পরিসংখ্যানে এগিয়ে বিএনপি সাংগঠনিকে আওয়ামী লীগ

বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত বরিশাল। সিটি কর্পোরেশন থেকে শুরু করে সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর জয়ের মধ্য দিয়ে দুর্গের প্রমাণ দিচ্ছে বিএনপি। এতে কোনো আত্মতুষ্টিতে না ভুগে জনগণের সমর্থন চেয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী সাবেক মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ার। এদিকে বিগত ভোটের পরিসংখ্যানে বিচলিত নয় আওয়ামী লীগ। দক্ষিণাঞ্চলে সরকারের ব্যাপক উন্নয়নের কারণে ভোটের পরিসংখ্যান পাল্টে যাওয়ার আশা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের। অন্যদিকে বাম ঘরানার দুই মেয়র প্রার্থীর দাবি কারো ভোট ব্যাংক অক্ষুন্ন থাকে না।

বর্তমান নতুন প্রজন্ম পরিবর্তনের পক্ষে। যদিও দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে ভোটারদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা সচেতন নাগরিক নেতাদের। পৌরসভা বিলুপ্ত করে ২০০২ সালের ২৫ জুলাই গঠিত বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রথম ভোট অনুষ্ঠিত হয় ২০০৩ সালের ৩১ মার্চ। ওই ভোটে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার ৪২ হাজার ৬২১ ভোট পেয়ে প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত নাগরিক পরিষদের এনায়েত পীর খান পেয়েছিলেন ৩২ হাজার ৬৫৫ ভোট। অপরদিকে বিএনপির দুই বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল ২০ হাজার ২৪৮ ভোট এবং এবায়েদুল হক চাঁন পেয়েছিলেন ১৩ হাজার ৮৫৬ ভোট। বিএনপির দুই বিদ্রোহী প্রার্থী পেয়েছিলেন মোট ৩৪ হাজার ১০৪ ভোট।

২০০৮ সালের ৪ আগস্টের দ্বিতীয় পরিষদের নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেয়নি বিএনপি। ওই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সরদার সরফুদ্দিন সান্টুকে মাত্র ৫৮৮ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন। হিরন পেয়েছিলেন ৪৬ হাজার ৭৯৬ ভোট এবং সান্টু পেয়েছিলেন ৪৬ হাজার ২০৮ ভোট। ওই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিএনপির আহসান হাবিব কামাল পেয়েছিলেন ২৬ হাজার ৪১৬ ভোট এবং এবায়দুল হক চাঁন পেয়েছিলেন ১৯ হাজার ৬২৬ ভোট। বিএনপির দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী পেয়েছিলেন মোট ৪৬ হাজার ৪২ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী সান্টুর অনুকূলে জমা পড়া ভোটের বেশিরভাগ বিএনপি ঘরানার বলে তখন অনেক বিশ্লেষক বলেছিলেন। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ১৫ জুনের তৃতীয় নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত আহসান হাবিব কামাল ৮৩ হাজার ৭৫১ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত শওকত হোসেন হিরন পেয়েছিলেন ৬৬ হাজার ৭৭১ ভোট।

বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, ‘আমি হঠাৎ করে রাজনীতিতে আসি নাই। বরিশালের ধুলো-কাদায় বড় হয়েছি। এই এলাকার উন্নয়ন করেছি, রাজনীতির সঙ্গে আছি, আন্দোলন সংগ্রাম সবকিছুতেই জনগণের সঙ্গে আছি। সুখে-দুঃখে সব সময় মানুষের পাশে থেকেছি।’ এ সময় বিগত দিনের ভোটের পরিসংখ্যানে আত্মতুষ্টিতে না ভুগে জনগণের পুনসমর্থন চেয়েছেন সরোয়ার।

এদিকে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সাদিক আবদুল্লাহ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী এবং সুসংগঠিত করার জন্য আমি কাজ করে যাচ্ছি। এর বাইরে আমার কোনো চাওয়া পাওয়া নেই।’

মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল বলেন, ‘বিগত ৩ সিটি ভোটের পরিসংখ্যানে মোটেই বিচলিত নয় আওয়ামী লীগ। সেই দিন চলে গেছে। নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং স্বাধীনতাকে চিনেছে, শেখ হাসিনার উন্নয়নের ধারা সম্পর্কে বুঝেছে। নতুন প্রজন্ম আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে বলে আমার বিশ্বাস। বিগত দিনের ভোটের পরিসংখ্যানের গ্যাপ (শূন্যস্থান) আওয়ামী লীগ পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থীই এখানে জয়ী হবে।’

কমিউনিস্ট পার্টির মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট এ কে আজাদ বলেন, ‘গত ৪৫ বছর ধরে আমি বরিশালে রাজনীতি করছি। এখানকার শ্রমিক, পেশাজীবী এবং বস্তিবাসীসহ সব মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে বরিশালে কমিউনিস্ট পার্টির ভোট ব্যাংক আছে।’

বাসদের মেয়র প্রার্থী ডা. মনিষা চক্রবর্তী বলেন, ‘বরিশালের গণমানুষের জীবনের নানা সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাসদ নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। নির্বাচনে জনগণের মাঝে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। শিক্ষিত এবং শ্রমজীবী মানুষ পরিবর্তন চায়।’

ডা. মনিষা বলেন, ‘বরিশালের ভোটারদের বৃহদাংশ তরুণ এবং নারী। তাদের হাত ধরেই বরিশালে পরিবর্তনের সূচনা হবে।’

বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সাবেক সভাপতি মানবেন্দ্র বটব্যাল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বরিশালে নতুন করে সুসংগঠিত হয়েছে। বিএনপিও সংগঠিত, যদিও সুসংগঠিত নয়। যদিও তাদের বিশাল কর্মী-সমর্থক রয়েছে।’ নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থ না হলে এখানে কেউ রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বিস্তার লাভ করতে পারবে না বলে মনে করে তিনি। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ভোটারদের মানসিকতায় অবশ্যই পরিবর্তন হয় বলে মনে করেন।

৫৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বরিশাল সিটির ৪র্থ পরিষদের নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের মোট ৬ জন মেয়র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ৩০ জুলাইয়ের ভোটে মোট ভোটার ২ লাখ ৪১ হাজার ৯৫৯ জন।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