পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা

বর্ষার শেষ সময়ে এসে দেশের ভেতরে বৃষ্টির সঙ্গে উজানেও ভারি বর্ষণে প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বেড়েছে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, গঙ্গা, পদ্মা, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। আগামী দুই দিন ওই সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাবে। এভাবে চলতে থাকলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করেছেন বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান।

ইতিমধ্যে ধরলা, তিস্তা, যমুনেশ্বরী, যমুনা, টাঙ্গন, সুরমা, কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন, মনু, খোয়াই, ধলাই, ভূগাই সোমেশ্বরী ও কংস নদীর ১৭টি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার উপরে বয়ে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৯০টি পয়েন্টের মধ্যে ৮১টি পয়েন্টে পানি বাড়ার প্রবণতা রয়েছে।

এদিকে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, শেরপুর, সিলেট ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। পানিতে রেল লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পঞ্চগড় থেকে ঠাকুরগাঁও রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। নীলফামারী ও সুনামগঞ্জে প্রাথমিকের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। সৈয়দপুরে হুমকিতে শহর রক্ষা বাঁধ। এছাড়াও খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রাঙ্গামাটিতে অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ডুবে গেছে ঝুলন্ত সেতু।

ভারি বর্ষণ ও উজানের পানিতে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পঞ্চগড় থেকে ঠাকুরগাঁও রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। স্রোতের তোড়ে পঞ্চগড়ের নয়নিবুরুজ ও কিসমত স্টেশনের মাঝামাঝি এলাকায় রেল লাইনের পাথর পানির তোড়ে ভেসে যাওয়ায় শনিবার থেকে রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে।

রেলপথের কোনো কোনো এলাকায় পাথর-মাটি সরে দুই থেকে পাঁচ ফুট পর্যন্ত গর্তের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পঞ্চগড় রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার বজলুর রহমান।

এ সমস্যাকে ‘ওয়াশ আউট’ উল্লেখ করে স্টেশন মাস্টার বলেন, ওই দুই স্টেশনের প্রায় দুই কিলোমিটার রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এজন্য প্রতিদিন বিভিন্ন সময়ে যাতায়াতকারী চারটি ট্রেনের চলাচল বন্ধ আছে। এদিকে অবিরাম বর্ষণে পঞ্চগড় সদরসহ তেঁতুলিয়া ও দেবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে।

নীলফামারীর সৈয়দপুরের খড়খড়িয়া নদীর তীরবর্তী এলাকার হাজার-হাজার একরের ফসলের ক্ষেত ও পুকুর নালা, খাল-বিল ও বাড়ি ঘর ডুবে গেছে। আর এক ফুট পানি বৃদ্ধি পেলেই শহর রক্ষা বাধটিও ধ্বসে পরতে পারে। এতে বিমানবন্দরসহ পুরো শহর প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে নীলফামারী সদর উপজেলায় প্রাথমিক পর্যায়ের শনিবারের পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর।

কুড়িগ্রামে ধরলার পানি ৩৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যান্য নদ-নদীর পানিও বাড়ছে সমান তালে। শুরু হয়েছে ২য় দফা বন্যা। তাছাড়া ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৩০ সেন্টিমিটার ও তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ৫ দিন ধরে অবিরাম বর্ষণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। বাড়ি ঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গবাদি পশু নিয়ে মানুষ পড়েছে দুর্ভোগে। দেখা দিয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য সংকট।

তিস্তা, ধরলা, বুড়ি তিস্তা ও সানিয়াজান নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটে আবারো বন্যা দেখা দিয়েছে। তিস্তার পানিতে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। হাতীবান্ধা উপজেলার ধুবনী গ্রামে একটি বাঁধ ভেঙে গেছে। বুড়িমারী ইউনিয়নের বুড়িমারী স্থলবন্দর ডুবে যাওয়ায় আমদানি-রফতানি বন্ধ রয়েছে।

গাইবান্ধায় টানা বর্ষণে ব্যবসা বাণিজ্যসহ জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে কোথাও কখনো সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। দিনব্যাপী মেঘলা আকাশের ঝলকানির বিকট শব্দে আতঙ্কিত মানুষের এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করতে দেখা গেছে। সেই সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিপাতের কারণে প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া অনেকে ঘর থেকে বের হয়নি। এদিকে বেশকিছু এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

দিনাজপুরে তিন দিন ধরে টানা বর্ষণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় হিলি স্থলবন্দরে আমদানি-রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। জেলা আবহাওয়া অধিদফতরের সিনিয়র সহকারী মো. তোফাজ্জল হোসেন জানান, শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২১৬ দশমিক ৬ মিলি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে ভোগাই নদীর অন্তত ১৪টি স্থানে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। এছাড়াও নদীর তীর গড়িয়ে প্লাবিত হচ্ছে চেল্লাখালী নদীর পানিও। ফলে পৌরসভাসহ অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রাম আকস্মিক বন্যায় কবলিত হয়ে পড়েছে। এছাড়াও উপজেলার অন্তত ৮টি ইউনিয়নে আকস্মিক বন্যায় হাজার হাজার একর জমির রোপা-আমনের বীজতলা ও ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে।

টানা ভারি বর্ষণে সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত হয়েছে। জেলার কয়েকটি এলাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বৃষ্টিপাতের কারণে সড়কে পানি উঠে বেশ কয়েকটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। জেলার সাত উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বায়েজিদ খান জানান, জেলার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দিরাই ও ধর্মপাশা উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ব্যবস্থা ভেঙে গেছে। তাই দুই দিনের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

সিলেটের বিশ্বনাথে গত কয়েক দিনের টানা ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলার সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বৃষ্টিপাত ও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে উপজেলাজুড়ে বন্যা দেখা দিতে পারে। সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে উপজেলার লামাকাজি ইউনিয়নের বেশ কয়েক গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর পানির বিপদ সীমার ২০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়েছে হবিগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ।

খাগড়াছড়ির মাইনী নদীর পানি বিপদসীমা অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে দিঘীনালার কবাখালী, মধ্যবেতছড়ি, ছোট মেরুংয়ের ৪ শতাধিক ঘরবাড়ি, মেরুংবাজার ইতিমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে রাঙ্গামাটির লংগদুর সড়ক যোগাযোগ। টানা বর্ষণে কাপ্তাই হ্রদের পানি বেড়ে ডুবে গেছে রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত সেতু। তাছাড়া জেলার বাঘাইছড়ি, লংগদু, কাপ্তাই, ফারুয়া, সাজেকসহ বিভিন্ন এলাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

এদিকে বাঘাইছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল কাপ্তাই হ্রদ উপচে পড়া পানিতে তলিয়ে গেছে। সড়কের মাটির ধস হওয়ায় রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক শফি উদ্দিন আহমেদ জানান, হ্রদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধের ১৬ দরজায় প্রতিটি ৬ ফুট করে খুলে দেয়া হয়েছে।

কুমিল্লায় পাহাড়ি ঢলে হাজার একর বোরো আমনের জমি প্লাবিত হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার তলিয়ে গেছে ৩০টি গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৩ শতাধিক পরিবার।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