পাখিপ্রেম

ভারতের চেন্নাইয়ের অধিবাসী শেকার পাখির প্রতি মমত্ববোধ আর ভালোবাসা থেকে শুরু করেছিলেন এক অসাধারণ কাজ। যা তাকে একজন পাখি প্রেমিক হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে। প্রতিদিন দু’বেলা প্রায় ৪ হাজার টিয়া পাখির খাদ্য সংস্থান করে আসছেন শেকার। আর তার এই কাজ চলে আসছে গত ১০ বছর ধরে।
প্রতিদিন ভোরে এবং বিকালে বাসায় ছাদ ও তার আশপাশের অনেকটা এলাকা জুড়ে শেকার পাখিদের জন্য খাবার ছড়িয়ে রাখেন। আর পাখিরাও ঠিক সময়মতো শেকারের বাড়ির দরজায় হাজির হয়ে যায়। খাবার খেয়ে এরপর পাখিগুলো যার যার কাজে চলে যায়। কিন্তু প্রতিদিন দু’বেলা শেকারের বাড়িতে হাজিরা দিতে ভুল করে না তারা। কেননা তারা জানে পাখি প্রেমী শেকার তাদের জন্য প্রতিদিন খাবার পেতে রেখেছেন।
চেন্নাইতে গত ২৫ বছর ধরে বাস করছেন শেকার। সেখানেই ক্যামেরা ঠিক করার কাজ করে আসছেন তিনি। কিন্তু আজ থেকে ১০ বছর আগে ঘটে যাওয়া এক ঘটনার পর পেশার পাশাপাশি আরো একটি দায়িত্ব তার যোগ হয়। যার থেকে লাভ অর্থে হয় না, হয় পাখিদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসায়।
সেবার সুনামির কারণে চেন্নাইয়ের ব্যাপক ক্ষতি হয়। মানুষের পাশাপাশি অসহায় হয়ে পড়ে রাজ্যের পশু পাখিও… এমনই এক সময়ে তার বাড়িতে হাজির হয়েছিল আশ্রয়হীন দুটি টিয়া পাখি।
অসহায় পাখি দুটিকে ফিরিয়ে দেননি তিনি। আশ্রয়ের পাশাপাশি ব্যবস্থা করেছিলেন খাদ্যের। যা ঠিকই বুঝতে পেরেছিল পাখি দুটি। সম্ভবত তাদের কাছ থেকেই টিয়াকুল জানতে পারে, এই দুনিয়ার এমন এক মানুষ আছে যার বুকে রয়েছে পাখিদের প্রতি ভালোবাসা।
এরপর শেকার অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, তার কাছে আসা টিয়া পাখিদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। দুটি থেকে দশটি, এরপর পঞ্চাশটি.. এভাবে তার বাসায় টিয়া পাখিদের ভিড় বাড়তেই থাকে। এখন যা সব মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজারে। সম্ভবত রাজ্যের এবং এর আশপাশের সব টিয়ার জানা এই মানুষটির কথা।
স্নেহ আর ভালোবাসা থেকে শুরু করা এই কাজটি এখন তার কাছে দায়িত্ব বলেই মনে হয়। তার জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব টিয়া পাখি। যার কারণে গত ১০ বছরে বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে পারেননি শেকার। ভয় হয়, যদি তাকে না পেয়ে অভুক্ত পাখিরা কষ্ট পায়।
প্রতিদিন হাজার হাজার টিয়া পাখির জন্য ৬০ কেজি খাবারের প্রয়োজন হয়। যার দাম প্রায় ৫শ’ রুপি। মূলত ক্যামেরা সারাইয়ের কাজ করেন তিনি। সেটাই তার পেশা! বর্তমান স্মার্ট ফোনের যুগে আয় মোটামুটি হলেও সেখান থেকেই পাখিদের আহারের সংস্থান করে থাকেন শেকার।
শেকার জানান, হাজার হাজার টিয়া পাখির কলকাকলিতে স্থানীয় বাসিন্দারাও বিস্মিত হন। তবে কেউ কখনো টিয়া পাখিদের কোনো ক্ষতি করেনি। অনেক পথিক টিয়ার মিছিলের খাওয়ার দৃশ্য দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে উপভোগও করেন।
ষাটোর্ধ্ব শেকার বলছেন, গত দশ বছর ধরে আনন্দের সঙ্গেই তিনি কাজটি করে আসছেন। যদিও সব সময় তার স্বাস্থ্য এক রকম থাকে না। হাতের জোরও কমে আসছে। ছাদ বেয়ে ওঠাও এখন তার জন্য কষ্টকর। কিন্তু এরপরও এই দায়িত্ব থেকে তিনি সরে আসতে পারেননি। শেকার বলছিলেন, ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে অনেকে টিয়া পাখিকে খাঁচায় বন্দি করেন। কিন্তু তিনি যেন উল্টো টিয়া পাখিদের খাঁচায় বন্দি হয়ে গেছেন। যদিও সেই খাঁচা লোহার নয়, ভালোবাসার!