পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গুদাম স্থানান্তর বহুদূর!

রাজধানীর আবাসিক এলাকায় রাসায়নিকের কারখানা ও গুদামের অনুমতি নেই। বাসাবাড়িতেই মজুদ রাখা হচ্ছে রাসায়নিক দাহ্যবস্তু। রাসায়নিকের কারখানা ও গুদামের কারণে পুরান ঢাকা যেন মৃত্যুকূপ হয়ে গেছে। এরই মধ্যে পুরান ঢাকার রাসায়নিকের কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নেয়ার প্রকল্প তৈরি ও অনুমোদন পেতেই পেরিয়ে গেছে আট বছর। গত ৩ জানুয়ারি প্রকল্পটির পরিচালক নিয়োগ করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। যদিও কোনো অর্থ বরাদ্দ মেলেনি। আগামী বাজেট অর্থাৎ জুলাই মাসে টাকা পেলে জমি অধিগ্রহণ শুরু করার পরিকল্পনা করছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)।

সব মিলিয়ে পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের কারখানা ও গুদাম রাসায়নিক পল্লীতে যাওয়া এখনো বহুদূরের বিষয়। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে যেসব সুপারিশ করেছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ঢাকার রাসায়নিকের কারখানা আর গুদামগুলো সরিয়ে নেয়া। ২০১০ সালের ১৫ জুন ওই কমিটির প্রতিবেদনে যে ১৭টি সুপারিশ করা হয়েছিল কিছু কিছু বাস্তবায়ন হলেও আসল কাজটিই করা সম্ভব হয়নি গত নয় বছরে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রশাসনে দীর্ঘসূত্রতা একটি স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু নিমতলীর মতো ঘটনার পরে প্রকল্প তৈরি করে অনুমোদন করতেই সাত-আট বছর লেগে যাওয়া দায়িত্বে অবহেলা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও দীর্ঘসূত্রতার ফল। তিনি বলেন, ‘দুঃখজনক হলো কোনো পরিবর্তন আনতে জাতিকে বড় কোনো ট্র্যাজেডির জন্য অপেক্ষা করতে হয়।’

জানা গেছে, পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নিতে ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী’ নামে ২০২ কোটি টাকার একটি অনুমোদিত প্রকল্প বাস্তবায়নে মাত্র কাজ শুরু করেছে বিসিক। এর আওতায় কেরানীগঞ্জে ৫০ একর জমিতে একটি পল্লী গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে ৯৩৬টি প্লট পাবেন ব্যবসায়ীরা। ২০২১ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটির উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের মৃত্যুর পর। ২০১১ সালে প্রকল্পটির বিস্তারিত পরিকল্পনা বা ডিপিপি তৈরির কার্যক্রম শুরু করে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা বিসিক। ২০১৫ সালে বিসিক একটি ডিপিপি তৈরি করে, যেখানে কেরানীগঞ্জের সোনাকান্দা মৌজায় ২০ একর জমিতে রাসায়নিক পল্লী তৈরির কথা বলা হয়েছিল। এতে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। প্রকল্পে বহুতল ভবন তৈরি করে কারখানা ও গুদাম সরানোর কথা বলা হয়েছিল। প্রকল্পের ব্যয় বহনের কথা ছিল ব্যবসায়ীদের। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বহুতল ভবনে রাসায়নিক কারখানা ও দোকানের বিষয়ে আপত্তি তোলেন। এর ফলে ওই পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। ২০১৭ সালের মার্চে আবার নতুন একটি ডিপিপি তৈরি করে শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠায় বিসিক, যেখানে কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নে রাসায়নিক পল্লী স্থাপনের কথা বলা হয়। ডিপিপি যাচাই-বাছাই করে শিল্প মন্ত্রণালয় সেটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।

সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এতে ব্যয় ধরা হয় ২০১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত।

নিয়ম অনুযায়ী, প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ার পরবর্তী বাজেটে প্রকল্পের বরাদ্দ মেলে। এর ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ নেই। চলতি বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বই ঘেঁটে এ প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।

রাসায়নিক পল্লী প্রকল্পের পরিচালক সাইফুল আলম বলেন, ‘আমি এখন কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ও জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক কাজ করে রাখছি। প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ পেলেই যাতে দ্রুত জমি অধিগ্রহণ করা যায়।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক হিসাবে দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় রয়েছে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিক দাহ্য বস্তুর গুদাম। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে বাসাবাড়িতেই। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। ২শ’ ধরনের ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা রয়েছে এলাকায়।

