পরিসর বাড়ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলার

পরিসর আরো বাড়ছে এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলার। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভের গ্লাস টাওয়ারকে কেন্দ্র করে বিন্যস্ত হচ্ছে মেলার এবারের নকশা। আয়োজক বাংলা একাডেমি চাইছে চলতি বছরের বাহ্যিক সৌন্দর্য আরো বাড়াতে। ইতিমধ্যে অনেকটুকু এগিয়ে গেছে প্রাঙ্গণবিন্যাসের কাজ। স্টল নির্মাণের কাঠামো বসতে শুরু করেছে বাংলা একাডেমিতে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কাজও শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে। সবকিছু ঠিক থাকলে এবারো ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের পথ ধরে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়। তারপর বাঙালির জীবনে এসেছে আরো অনেক বিজয়। আর দুই বছর পরেই স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর এবং এক বছর পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। জাতির জীবনে এই গুরুত্বপূর্ণ দুটি সময়ের একটি বছর আগে কীভাবে আমাদের বিজয়গাথার অন্বেষণ হবে, সেটিকে মাথায় রেখেই সাজানো হবে পুরো গ্রন্থমেলা। মূলত ‘বিজয়’ থিমে সাজানো হবে গ্রন্থমেলার প্রতিটি স্তর। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সামনের লক্ষ্য নির্ধারণের জন্য গ্রন্থমেলার আলোচনা, সেমিনার সবকিছুর আয়োজন করা হবে। মেলায় প্রথমবারের মতো ‘লেখক পরিচয়’ নামের মঞ্চে প্রতিদিন ৫ লেখক তার নতুন বই নিয়ে কথা বলবেন। এ ছাড়াও ৩০ জানুয়ারির পর মেলার ভেতরে কেনো স্টলের কাজ করতে দেয়া হবে না বলে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও পুরো গ্রন্থমেলাকে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের (জিপিএস) আওতায় আনা হবে।

বাংলা একাডেমি সূত্রে জানা যায়, ‘বিজয়’ থিমে অমর একুশে গ্রন্থমেলা সাজানোর সব প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝর নকশা করেছেন। যার অংশ হিসেবে এবার মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভের পাশ ঘেঁষে যে টিনের প্রাচীর দেয়া হয়, সেটি এবার থাকছে না। ওই অংশটি খোলা রাখা হবে। স্বাধীনতা স্তম্ভের গ্লাস টাওয়ারের আলোয় আলোকিত হবে মেলা প্রাঙ্গণ এমন ভাবনাও কাজ করেছে।

এদিকে, এবারই প্রথম মেলায় অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রকাশকরা অনলাইনে আবেদন করেছেন। গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের আবেদনপত্র নেয়া হয়। তবে সনাতন পদ্ধতিতেও আবেদনপত্র জমা দেয়ার ব্যবস্থা ছিল। সব মিলিয়ে সাত শতাধিক প্রকাশনা সংস্থা মেলায় অংশ নেয়ার আবেদন করেছে। ২১ জানুয়ারি পুরনো নিয়মে তাদের মধ্যে স্টল বরাদ্দ দেয়া হবে। এবার উদ্যানের ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট সংলগ্ন গেটে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা ও নতুন একটি প্রবেশপথ তৈরির চিন্তাও চলছে বলে জানান তিনি।

গত দুইবারের ধারাবাহিকতায় এবারো মেলার সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নিরাপদ ইভেন্টস। মেলার স্পন্সর হিসেবে রয়েছে বিকাশ। মেলায় এসে বিশ্রামের জন্য একটু বসার স্থান, মানসম্মত টয়লেট, সহনশীল দামে খাবার নিয়ে অভিযোগ তোলেন অনেক পাঠকই। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখেও কাজ করা হচ্ছে বলে জানা যায়। এবারের মেলায় মোড়ক উন্মোচন মঞ্চের পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছে ‘লেখক বলছি’ শিরোনামের আরেকটি মঞ্চ। এখানে প্রতিদিন মেলায় প্রকাশিত বইয়ের মধ্য থেকে পাঁচটি মানসম্মত বইয়ের লেখক তাদের লেখা ও বই নিয়ে কথা বলবেন। তার জন্য আগের দিন বই জমা দিতে হবে। সেখান থেকে বাছাইয়ের মাধ্যমে লেখক ও বই নির্বাচন করা হবে।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক ড. জালাল আহমেদ বলেন, আমরা গ্রন্থমেলার যে গুরুত্ব এবং বিশেষত্ব, সেটি নানাভাবে তুলে ধরতে চাই।

