পান সমাচার

সাদিকুল নিয়োগী পন্নী:
‘যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম/ যদি নতুন একখান মুখ পাইতাম/ মহেশখালীর পানের খিলি তারে বানাই খাবাইতাম’- এই গানটি আমার নানু কখনো শুনেছেন কিনা আমার জানা নেই। তবে গান তিনি শুনে থাকুন আর নাই থাকুন, তার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন আমার জšে§র পর পরই। নতুন মুখ হিসেবে আমাকে পেয়ে তিনি আমাকে ভাত খাওয়া শেখার আগেই পান খাওয়া শিখালেন। তাও আবার জর্দাসহ পান। নানু আমার মুখে দাঁত গজানোর আগেই নিজে পান চিবিয়ে আমার মুখে দিতেন। আমি খেতে না চাইলে তিনি আদর করে বলতেন নানু ভাই পান না খেলে মুখে দুর্গন্ধ হবে। একমাত্র নাতি হওয়ার কারণে বাড়ির অন্যরাও এ ব্যাপারে কিছু বলত না। একটু বড় হওয়ার পর ভাত খাওয়া শেষ হলে নানি-নাতি দু’জনে একসঙ্গে বসে পান খেতাম। নানি বসে বসে পান খেতে খেতে গল্প করতেন আর আমিও শুনতাম। আমার মুখের পান শেষ হয়ে গেলে তিনি আবার দিতেন। আমি নিজে যখন চিবানো শিখলাম, তখন ভাত খাওয়ার পর নানু আদর করে হাতে পান তুলে দিতেন। শুরু হলো আমার পান খাওয়ার প্রাথমিক অভ্যাস।
দুই.
পান খেলে যাদের ঠোঁট লাল হয় তাদের বউ সুন্দরী হয় ও জামাইকে বেশি আদর করে- এমন প্রবাদ আমাদের এলাকায় প্রচলিত ছিল। স্কুল কলেজ জীবনে পরীক্ষার ফল ভাল-মন্দ নিয়ে তেমন চিন্তিত ছিলাম না। জল্পনা কল্পনায় ছিল একটা সুন্দরী বউ। তাই নিয়মিত পড়াশোনা না করলেও পান খেতাম রুটিনমাফিক। অনেক সময় গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পান খেতাম। তারপর নিজেরাই নির্ধারণ করতাম কার ঠোঁট বেশি লাল হয়। ফলাফলে অধিকাংশ সময়ই আমি এগিয়ে থাকতাম। একদিন সন্ধ্যায় আসিফ নামে আমার এক বন্ধু পান খেয়ে ঠোঁট লাল টুকটুকে করে আমাদের বাসায় এলো। এসেই সে আমাকে ডেকে বলল, দেখ আমার ঠোঁট। তুই জীবনেও এমন লাল করতে পারবি না। বিষয়টা দেখে যেমন অবাক হলাম তেমনি হতাশও হলাম। কারণ এমন লাল ঠোঁট দেখলে সুন্দরী মেয়েদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হবে তাকে বিয়ে করার জন্য। এমনকি নীল পরীরাও তার সঙ্গে ভাব জমাতে চাইবে। বর্তমান সময়ে হলে হয়তো পরীমণিও তার সঙ্গে লাইন মারতে চাইত। কিন্তু আসিফের এই লাল ঠোঁটের রহস্য ফাঁস করে দিলেন তার বড় বোন রিমা। রিমা একদিন দেখে আসিফ লুকিয়ে তার রুমে ঢুকে ড্রেসিং টেবিল থেকে লাল লিপস্টক বের করে নিজের ঠোঁটে দিচ্ছে। বিষয়টা তার কাছে অস্বাভাবিক হওয়ায় সে আসিফকে সরাসরি কিছু না বলে তার গতিবিধির ওপর নজরদারি শুরু করল। কয়েকদিনের মধ্যে সে বুঝে গেল আসল ঘটনা। আসিফ সবার চেয়ে নিজের ঠোঁট বেশি লাল করতেই পান খাওয়ার আগে লিপস্টিক লাগানোর পথ অবলম্বন করছে। প্রথমদিকে রিমা আসিফকে এ ব্যাপারে সতর্ক করলেও তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। রিমা শেষ পর্যন্ত নিজের লিপস্টিক রক্ষায় আমাদের বাড়িতে এসে অনুরোধ করলেন এই প্রতিযোগিতা বন্ধ করার জন্য। তারপর সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেল আমাদের এই প্রতিযোগিতা।
তিন.