জানা গেছে, পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের কারখানা ও গুদামগুলো সরানোর দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ২০১৭ সালের মার্চে একবার অভিযান শুরু করলেও কয়েকদিনের মাথায় তা থেমে যায়।

এ ব্যাপারে ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের দাবি, রাসায়নিকের কারখানা ও গুদামগুলো উচ্ছেদ অভিযানের ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশনের আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয় এবং ব্যবসায়ীদের বড় সংগঠন এফবিসিসিআইর অনুরোধে তারা তৎকালীন সময়ে ওই অভিযান এগিয়ে নিতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘আমরা একটা ম্যাসিভ ড্রাইভ দিলাম। অনেকগুলো কারখানা বন্ধ করলাম, মামলা করলাম, সিলগালা করলাম। তখন এফবিসিসিআই এবং শিল্পমন্ত্রী (তৎকালীন) আমাকে বলেন, বিসিক শিল্প নগরী হলে এগুলো উঠিয়ে দিতে। আমাকে অনুরোধ করা হলো তাদের কিছুটা সময় দিয়ে স্থানান্তর করতে। তখন এ প্রক্রিয়াটা থেমে গেল। নইলে ওই সময়েই একটা ধাক্কা দিয়ে দিতাম।’ তবে এ বছর আবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছেন জানিয়ে সাঈদ খোকন বলেন, ‘গত ১১ ফেব্রুয়ারি মোবাইল কোর্ট করেছি। এর আগে এফবিসিসিআই এবং কেমিক্যাল কারখানার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। সেখানে আমরা বলেছি ২৯টা দাহ্য পদার্থ স্টক করা যাবে না। স্যাম্পল কিছু রাখতে পারবে। তাদের গোডাউন কেরানীগঞ্জে নিয়ে যাবে। এখানে তারা ট্রানজেকশন করবে। ডেলিভারি দেবে সেখান থেকে। এর মধ্যেই চকবাজারের ঘটনাটা ঘটে গেল।’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর লালবাগ, ইসলামবাগ, হাজারীবাগ, কোতোয়ালি, চকবাজার, বংশাল, কামরাঙ্গীরচর, শ্যামপুর ও কদমতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় অলিগলিতেই গড়ে উঠেছে হাজার হাজার কারখানা। অবৈধ কারখানার মধ্যে রয়েছে, ব্যাটারি তৈরি, নকল ওষুধ, নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিক সরঞ্জাম, নকল বৈদ্যুতিক কেবল, ঝালাই, খেলনা ও জুতা-স্যান্ডেলসহ শতাধিক পণ্য তৈরির কারখানা। এসব পণ্য উৎপাদনে অধিকাংশ কারখানায় ব্যবহার করা হয় দাহ্য কেমিক্যাল। বিশেষ করে জুতা তৈরির ফ্যাক্টরিতে যে সলিউশন ব্যবহার করা হয়, সেগুলো খুবই বিপজ্জনক বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, পুরান ঢাকার বাসাবাড়িতে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে জুতা কারখানা। এসব জুতা কারখানার সলিউশনে আগুন লাগলে তা খুবই দ্রুত ছড়ায়। তাই ঘনবসতি এলাকা ও বাড়িঘরে কারখানা গড়া ঠিক নয়। নিমতলীর ঘটনার পর কেমিক্যাল গোডাউনগুলো সরানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও অবৈধ কারখানার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অপর এক সূত্রে জানা যায়, পুরান ঢাকার মানুষ গোডাউন বা কারখানাগুলো সরাতে চায় না। কারণ একটা ফ্ল্যাট যে পরিমাণ ভাড়া দেয় একটা গোডাউন ভাড়া দিলে ডবল-ট্রিপল পেমেন্ট পায়। বেশি টাকা-পয়সার লোভে অনেকেই গোডাউন ভাড়া দিয়ে দেয়। এমনকি এ ব্যাপারে পুরান ঢাকার বাড়িওয়ালাদের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিযোগিতাও চলে। কে কত টাকা বেশি ভাড়া পাচ্ছেন। তাছাড়া হাজার হাজার বাড়িঘর, ছোট্ট একটা ঘরের ভেতরে গোডাউন, এটা খুঁজে বের করাও কঠিন। এ কারণেও রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম উচ্ছেদ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানা যায়।

দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, ‘পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল কারখানার পাশাপাশি অনেক কারখানা গড়ে উঠেছে। আমরা প্রতিনিয়তই এসব রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

মানবকণ্ঠ/এআর