পিকনিক স্পটে শব্দদূষণ

পিকনিক স্পটে শব্দদূষণ

আমরা সবাই ব্যস্ত। নিজের জীবনকে সুন্দরভাবে সাজাতে অথবা জীবিকার তাগিদে সবাই সবার অবস্থান থেকে মহাব্যস্ততার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করে থাকি। ব্যস্ততার কারণে খুব আপনজনদেরও খোঁজখবর রাখতে পারি না। একে একে মাসের পর মাস শেষ হয়ে আসে, চলে যায় বছরের পর বছর। এভাবেই জীবনের সময়গুলো শেষ হয়ে তীরে এসে পৌঁছি। তবে কাজের চাপে বা একই কাজ পুনশ্চ করার ফলে আমাদের মধ্যে এক ধরনের একঘেয়ামি বা বিরক্তবোধ কাজ করে। কর্মব্যস্ততায় নিজের মধ্যে অনেক সময় এক ধরনের মানসিক চাপেরও সৃষ্টি হয় ফলে ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতায় ভুগতে হয়। ঠিক তখনই আমরা ঘুরতে বের হই। ভ্রমণে যাই। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আবার পারিবারিকভাবেও যাই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তো অবশ্যই বাত্সরিক ভ্রমণ বা পিকনিকের আয়োজন করতে হয়। এছাড়াও অনেকেই ঘুরতে খুব ভালোবাসেন তাই অবসর সময়ে ছুটে বেড়ান দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে আর এসব কারণেই আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও গড়ে উঠেছে অগণিত বিনোদন কেন্দ্র বা পার্ক। মূলত ব্যবসায়িক চিন্তা মাথায় নিয়েই বিত্তশালীরা পিকনিক স্পট গড়ে থাকেন। দিন দিনই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিনোদন স্পটকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক এ সব প্রতিষ্ঠান। সাধারণত শীতকালেই এ ধরনের আনন্দ-উত্সব বেশি হয়ে থাকে। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ এই তিন মাসই পিকনিক স্পটগুলোতে উপচে পড়া ভিড় থাকে। পিকনিক স্পটগুলোও সারা বছরের আয় এই তিন-চার মাসেই একবারে করে নেয়।

পিকনিক, আনন্দ-উৎসব ও বিনোদনের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই হবে। তাহলে ভাবছেন সমস্যা কোথায়? কেন এই লেখা? চলুন এবার আসল কথায় আসি। এই তো সবেমাত্র ভাষার মাস শেষ হলো। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ছিল। যদিও আমাদের মধ্যে দিবসকেন্দ্রিক একটি কুপ্রবণতা তৈরি হয়েছে। তবুও দিবসকে কেন্দ্র করে হলেও আমরা নিজেরা নিজেদের খুঁজে পাই। ভাষার জন্য অনেকেই জীবন দিল। রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলো। দেশ স্বাধীন হলো। লাল-সবুজের স্বাধীন পতাকা আকাশে ওড়ালাম। অর্থতৈনিকভাবেও এগিয়ে চলছি। কিন্তু যে ভাষাকে কেন্দ্র করে এতকিছু তার সামান্যটুকু মানও আমরা রাখতে পারছি না। পারছি না বাংলা বর্ণমালাকে সালাম, রফিক, জব্বারের মতো ভালোবাসতে। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে নিজেদের হারিয়ে ফেলছি। পিকনিক বা আনন্দ উৎসবে গিয়ে হিন্দি গানেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি। এমনকি ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবসের দিনও হিন্দি গানে মেতে উঠছি। যাদের বাড়ি কোনো পিকনিক স্পটের আশপাশে কেবল তারাই অনুভব করতে পারবেন, বছরের এই তিন-চারটি মাস ঠিক কী পরিমাণ শব্দ দূষণের নির্যাতন সহ্য করতে হয়। দিনব্যাপী উচ্চ শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে ওঠে। বক্সের উন্মত্ততাই বাড়িঘর ছেড়ে দিতে মন চায়। সাধারণত শব্দের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৬০ ডেসিবেল। যদিও শব্দের গ্রহণযোগ্যতার কয়েকটি ভাগ রয়েছে কিন্তু পিকনিক স্পট, বিয়েবাড়ি ও আশপাশের নানামুখী আনন্দ-উৎসবের মাইকের যে শব্দ তা সব সময় ১শ’ ছাড়িয়ে। উচ্চমাত্রায় শব্দ দূষণের কারণে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হৃদরোগ, আলসার ও বিরক্তবোধ থেকে মেজাজ খিটখিটে হয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় শিশু ও বয়স্কদের। নিজেদের অধিকার ফলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের যে কত বড় ক্ষতি হচ্ছে সেদিকটার বিন্দু পরিমাণও নজর নেই কারো। পিকনিক স্পটগুলোতে সেই কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলে গান-বাজনা। আশপাশের স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলে মনোযোগী হতে পারে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাত্সরিক শিক্ষা ভ্রমণেও কিন্তু সতর্কতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি টাকা বাঁচাতে ফিটনেসহীন গাড়ি করে দূরের কোথাও ভ্রমণে বের হয়ে অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়। শিক্ষার্থীদের আবদার রক্ষায় গাড়িতেই বক্স বসিয়ে ডিজে বা হিন্দি গান বাজিয়ে উচ্চ শব্দে মহাসড়কেই গাড়ি ছুটে চলে। বক্সের শব্দে সড়কে চলন্ত অন্যান্য গাড়ির সাংকেতিক শব্দ স্বাভাবিকভাবেই চালকের না শোনার কথা ফলে দুর্ঘটনা ঘটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। একদিকে শব্দ দূষণের মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি অন্যদিকে দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকির দিকে ঠেলে না দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানেই নির্দিষ্ট সময়ে আনন্দ করা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।

