পশুর উচ্ছিষ্ট কাজে লাগান

গত কয়েক বছর ধরে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজার মন্দা গেলেও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের কদর কমেনি। সে সঙ্গে কমেনি কোরবানির উচ্ছিষ্টের কদরও। ঈদের পরই রাজধানীতে জমে ওঠে কোরবানির পশুর হাড়ের রমরমা ব্যবসা। কোরবানি পরবর্তী সময়ে পশুর উচ্ছিষ্টে লেনদেন হয় হাজার কোটি টাকা। দৈনিক মানবকণ্ঠে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পশুর বর্জ্য রফতানিতে আমাদের আয় হয়েছে ১৭০ কোটি টাকার বেশি। আর এ বছর এর পরিমাণ ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো-ইপিবির দেয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রাণীর ফেলে দেয়া পেট, গোল্লা, হাড় ও শিং রফতানি করে আয় হয়েছে এক কোটি ৬৫ লাখ ডলার বা (এক ডলার ৮১ টাকা হিসাবে) ১৩৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এক সময় কোরবানি দেয়া গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার হাড়, শিং, অণ্ডকোষ, নাড়িভুঁড়ি, মূত্রথলি, পাকস্থলী ও চর্বি ফেলে দেয়া হতো। কিন্তু এগুলো এখন আর ফেলনা নয়। এসব বর্জ্য থেকেই হচ্ছে কোটি টাকার বাণিজ্য। বর্জ্যরে মধ্যে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, জাপান ও চীনে গরু-মহিষের লিঙ্গ অত্যন্ত দামি বস্তু। এ দিয়ে তৈরি স্যুপ ওইসব দেশে খুবই জনপ্রিয় ও দামি খাবার। ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। এসব দেশে পশুর একেকটি লিঙ্গ ৮-১০ ডলারে বিক্রি হয়। এছাড়া গরু-মহিষের দাঁত ও হাড় থেকে তৈরি হয় ক্যাপসুলের কাভার। পশুর হাড় দিয়ে ওষুধ ক্যাপসুলের কাভার, মুরগি ও মাছের খাবার, জৈব সার, চিরুনি ও পোশাকের বোতাম তৈরি হয়। নাড়ি দিয়ে অপারেশনের সুতা, রক্ত দিয়ে পাখির খাদ্য, চর্বি দিয়ে সাবান পায়ের খুর দিয়ে অডিও ভিডিওর ক্লিপ, অণ্ডকোষ দিয়ে তৈরি হয় জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাদ্য সুসেড রুল। গরুর রক্ত শুকিয়ে ব্লাড মিল তৈরি করা যায়। সিরামিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবেও হাড় ব্যবহƒত হয়। এছাড়া জার্মানি ও ইতালিতে ব্যাপক চাহিদা থাকায় পশুর শিং সরবরাহ করা হয়ে থাকে। দৈনিক মানবকণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, রাজধানীতে রয়েছে পশুর বর্জ্যরে বিশাল বাজার। বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জে রয়েছে দুটি বাজার একটি জিঞ্জিরায়, অন্যটি হাসনাবাদ এলাকায়। আগে কেবল ঢাকার আশপাশ থেকে এই বাজারে শিং ও হাড় এলেও এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই এই বাজারে আসছে গরু-মহিষের শিং ও হাড়। এখানে প্রতি মণ শিং ৬০০ টাকা ও প্রতি মণ হাড় বিক্রি হয় ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা দরে। তাছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে তিন টাকা কেজি দরে পশুর হাড়, ২০-৩৫ টাকা দরে পশুর অণ্ডকোষ, ১২০ টাকা দরে পাকস্থলী, শিং ১০০ টাকা, চোয়ালের হাড় তিন টাকা কেজি দরে কিনে নেন ব্যবসায়ীরা। সারাদেশে ৩৫টির মতো কারখানা রয়েছে, যেখানে হাড় গুঁড়ো করা হয়। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ায় এ কারখানাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
আমাদের সামনে সম্ভাবনা অনেক। আজকে কোনো কিছুই ফেলে দেয়ার নয়। পুনঃউৎপাদনের মাধ্যমে বস্তুর রূপান্তর ঘটানো যায়। মানবজীবনের চাহিদা পূরণের জন্য তুচ্ছ ও ফেলনা জিনিসের দিকেও তাই আগ্রহ বাড়ছে সে সব বস্তু কাজে লাগানোর জন্য। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে অতুল সম্পদ। এ জন্য ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারেরও সচেতন উদ্যোগ প্রয়োজন। পশুর বর্র্জ্য রফতানির মাধ্যমে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যে পথ উন্মুক্ত হয়েছে, তার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে সমৃদ্ধির পথকে মসৃণ করতে হবে।