পিছিয়ে থাকার বিরুদ্ধে লড়াই

পিছিয়ে থাকার বিরুদ্ধে লড়াই

বাঙালির জীবনে স্মরণীয় ক্ষণের কমতি নেই। স্মরণীয় বাণীর কমতি নেই। কিন্তু সেই স্মরণীয় ক্ষণগুলো স্মরণীয় বাণীগুলো আমরা স্মরণ রাখি না। আর স্মরণে রাখলেও, তা শুধু মনেই। তা শুধু উদ্দেশ্য ফলাতেই বলে ওঠা। ভেতরে থেকে তা লালন করার তাগিদ নেই। তাকে বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেই আমাদের। ইংরেজদের শাসন থেকে ভারত ভাগ হয়েছে। বিভক্তির পর দুই ভাগের মাঝে আমরা যে ভাগে পড়েছিলাম, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর লাখো প্রাণের বিনিময়ে আমরা রাষ্ট্রের সেই বর্বরতম শোষণ থেকেও বেরিয়ে এসেছি-স্বাধীনতার স্বাদ নিয়ে। এর সবই ইতিহাস। যে অগ্নিপুরুষের হাত ধরে আমাদের স্বাধীনতা, তিনি জালিমের কয়েদখানা থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রে ফিরে এসে কান্না জড়ানো কণ্ঠে লাখো মানুষের সামনে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বলেছিলেন, ‘‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সাত কোটি বাঙালিরে হে বঙ্গ জননী, রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করোনি’-কবিগুরুর কথা মিথ্যা প্রমাণ হয়ে গেছে, আমার বাঙালি আজ মানুষ।’’ প্রায় সাতচল্লিশ বছর আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমরা মানুষ হয়েছি বলে যে গর্বের কথা বলেছিলেন, সেই মনুষত্ব আজ আমরা নানাভাবে হারিয়ে ফেলছি। বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে স্বাধীনতার স্বাদ দিয়েছেন। তাঁর হাত ধরে আমরা পৃথিবীর মানচিত্রে নতুন পতাকা নিয়ে আমাদের গৌরব ঘোষণা করেছি। তাঁকে স্মরণে রাখলেও তাঁর আদর্শকে সরিয়ে রেখে সস্তা জনপ্রিয়তার দিকে ছুটছি। আমরা মানুষ হয়েছি বলে যে গর্ব তিনি করেছিলেন, মানবতা হারিয়ে সেই মনুষত্ব অর্জনের গৌরবকে আজ নানাভাবে আঘাত করছি।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আগে, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনকে স্মরণে রেখেই আমার মনে পড়ছে আরো একজন মহান মানুষের কথা। বাঙালিকে জাগিয়ে তোলা আরো একজন মানুষ, যিনি জন্মেছিনে ১৭৭২ সালে। পুরো ভারতবর্ষের মাঝে বাঙালিকে আলাদা করে জাগিয়ে তোলা, তাকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন মানুষটি। সেই সময়ে রাজনীতি, জনপ্রশাসন, ধর্মীয় এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রেখে বাংলার পুনর্জাগরণের দূত হিসেবে নিজেকে পরিচিত করে তোলা মানুষটি ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। যে জাগরণের ঢেউ তখন তিনি আমাদের মনে সঞ্চারিত করেছিলেন, আধুনিক শিক্ষার যে সূচনার দুয়ার তিনি উন্মুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন, তাকে কালে কালে যুগে যুগে আমরা বাড়িয়ে নেব, উত্তরোত্তর উন্নতির শিখরে নিয়ে যাব, সেটাই স্বাভাবিক। অথচ সেই সূচনার দুয়ার থেকে কিন্তু আমরা এখনো বেশি দূরে এগোতে পারিনি। বাঙালিরা যেখান শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতিতে পুরো ভূ-ভারতে এগিয়ে ছিল সবচেয়ে বেশি, আজ তারাই পিছিয়ে পড়ছে অন্যদের চেয়ে।

রাজা রামমোহনের হাত ধরে পুরো ভারতবর্ষে আমরা যে আধুনিক শিক্ষার অগ্রবর্তী আসন নিয়েছিলাম, বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করে আমরা যে মানুষ হওয়ার পাঠ নিয়েছিলাম, তা আজ ম্লান হতে বসেছে। বঙ্গবন্ধু কন্যার হাত ধরে আমরা যে উন্নতির সোপান বেয়ে সামনের দিকে যাত্রা শুরু করেছি, তাও পদে পদে বাধাগ্রস্ত।

আজকে আমাদের অর্থনীতির যে গতিপ্রবাহ, তাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা প্রবাসীদের পাঠানো টাকা আর আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরেও আমরা নিজেরা শিল্প উত্পাদনমুখী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে উঠতে পারিনি। সেই ব্যর্থতার ঘাটতি কিছুটা পূরণ করেছিল-তৈরি পোশাক শিল্প। যদিও তৈরি পোশাকের প্রায় কোনো উপাদানই আমাদের নিজস্ব উত্পাদন নয়। আমরা শুধু ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করে দেয়ার দায়িত্ব পালন করি। সেই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেও আমাদের অর্থনীতি স্ফীত হয়, হয়েছে, হচ্ছে। আমাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের কাজের সংস্থান হয়েছে। কিন্তু যাদের কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, তারা কি সর্বার্থে ভালো আছে? তাদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সবাই কি তাদের সঙ্গে যথার্থ আচরণ করছে? এর উত্তর ‘না’।