শহরের মানুষগুলো গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সবুজে ঘেরা গ্রামে গড়ে ওঠা পিকনিক স্পটগুলোতেই বেশি আগ্রহী থাকে। বড় বড় গ্রুপ বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাত্সরিক বনভোজন বা আনন্দ-উত্সবগুলো সাধারণত শুক্রবারই বেশি হয়ে থাকে। আমাদের গাজীপুরের গত কয়েকটি শুক্রবারের চিত্র তুলে ধরলে বোঝা যাবে ধর্মীয়কাজে কতটুকু বাধাগ্রস্ত হতে হয়। সাধারণত বেলা সাড়ে বারোটা থেকে দেড়টার মধ্যে মসজিদে মুসল্লিরা নামাজ শুরু করে। তখনো পিকনিকে আসা বন্ধুদের অনেকে উচ্চমাত্রায় বক্স বাজিয়ে গান পরিবেশন বন্ধ করে না। একদিকে ইমাম সাহেব মসজিদে খুত্বায় দাঁড়ায় অন্যদিকে ভ্রমণে আসা বন্ধুরা মাইক বা বক্স বাজিয়ে মহা আনন্দ-উত্সবে মেতে ওঠে। আশ্চর্যের বিষয় হলো অনেক বন্ধুকে দেখা যায়, নামাজ রেখে নামাজের সময়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দিয়ে কোরান তেলাওয়াত করায় অথচ পিকনিক স্পটগুলোর কর্তৃপক্ষের একটু নজরদারি ও পরিকল্পনার অভাবে এ ধরনের অশুভনীয় ও অসঙ্গতিপূর্ণ অনুষ্ঠানমালা পরিচালিত হয়ে থাকে। নামাজ ও স্কুলের সময়ে কোনো ধরনের গান-বাজনা চলবে না এমন নির্দেশনা থাকলেই কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া পিকনিকে আসা বন্ধুদেরও একটু ভেবেচিন্তে অনুষ্ঠান সূচি সাজালেই হয়। বিনোদন কেন্দ্র মালিকদের পাশাপাশি সরকারের অবস্থান থেকে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক কিছু বিধি-নিষেধ আরোপিত থাকলে শব্দ ত্রাস থেকে অনেকাংশেই রেহাই পাওয়া যেতে পারে।
– লেখক: সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.