পাবনায় ভেজাল দুধ ও ঘির জমজমাট ব্যবসা : বাজারজাত হচ্ছে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে

আমিনুল ইসলাম জুয়েল, পাবনা :
পাবনা জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৫শ’ দুগ্ধ খামার রয়েছে। তার মধ্যে জেলার ফরিদপুর, সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলা দুগ্ধ উৎপাদন প্রধান এলাকা হিসেবে পরিচিত। আর ওই সব এলাকায় রয়েছে ছানা তৈরির অনেক কারখানা। এসব কারখানায় প্রতিদিন তৈরি করা হচ্ছে হাজার হাজার লিটার ভেজাল দুধ। এ ছাড়াও ওই সব এলাকায় দেদার তৈরি হচ্ছে ভেজাল ঘি। বিশেষ করে সাঁথিয়ায় এক শ্রেণির অসাধু দুধ ব্যবসায়ী ভেজাল দুধ তৈরি করে তা দু-একটি বেসরকারি দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে বিক্রি করছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের দুধ ক্রয় কেন্দ্রের এক শ্রেণির কর্মকর্তাকে কমিশন (টাকা) দিয়ে তারা নকল দুধ বিক্রি করে যাচ্ছেন।
পাবনা প্রাণি সম্পদ অফিস সূত্র, ভেজাল দুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মচারী ও স্থানীয়রা জানান- পাবনায় প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার লিটার ভেজাল দুধ আর ১৫শ’ কেজি ভেজাল ঘি বাজারজাত হচ্ছে। রমজান ও আসন্ন ঈদের কারণে দুধের চাহিদা ও দাম বাড়ায় এ ভেজাল ব্যবসা বেড়ে গেছে। ভেজাল দুধ ও ঘিয়ের বেশিরভাগই খাঁটি দুধের সঙ্গে চলে যায় রাজধানীসহ সারাদেশে। সামান্য কিছু বিক্রি হয় স্থানীয় বাজারে। এদিকে এই দুগ্ধ অঞ্চলকে টার্গেট করে মিল্ক ভিটা, প্রাণ ডেইরি, আকিজ ডেইরি, আফতাব ডেইরি, ব্র্যাক ডেইরি ফুড (আড়ং), আমো ফ্রেস মিল্কসহ বেশ কিছু বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহের লক্ষ্যে পাবনায় তাদের আঞ্চলিক দুগ্ধ সংগ্রহশালা স্থাপন করেছে। এর ফলে এখানে তরল দুধের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। স্থানীয় কুদ্দুস, নাজমুল, মানিক, সুমন, কালা ঘোষের মতো অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ভেজাল দুধ, ছানা ও ঘি তৈরির সঙ্গে জড়িত। গত ৭ জুনে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ‘তানিয়া ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্ট, কারখানায় অভিযান চালান। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দুধ প্রক্রিয়াজাত করার অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেন তিনি। ‘ঘোষ’ নামে পরিচিত দুধ সরবরাহকারীদের চিহ্নিত করে তাদের প্রতিটি কারখানা ও বাড়িতে অভিযান চালিয়েই কেবলমাত্র এ ভেজাল দুধ, ছানা ও ঘি তৈরি বন্ধ করা সম্ভব। তবে দুধ ক্রয় কেন্দ্রগুলোর অসাধু কর্মকর্তারা চান না ওই ‘ঘোষ’রা ধরা পড়–ক। এ প্রসঙ্গে আড়ংয়ে আতাইকুলা চিলিং সেন্টারের কর্মকর্তা ও প্রাণ ডেইরি লিঃ বেড়ার কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে আধুনিক যন্ত্র দ্বারা পরীক্ষা করে দুধ সংগ্রহ করেন।
সম্প্রতি প্রতারণার কাজ ছেড়ে দেয়া ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাঁথিয়ার এক কারিগর (কথিত কেমিস্ট) জানান, প্রতি মণ ছানার পানিতে ২ কেজি ননী, লবণ, খাবার সোডা, সামান্য ইউরিয়া, ১ কেজি চিনি ও কৃত্রিম সুগন্ধি মিশিয়ে ভেজাল দুধ তৈরি করা হয়। এ ছাড়াও এক মণ ফুটন্ত পানিতে ১ কেজি দুধের ননী, আধা কেজি মিল্ক পাউডার, বাটার অয়েল, হাইড্রোজেন-পার-অক্সাইড, এক ফোঁটা ফরমালিনসহ নানা উপকরণ মিশিয়েও ভেজাল দুধ তৈরি করা হচ্ছে। ল্যাকটোমিটার (খাঁটি দুধ নির্ণয়ের যন্ত্র) দিয়ে এসব ভেজাল দুধ শনাক্ত করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া ভেজাল ঘি তৈরিতে ব্যবহার করা হয় সয়াবিন, পামঅয়েল, পশুরচর্বি, ভেজিটেবল ফ্যাট, আলুর পেস্ট, রাসায়নিক দ্রব্য, রং ও ফ্লেভার। রোজা বা ঈদ কে সামনে রেখে এ ভেজাল ব্যবসা জমজমাট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি হাসিব খান তরুণ জানান, মিল্ক ভিটায় বিশ্বের সর্বাধুনিক মিল্ক টেস্টিং মেশিনের সাহায্যে পরীক্ষা করে দুধ সংগ্রহ ও পরীক্ষার পর তা বাজারজাত করা হয়। তাই মিল্ক ভিটায় কেউ ভেজাল দুধ সরবরাহ করতে পারে না। দু’-একজন ভেজাল দেয় বলে সবাই তা করে। তা কিন্তু নয়। কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীর জন্য এ অঞ্চলের দুধের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন খামারিরা।
পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক আকসাদ আল মাসুর আনন জানান, বিষাক্ত দুধ পান করলে মানবদেহে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। ফরমালিন মেশানোর ফলে লিভার রোগ, কিডনি রোগ, ক্যান্সার, স্কিমড মিল্ক পাউডার খাওয়ার ফলে মানবদেহে হাড়ের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে। ফলে শরীরের পেছনের অংশে ব্যথা, চর্মরোগ, হজমে সমস্যা, পেটের পীড়াসহ নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে।