পরিবারের সদস্যদের আগেই পাঠিয়ে দিচ্ছেন চাকরিজীবীরা

প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। বাস, ট্রেন, লঞ্চ টার্মিনালে সকাল থেকে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। কমলাপুর রেল স্টেশনে প্রায় প্রতিটি ট্রেনে ছিল বাড়তি মানুষের চাপ। ছাদেও ঠাঁই ছিল না। এর মধ্যে কয়েকটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ছেড়েছে। ফলে রেলপথে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের। সড়কপথে দীর্ঘ ভোগান্তি না হলেও ফেরিঘাটে কিছুটা জটলা রয়েছে। নৌপথেও বাড়তি মানুষের চাপ ও বিলম্বে লঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বাড়তি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে বাসের টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে দেয়া হবে। গতকাল রোববার সকাল থেকেই ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড় ছিল কমলাপুরে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো ট্রেনগুলো ছিল পরিপূর্ণ। কাক্সিক্ষত ট্রেনের অপেক্ষায় বসে ছিলেন অসংখ্য যাত্রী।

১ জুন ট্রেনের অগ্রিম টিকিট সংগ্রহকারীরা ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঈদ যাত্রা শুরু করেছেন। যেসব যাত্রী টিকিট সংগ্রহ করেছেন তারাই গতকাল ১০ জুন আগেভাগেই নাড়ির টানে বাড়ি গেছেন। ধারাবাহিকভাবে ১৫ জুন পর্যন্ত ট্রেনের অগ্রিম টিকিট সংগ্রহকারী যাত্রীরা বাড়ি যাত্রা করবেন। সড়কে যানজট, দুর্ভোগ এড়ানোর জন্য অনেক চাকরিজীবী তাদের পরিবারের সদস্যকে আগেই বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রমজান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ইতিমধ্যে ছুটি ঘোষণা করেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা স্বজনদের সঙ্গে গ্রামে ঈদ উদযাপন করার জন্য আগেই ঢাকা ছাড়ছে। আজ থেকেই যানজটের ঢাকা ফাঁকা হতে শুরু করবে। বিভিন্ন অফিস-আদালত এই সপ্তাহের বৃহস্পতিবার অফিস হয়ে ঈদের ছুটি হবে। তখন চাকরিজীবীরা রাজধানী ছেড়ে ঘরমুখো হবেন। এদিকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করে বলেছে, এ বছর ট্রেনে শিডিউল বিপর্যয় হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।

রেল সূত্র জানায়, ট্রেনে ঢাকা থেকে দিনে কমপক্ষে ৫০ হাজারের ওপরে লোক বাড়ি যাবেন। ঈদ উপলক্ষে যাত্রীরা প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার অগ্রিম টিকিট নিয়েছিলেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন ট্রেনে তাৎক্ষণিক ১৫ থেকে ২০ শতাংশ স্ট্যান্ডিং টিকিটও দিয়ে থাকেন কর্তৃপক্ষ। গতকাল কমলাপুর স্টেশন থেকে ৬৩টি ট্রেন ছেড়ে যায়। এর মধ্যে ২৮টি আন্তঃনগর, বাকিগুলো মেইল, এক্সপ্রেস ও লোকাল ট্রেন।

মেয়েকে নিয়ে কিশোরগঞ্জে যাওয়ার জন্য কমলাপুর এসেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী বাবু। তিনি বলেন, মেয়ের কোচিং শেষ বলে এজন্য আগেই চলে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, পরিবারের অন্য সদস্যদের ঢাকায় ঈদের আগ পর্যন্ত কোনো কাজ নেই। স্কুল কোচিংয়ে ছুটি হয়ে গেছে। তাছাড়া ঈদের আগে আগে যাওয়া ঝামেলাও অনেক। এজন্য তাদের আগেভাগে বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শামসুল হক ঈদের ভিড় এড়াতে আগেই বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছেন স্ত্রী-সন্তানকে। রোববার তিতাস কমিউটার ট্রেনে কথা হয় শামসুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঈদের আগে তো ব্যাপক ভিড় হয়। ট্রেনে তো উঠাই যায় না। এজন্য তাদের বাড়ি দিয়ে আসব। আমি বিকেলের ট্রেনেই চলে আসব। ঈদের আগের দিন আবার বাড়ি যাব।

রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত ২১টি ট্রেন ছেড়ে গেছে বলে জানান কমলাপুর স্টেশনের ব্যবস্থাপক সিতাংশু চক্রবর্ত্তী। তিনি বলেন, রোববার সকাল থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোয় ভিড় স্বাভাবিক ছিল। উপচেপড়া ভিড় এখনো শুরু হয়নি। আশা করছি ১২ তারিখ থেকে সেটা শুরু হবে। ট্রেনের সময়সূচিতে জটিলতা নেই দাবি করে তিনি বলেন, সকালে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোর মধ্যে শুধু সুন্দরবন এক্সপ্রেস ৩০ মিনিট দেরি করেছে। সেটা দেরি করেই স্টেশনে এসেছিল। বাকি ট্রেনগুলো সব ঠিক সময়ে ছেড়েছে। এবার ট্রেনের ছাদে যেন কেউ ভ্রমণ করতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মানবকণ্ঠকে বলেন, সড়কে যান চলাচল বেড়ে গেলে এবং বৃষ্টি হলেও ঈদ উপলক্ষে ঘরমুখো যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়বেন না। তিনি বলেন, বৃষ্টি-বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো অনেকাংশে মেরামতের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তাই এবার ঈদযাত্রায় বৃষ্টি হলেও যাত্রীদের ভোগান্তি হবে না। তিনি বলেন, আজ থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত যান চলাচলের হার বেড়ে যাবে। যান চলাচলের চাপ বাড়লে গতি হয়তো ধীর হয়ে যেতে পারে। তবে যানজট হবে না।

সেতুমন্ত্রী বলেন, ঈদ সমানে রেখে বিআরটিসির ৫০টি বাস রিজার্ভ রাখা হয়েছে। যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ থাকলে এই বাসগুলো নামানো হবে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নিলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যেসব পরিবহন অতিরিক্ত ভাড়া নেবে তাদের কাউন্টার বন্ধ করে দেয়া হবে। ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিতকরণে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি করেছে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি (এনসিপিএসআরআর)। বাসযাত্রীরা সহজে ঢাকা ছাড়তে পারলেও দূরপাল্লার মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ও ফেরিঘাটে যানজটে পড়ছেন।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