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পান খাওয়া নিয়ে পড়লাম বিড়ম্বনায়। এখানে অধিকাংশ বন্ধু সিগারেট খেলেও কেউ পানের ধারেকাছেও যায় না। তাদের ভাষ্যমতে, সিগারেটের মধ্যে স্মার্টনেস, পান খাওয়া মানে গাউয়া ক্ষেত। ঠোঁট লাল হওয়ার সুফলতা বুঝিয়েও উল্টো আমি সবার হাসাহাসির পাত্র হলাম। কয়েকজন বন্ধু ঠাট্টা করে বলেই ফেলল, আমাদের প্রেমিকা আছে। তাই সিগারেট খেয়ে আপাতত ঠোঁট কালো করছি। লাল করার প্রয়োজন হলে প্রেমিকার কাছ থেকে লিপস্টিক নিব। তুই বরং তোর পান চর্চা চালিয়ে যা। এতে ক্যাম্পাসের কেউ তোর প্রেমে না পড়লেও অনন্ত কোনো সুন্দরী ডাক্তারের ছোঁয়া পাবি। কারণ তোর দাঁতের যে অবস্থা দু’দিন পর ডাক্তারের কাছে যেতেই হবে। ভাগ্য ভালো হলে সুন্দরী নারী ডাক্তারও পেয়ে যেতে পারিস। এমন তিরস্কারের পর আর কোনো বন্ধুকে পান খেতে বলার সাহস পাইনি। কিন্তু সঙ্গীবিহীন পান খাওয়ায় তেমন সুখ পাচ্ছিলাম না। একদিন সোহাগ নামে এক বন্ধুকে মেসে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে আসলাম। নিজহাতে গরুর মাংস রান্না করে দুজনে একসঙ্গে খেলাম। সোহাগ আমার রান্নার বেশ প্রশংসা করল। তারপর পান পর্ব। বন্ধু প্রথমে রাজি হতে চাইল না। আমি বললাম এমন একটা ভালো খাওয়ার পর পান সবাই খায়। অনেক যুক্তি আর অনুরোধে শেষ পর্যন্ত সে রাজি হলো। অনেকদিন পর আবার শুরু হলো ঠোঁট লাল করার প্রতিযোগিতা। দু’জন পান খাচ্ছি আর বার বার আয়নায় নিজেদের ঠোঁট দেখছি। আমার ঠোঁট মোটামুটি লাল হলেও সোহাগেরটা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল। আমি বললাম বন্ধু আরেকটু চুন খা। সোহাগ আগ্রহ নিয়ে আঙুলে চুন নিল। দু’ বন্ধু বেশ আয়েশ করে পান খাচ্ছি আর জমিয়ে গল্প করছি। হঠাৎ দেখি সোহাগ কেমন করছে। তার ঠোঁট লাল হওয়ার পরিবর্তে মুখ লাল হয়ে পড়েছে। আমি জানতে চাইলাম কিরে খারাপ লাগছে? সোহাগ বলল, মাথাটা কেমন জানি ঘুরাচ্ছে। আমি বললাম, তাহলে পান ফেলে দে। প্রতিযোগিতা করতে হবে না। কিন্তু সোহাগ প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেতে অনড়। এভাবে মিনিট কয়েক পার হতে না হতেই সোহাগ বসা থেকে ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল। আমি আতংকিত হয়ে চিৎকার শুরু করলাম। আমার আর্তনাদে আশপাশের রুমের লোকজন এগিয়ে এলো। কেউ সোহাগের মাথায় পানি ঢালছে, কেউ টক জাতীয় ফল খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। এভাবে মিনিট দশেক পর চোখ খুলে তাকাল সোহাগ। সে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর প্রথম ডায়ালগ দিল, আমার সুন্দরী বউয়ের প্রয়োজন নেই। কপালে পেতœী ঝুটলেও কখনো পান খাব না। আবারও সায়মিক বন্ধ হলো পান খাওয়া প্রতিযোগিতা।
চার.