কারণ, প্রায় দিনই সংবাদপত্রের পাঠ থেকে আমাদের জানতে হয়, বেতনের দাবিতে, ন্যায্য পাওনা পরিশোধের দাবি নিয়ে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করছে। প্রায়ই তাদেরকে রাস্তায় নেমে আসতে হয়। আর আমাদের নগর পরিকল্পনাও এমন, রাজধানীর যে কোনো একটি সড়কে যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পরে পুরো নগরে। পুরো নগর থমকে যেতে বাধ্য হয়। চলতি সপ্তাহের শুরু থেকে বেতনের দাবিতে, মজুরি বোর্ডের নির্ধারণ করা বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা। যার ফলে দুই দিন প্রায় থমকে যায় রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক। বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় সাভারে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে একজন নিহত এবং প্রায় অর্ধশত আহতও হয়।

এখন যে প্রশ্নটি জোরেসোরে তুলবার সময় এসেছে, তা হলো-যাদের শ্রমের বিনিময়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা, যাদের শ্রমের বিনিময়ে লাভের মুখ দেখা-তাদেরকে কেন বারবার পাওনার দাবিতে পথে নামতে হবে? তাদেরকে কেন প্রাণ দিতে হবে? কেন রাস্তা বন্ধ করে জনদুর্ভোগ বাড়ানোর দায় নিতে হবে? একজন শ্রমিকের ন্যূনতম যে মজুরি নির্ধারণ করা আছে, তা দিয়ে একজন মানুষের একা টিকে থাকাই কঠিন, অথচ সেই বেতনের টাকা দিয়ে একটি পরিবার স্বপ্ন দেখে। তাদেরকে কেন বারবার স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা নিয়ে পথে নামতে হবে? লেখার শুরুতে স্মরণীয় বাণীর কথা বলেছিলাম। শ্রমের মর্যাদা এবং শ্রমিকের প্রাপ্য সম্পর্কে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে বলেছেন, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।’ (ইবনে মাজাহ)। অথচ এই পাওনা দিতেই আমাদের যতো গড়িমসি। যতো অজুহাত। ঘামের মূল্য আদায়ের জন্য শ্রমিকের নতুন করে ঘাম ঝরাতে হয়। যারা শ্রমিকের এই স্বপ্ন ভঙ্গের জন্য দায়ী, তাদের সম্পর্কেও মহানবী রসুল (সা.)-এর স্মরণীয় বাণী রয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন তিন শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে আমি বাদী হয়ে আল্লাহর আদালতে মামলা করব। তাদের মধ্যে একশ্রেণি হলো, যারা শ্রমিককে খাটিয়ে তার পূর্ণ মজুরি দেয় না। (বুখারি)।

আমরা দেশপ্রেমের কথা বলি, দেশকে ভালোবাসার কথা বলি-কিন্তু যাদের শ্রমের বিনিময়ে দেশ গড়ে উঠছে, তাদেরকে অভুক্ত রেখে তাদের বঞ্চিত রেখে কি করে দেশপ্রেমকে সার্থক করে তুলব? আজ আমরা মানবিকতার চেয়ে, শিক্ষার চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ এবং রাজনীতিকে বড় করে দেখছি। ফলে নিজের বিত্ত বৈভব বাড়ানোর দিকেই আমাদের মনোযোগ। অন্যের গায়ের ওপরে পা রেখে সিঁড়ি তৈরি করছি উপরে ওঠার। সেই সিঁড়ি আজ ভাঙার দিন এসেছে। মানবতার মুক্তিরদূত মহানবী (সা.) শ্রমের যে মর্যাদার কথা ঘোষণা করেছেন, বঙ্গবন্ধু মানুষকে যে সম্মান দিয়েছিলেন, রামমোহন যে আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি ধরিয়ে দিয়েছিলেন-তাকে পূর্ণতা দেয়ার দিন এসেছে।

নতুন সরকার শপথ নিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সরকার দেশ পরিচালনায়। নতুন সরকারের নতুন মন্ত্রিসভার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন-তাতে আজ সত্যিকার অর্থেই নির্ধারিত হওয়ার সময় এসেছে যে, আগামীতে আমরা কোথায় যাব? কোনো শাসনই চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু কিছু শাসন পথ দেখায়-আগামীকে গড়তে শেখায়। আজকের নবযাত্রার যে ইঙ্গিত তা শিক্ষা আর প্রগতির পথ বেয়ে আমাদের যাত্রা অব্যাহত রাখার। এখন একে ধরে রাখার জন্য যে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, নতুন সরকার জনগণের আস্থায় তাও অর্জন করেছে। ফলে সরকারের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ আজ অনেক সহজ। সেই সহজীকরণের পথ বেয়েই অতিকেন্দ্রিকতা থেকে আমাদের রাজধানীকে মুক্ত করার উদ্যোগ যেমন প্রয়োজন, তেমনিভাবে মানবিকীকরণের পথ বেয়েও শ্রমের মর্যাদা রক্ষায়, যারা দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত, তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে শ্রমিক নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করাও নতুন সরকারের দায়িত্ব। যারা দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত তাদেরকে বঞ্চিত রেখে, আমাদের পিছিয়ে থাকার বিরুদ্ধে লড়াই শেষ করা যাবে না, জাতি হিসেবে আমাদের সুস্থ করে তোলা যাবে না।
– লেখক: সাংবাদিক, কবি

মানবকণ্ঠ/এসএস