লেখক বলছি মঞ্চ তেমনই একটি উদ্যোগ। প্রত্যেক লেখক এখানে নিজে তার বই নিয়ে ৮ মিনিট, উপস্থাপক ২ মিনিট বলার পর দর্শকদের প্রশ্নোত্তরের পর্ব থাকবে। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে পাঠক-ক্রেতারা মেলায় প্রকাশিত ভালো বইগুলো নিয়েও জানতে পারবেন।

প্রতিবছর দেখা যায়, কয়েক মাসের প্রস্তুতির পরও মেলা গুছিয়ে উঠতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগে যায়। কার পার্কিং নিয়ে থাকে নানা অভিযোগ। এসব বিষয়ে বাংলা একাডেমির নবনিযুক্ত মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরজী বলেন, আমরা নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি ৩০ জানুয়ারির পর স্টল নির্মাণের আর কোনো কাজ করতে দেয়া হবে না। এর মধ্যে কারো স্টল নির্মাণ না হলে আমরা সেই স্টল বন্ধ করে দিতে পারি। ৩১ জানুয়ারি কাজ বন্ধ থাকবে এবং ১ ফেব্রুয়ারি থেকে পূর্ণ আমেজে মেলা চলবে। আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের দিকের একটি প্রবেশপথের জন্য বলছি। গণপূর্ত অধিদফতর থেকে এ ব্যাপারে জানানো হবে। তাছাড়া দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি পর্যন্ত প্যারালাল গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে।

তিনি আরো বলেন, আমরা মেলায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই। হাতে হাতে এখন মোবাইল ফোন। পুরো গ্রন্থমেলাকে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের (জিপিএস) আওতায় আনা হবে। তাই বইমেলায় প্রবেশ করার পর পাঠক ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিজের অবস্থান যেমন জানতে পারবেন, তেমনি তার পছন্দের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে তিনি কীভাবে যাবেন, সেই দিকনির্দেশনাও পাবেন জিপিএস সিস্টেমের মাধ্যমে।

গ্রন্থমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে দুই ক্যাটাগরিতে প্যাভিলিয়ন থাকছে ২৩টি। এর মধ্যে ২৪ বাই ২৪ ফুটের প্যাভিলিয়ন থাকছে ১০টি আর ২০ বাই ২০ ফুটের প্যাভিলিয়ন থাকছে ১৩টি। এ ছাড়া চার ইউনিটের স্টল থাকবে ১৯টি, ৩ ইউনিটের স্টল থাকবে ৩৩টি, ২ ইউনিটের স্টল থাকবে ৯৪টি এবং ১ ইউনিটের স্টল থাকবে ১১২টি। আর শিশু কর্নারে শিশুবিষয়ক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের জন্য ৭৫টি ইউনিট রাখা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের প্যাভিলিয়ন থাকছে সেগুলো হলো- আগামী, অবসর, অনুপম, ঐতিহ্য, তাম্রলিপি, শোভা প্রকাশ, কথাপ্রকাশ, অনন্যা, অন্বেষা, পাঠক সমাবেশ, অন্য প্রকাশ, সময়, মাওলা ব্রাদার্স, কাকলী প্রকাশনী, বাংলা প্রকাশ, উৎস প্রকাশন, অনিন্দ্য প্রকাশ, নালন্দা, জার্নিম্যান বুকস, প্রথমা, পার্ল পাবলিকেশন্স, ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ ও পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স। একাডেমি সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২১ জানুয়ারি লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হবে। গ্রন্থমেলায় এ বছর ৪৫০টি প্রকাশক অংশ নিচ্ছে।

আর মোট ৬৯০টি ইউনিট থাকছে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশ মিলিয়ে। এর মধ্যে ১৯টি নতুন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সুযোগ পেয়েছে গ্রন্থমেলায় অংশ নেয়ার। এ বছরও মেলার সময় বাড়ানো হচ্ছে না। বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্তই থাকছে মেলার সময়সীমা। রাত সাড়ে ৮টার পর আর কেউ মেলায় প্রবেশ করতে পারবেন না।

বাংলা একাডেমির পরিচালক ও মেলার সদস্য সচিব জালাল আহমেদ জানান, বরাবরের মতো এবারো মেলায় শিশু কর্নার থাকছে। সেখানে শিশুদের জন্য খেলার ব্যবস্থার পাশাপাশি থাকছে তাদের জন্য বইয়ের স্টল। এবার শিশু কর্নারে নতুন পাঁচটিসহ ৩৯টি এক ইউনিটের, ১৫টি দুই ইউনিটের এবং দুটি তিন ইউনিটের স্টল; সব মিলিয়ে ৫৬টি শিশুতোষ প্রকাশনা সংস্থার স্টল থাকবে।

মানবকণ্ঠ/এএম