পড়াশোনার খরচ বাবদ বাবা প্রতিমাসেই আমার কাছে কিছু টাকা পাঠাতেন। মানুষের হাত হয়ে সে টাকা আমার কাছে পৌঁছাতে অনেক সময় দেরি হয়ে যেত। ঝামেলা কমাতে ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার সিদ্ধান্ত নিলাম। একদিন ক্লাস শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের একটি ব্যাংকে গেলাম। অফিসের পরিবেশ দেখে মনে হলো এইমাত্র দুপুরের খাবার বিরতি শেষ হয়েছে। ব্যাংকের এক অফিস সহায়কের কাছে আমার কাজের কথা বললে তিনি আমাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে নিয়ে গেলেন। মধ্য বয়স্ক ওই ব্যক্তি একটা কাঠের চেয়ারে টেবিলের উল্টো দিক হয়ে আয়েশ করে পান খাচ্ছেন। তার টেবিলের সামনে যে আমি দাঁড়িয়ে আছি সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। বরং তিনি মনের সুখে পান খাচ্ছেন আর আহা… তৃপ্তির শব্দ করছেন এবং চেয়ারের হাতলে চুন মুছছেন। আমি আংকেল বলে ডাক দিলাম। তিনি একটু ঘুরে বললেন, বলো কী প্রয়োজন। আমি জানালাম আমার একটা অ্যাকাউন্ট করতে হবে। তিনি চোখ বন্ধ রেখেই প্রশ্ন করলেন, এই বয়সে অ্যাকাউন্ট দিয়ে কী করবে? আমি প্রয়োজনীয়তার কথা বললে তিনি চোখ খুলে বসতে বললেন। আমি এবার তার পান খাওয়ার কারণ জানতে চাইলাম। তিনি বেশ আগ্রহ নিয়ে বললেন, এই পানের জন্যই তিনি কয়েকটা অফিস বদলিয়েছেন। এখানে পান খাওয়া নিয়ে তাকে কেউ বিরক্ত করে না। নানা কথা বলতে বলতে তিনি আমার অ্যাকান্টের জন্য একটা ফরম পূরণ করছেন। অ্যাকাউন্টের কাজ শেষ করে ফেরার পথে মনে মনে চিন্তা করলাম-চাকরি করলে এমন অফিসেই করব যেখানে পান খাওয়া যাবে। এক কথায় বলতে গেলে পানবান্ধব অফিস।
পাঁচ.
পড়াশোনা শেষে চাকরি নিয়ে রাজধানী ত্যাগ করলাম। নতুন অফিস। সবাই দেখি ফিটফাট। পরিপাটি পরিবেশ দেখে মনে হলো এটা পানবান্ধব অফিস নয়। ধীরে ধীরে অফিসের সব সহকর্মীর সঙ্গে পরিচয় হলো। আমি পান খাওয়া এক কলিগের সন্ধান পেলাম। মনে মনে খুশি হয়ে ভাবলাম, তাহলে মাঝে মাঝে অফিসেও পান খাওয়া যাবে। একদিন এক অফিস সহায়কের কাছে ওই কর্মকর্তার কথা জানতে চাইলাম। সে আমাকে বলল, পান খাওয়া অফিসারের কাছে আপনার কী কাজ? এই কথা শুনে আমি আর কোনো কথা বললাম না। তাই পানের নেশাটা বাধ্য হয়ে কিছুটা কমিয়ে আনলাম। অফিস শেষে বাসায় আসার পর শুরু হয় পানচর্চা। কারণ এই সমাজ ছেলেদের ক্ষেত্রে বিড়ি-সিগারেটের স্বীকৃতি দিলেও পানের কোনো মূল্যায়ন করেনি। আর আমিও পানখোর অফিসার খেতাব থেকে বাঁচতে রাতে বাসায় পান খাই। তবে আগের মতো দেখা হয় না ঠোঁট লাল হয়েছে কি-না।