পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস

পাহাড়ে কত সংখ্যক লোক বসবাস করে, কত পরিবার পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন, এমন তথ্য কারো কাছেই নেই। পাহাড় আলোচনায় আসে, যখন ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। প্রতিবছরই নিয়ম করে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। প্রাণ হারায় অসংখ্য মানুষ। পাহাড় ধসকে শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখলে হবে না। এটি মানবিক বিপর্যয়। উন্নয়নের নামে পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে সড়ক-বসতি ও নানা অবকাঠামো নির্মাণের ফলে এই বিপর্যয় ত্বরান্বিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালীরা পাহাড় দখল করে অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি গড়ে তুলে ভাড়া ও দখলস্বত্ব বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। ফলে পাহাড়ি জনপদ এখন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হলেও দেখার বা বলার কেউ নেই। প্রশাসনের কাছেও নেই পাহাড়ে বসবাসকারী ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সংখ্যা। দৈনিক মানবকণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের রামু উপজেলার এগারো ইউনিয়নে প্রায় ৭০ হাজার বাসিন্দা ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ে বসবাস করছে। পাহাড় ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি নেই। ফলে পাহাড় ধসে অপমৃত্যুর ঘটনা মাটির নিচে চাপা পড়ে। টানা কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই পাহাড় ধসের আতঙ্কে থাকে এসব মানুষ। পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিয়ে প্রশাসন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় দিন দিন বেড়েই চলছে পাহাড়ের বসতি।
নির্বিচারে গাছ এবং মাটি কাটার ফলে পাহাড় ও টিলাগুলো ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। এতে মুষলধারে বৃষ্টিপাতে মাটি নরম হয়ে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। পাহাড় ধসে প্রাণহানি-ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে প্রশাসনের তৎপরতা দেখা গেলেও পাহাড় ধস ঠেকানোর ব্যাপারে কারো মাথা ব্যথা নেই। শুধু প্রাকৃতিক কারণেই পাহাড় ধসে পড়ছে তা কিন্তু নয়। নিয়ন্ত্রণহীন পাহাড় কাটা, পাহাড়ে স্থাপনা নির্মাণসহ আরো কিছু অপরিণামদর্শী মনুষ্য তৎপরতার পরিণামে ধসে পড়ছে পাহাড়। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের আবাসিক হোটেল-মোটেল জোনসংলগ্ন কলাতলী সৈকতপাড়ায় উঁচু পাহাড় ও আশপাশের আরো কিছু পাহাড় কেটে মাটি সমান করে একের পর এক বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে এবং ওই পাহাড়ে নির্মিত ঘরবাড়ির সংখ্যা ৭ শতাধিকে পৌঁছেছে। এ ছাড়া শহরের লাইট হাউস পাহাড়, আদর্শ গ্রাম, পাহাড়তলী, জাদিরাম পাহাড় এবং হিলটপ সার্কিট হাউস পাহাড় কেটেও অসংখ্য ঘরবাড়ি তৈরি হয়েছে। পাহাড় কেটে চলছে প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রির রমরমা বাণিজ্য। দীর্ঘকাল ধরে পাহাড় কাটা, স্থাপনা নির্মাণ, পাহাড়ের গায়ে বেড়ে ওঠা গাছপালা উজাড়ের ফলে পাহাড়ের অবশিষ্ট মাটি আলগা হয়ে যায়। যার ফলে বৃষ্টি হলে পাহাড়ের গা বেয়ে তীব্র বেগে নেমে আসা ঢল আলগা মাটি ধুয়ে নিয়ে নিচে নামতে থাকে। পাহাড় হয়ে পড়ে দুর্বল, জীর্ণশীর্ণ। ঘটে পাহাড় ধস। মারা যায় পাহাড়ের ঢালে বস্তিতে বাস করা নি¤œ আয়ের হতদরিদ্র, ছিন্নমূল মানুষ। শুধু বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের ঢালের বসতি উচ্ছেদের ব্যবস্থা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, পাহাড় ধস ঠেকানোরও উদ্যোগ নিতে হবে। বন্ধ করতে হবে পাহাড় কাটা, পাহাড়ের বৃক্ষ উজাড়, উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ।