পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক :
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। উচ্চ শিক্ষার মান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও প্রশ্নের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও প্রশিক্ষণের জন্য একটি অভিন্ন নীতিমালা করছে সরকার। গতকাল বুধবার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) এ নিয়ে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে শিক্ষামন্ত্রী, ইউজিসি চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। একই নিয়মে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতি হবে। এজন্য সবার মতামত নেয়া হয়েছে। এর ভিত্তিতে নীতিমালা প্রণীত হবে বলে মন্ত্রী জানান। তিনি বলেন, অভিন্ন শিক্ষক নিয়োগ, উপাচার্যরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে মতামত দিয়েছেন। এর ভিত্তিতে এ বিষয়ে গঠিত কমিটি নীতিমালা চূড়ান্ত করবে। এ নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং যোগ্যতম প্রার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাবেন। শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ বলেন, বিশ্ব^বিদ্যালয়ে যুগের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ শিক্ষা দিতে হবে। এজন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা, জ্ঞানচর্চা বাড়াতে হবে। জ্ঞান অনুসন্ধান ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল্লাহ আল হাসান চৌধুরীর সভাপতিত্বে কর্মশালায় ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি এ এস এম মাকসুদ কামাল এবং ইউজিসির সদস্য ড. মো. আখতার হোসেন বক্তব্য রাখেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক উপাচার্য আলোচনায় অংশ নিয়ে এ বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, শিক্ষক নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালা করতে অনেক দিনের সর্বোচ্চ চেষ্টার পর সেটি আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। উচ্চ শিক্ষার মান বজায় রাখতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের একই মানে উন্নীতকরণের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক উপাচার্য বলেন, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও নীতিমালার শর্ত পূরণ করলেই তাকে পদোন্নতি দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে বেতন-ভাতা বা সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে শিক্ষকদের সš§ানের জায়গাটা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগের সমন্বিত কোনো নীতিমালা নেই। শিক্ষক নিয়োগের বাণিজ্য, দৌরাত্ম্য, পদোন্নতি জটিলতা, লেজুড়ভিত্তিক শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব কমাসহ শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা আসবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানও সমান নয় এবং ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈষম্য বিরাজমান। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য ও শিক্ষক সংগঠনসহ রাজনৈতিক চাপে নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সরকারের মেয়াদের অন্তিম সময়ে শিক্ষক নিয়োগে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হলো।
শিক্ষক নিয়োগের অভিন্ন নীতিমালায় বলা হয়েছে, থিসিসসহ বিশ্ববিদ্যলয় পর্যায়ে সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদোন্নতি পদে ন্যূনতম ১০ বছরসহ মোট ২২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আর এমফিল প্রার্থীর ক্ষেত্রে ৭ বছরসহ মোট ১৭ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় থাকতে হবে। পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্তদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ন্যূনতম ৫ বছরের অভিজ্ঞতাসহ মোট ন্যূনতম ১২ বছরের সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সহকারী থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদোন্নতিতে একজন শিক্ষককের কমপক্ষে ৭ বছরের ক্লাসরুম শিক্ষকতাসহ ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। থিসিসসহ এমফিল প্রার্থীর ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৬ বছরসহ মোট ৯ বছরের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকতে হবে। আর পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৪ বছর মোট ন্যূনতম ৭ বছরের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকতে হবে। সব প্রার্থীর ক্ষেত্রে স্বীকৃত জার্নালে কমপক্ষে ৭টি গবেষণা প্রবন্ধ থাকতে হবে। সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ৪টি প্রকাশনা থাকতে হবে। সহকারী অধ্যাপকে পদোন্নতি পেতে একজন শিক্ষককের ন্যূনতম ৩ বছরের সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। থিসিসসহ এমফিল ডিগ্রিধারীদের জন্য ২ বছর এবং পিএইচডি ডিগ্রি থাকলে ১ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আর স্বীকৃত কোনো জার্নালে ন্যূনতম ৪টি প্রকাশনা থাকতে হবে। এ ছাড়াও বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, কলা ও মানবিক, বিজনেস স্টাডিজ, চারুকলা ও আইন অনুষদভুক্ত বিষয়গুলোর জন্য প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী থেকে সহযোগী এবং সহযোগী থেকে অধ্যাপক নিয়োগের জন্য একটি অভিন্ন শর্তাবলী যোগ করা হয়েছে নীতিমালায়। একইভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্কিটেকচার, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়, মেডিসিন, কৃষি ও কৃষি প্রাধান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা আলাদা নিয়োগ শর্তাবলী করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় বেতন স্কেলে বৈষম্যের প্রতিবাদে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষক নেতাদের বৈঠকে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে বৈষম্যের বিষয়টি সরকারের নজরে আসে। তখনই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে একটি মানসম্মত অভিন্ন নীতিমালা করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। মন্ত্রণালয় উচ্চ শিক্ষার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউজিসিকে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়।