাজারের চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদসংলগ্ন আসগর লেন, নবকুমার দত্ত রোড ও হায়দার বক্স লেনের মিলনস্থলে ঘটে এ অগ্নিকাণ্ড। 

মানবকণ্ঠ/এআর