পরাধীন দেশে স্বাধীন সত্তা

দেশে তখন রানীর শাসন চলছে। বিচার পেতে তাই রানী ভিক্টোরিয়ার দ্বারস্থ হলেন তিনি। সটান চিঠি লিখে জানালেন নিজের অসম্মতির কথা। বিয়ের অসম্মতি। পরিণত বয়সে এসে বাল্য বিবাহকে অস্বীকার করার সাহস ১২৯ বছর আগেই দেখিয়েছিলেন এই সাহসিনী। প্রায় ১৪২ বছর আগে বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানের বোঝার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা এই ছক ভাঙা নারী আজ আধুনিক প্রজন্মের কাছে বিস্মৃতির পথে।
১৮৬৪ সালে ২২ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের মহারাষ্ট্রে জন্মেছিলেন রুখমাবাঈ। পিতা আত্মারাম পান্ডুরঙ্গ তর্খড় ছিলেন সমাজ সংস্কারক প্রার্থনা সমাজের প্রতিষ্ঠাতা। জনার্দন পান্ডুরঙ্গ ছিলেন সূত্রধর সহজ করে বললে ছুতোর। ব্রিটিশ ভারতের মহারাষ্ট্রে ছিল স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে সংসার। সামাজিক ব্যবধান থাকলেও প্রার্থনা সমাজের আলোকিত স্পর্শ পেয়েছিল তার পরিবারও।
উজ্জ্বল আলোকের মধ্যেই আচমকা কালো ছায়া। মারা গেলেন জনার্দন। তরুণী স্ত্রী এবং আট বছরের মেয়েকে অসহায় করে। ঘোর এই দুঃসময়ে শক্ত হাতে হাল ধরলেন জনার্দনের স্ত্রী জয়ন্তীবাঈ। প্রথমেই সব সম্পত্তি একমাত্র মেয়ে রুখমার নামে করলেন। তিন বছর পরে রুখমার বিয়ে দিয়ে দিলেন। জš§ানো রুখমার বিয়ে হয়ে গেল ১৮৭৫ সালে। পাত্র উনিশ বছর বয়সী দাদাজি ভিকাজি। মেয়ের বিয়ে দিয়ে নিজেও দ্বিতীয় বিয়ে করলেন জয়ন্তী। বিপতীক ডক্টর সখারাম অর্জুনকে। সখারাম নিজেও ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। আত্মারাম পান্ডুরঙ্গের সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বম্বে ন্যাচরাল হিস্ট্রি সোসাইটি।
কিন্তু মা এবং সৎ বাবার সংসারে রয়ে গেলেন রুখমাও। স্বামীর ঘর করবেন কী! রুখমার স্বামী দাদাজি মাতৃহীন। মানুষ মামাবাড়িতে। সেখানে পরিবেশের দোষে তিনি নিজেও উচ্ছৃঙ্খল। তার মামা থাকেন রক্ষিতা নিয়ে। রাগে-দুঃখে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন মামি। এই পরিবেশে কিছুতেই গেলেন না রুখমা। মাত্র ১১ বছর বয়সেই প্রখর তার বাস্তববুদ্ধি। পূর্ণ সমর্থন পেলেন সৎ বাবা সখারামের। স্ত্রী জয়ন্তী কিন্তু কিন্তু করলেও সখারাম এককথায় নাকচ করে দিলেন। বলে দিলেন রুখমা থাকবেন তাদের সঙ্গেই। শুধু থাকাই নয়। তাকে পড়াশোনা করতে হবে। স্থানীয় গির্জার ফ্রি লাইব্রেরি থেকে বই আনানোর ব্যবস্থা করলেন। বাড়িতেই চলল রুখমার লেখাপড়া। এরপর বছর নয়েক কিছুটা স্বস্তি। তারপর শুরু নতুন বিড়ম্বনা। রীতিমতো উকিলের চিঠি পাঠালেন দাদাজি। তার স্ত্রীকে পাঠাতে হবে তার কাছে। সখারাম প্রথমে ভাবলেন আদালতের বাইরেই মিটে যাবে। কিন্তু হলো না। যেতেই হলো আইনের পথে। কুড়ি বছরের রুখমার চোখ থেকে তখন বিয়ে-সংসারের স্বপ্ন মুছে গেছে। তিনি বিভোর নিজের বইয়ের জগতে। স্পষ্ট বলে দিলেন- স্বামীর কাছে যাবেন না। সব থেকে বড় কথা বালিকা বয়সে বিয়ে হওয়া ওই ব্যক্তিকে তিনি স্বামী বলে মানতেই নারাজ।
এরপর যে দীর্ঘ আইনি লড়াই শুরু হলো তা ভারতীয় আইন ব্যবস্থার ইতিহাসে বিখ্যাত। দাদাজির পক্ষে উকিল ছিল চক অ্যান্ড ওয়াকার। সখারাম নিয়োগ করলেন পেন এবং গিলবার্টকে। দুঁদে ব্রিটিশ আইনজীবীদের মধ্যে জমে উঠল লড়াই। দাদাজির আইনজীবীরা আদালতে সওয়াল করলেন- জনার্দনের সম্পত্তি ভোগ করতেই স্ত্রীর আগের পক্ষের মেয়েকে কাছছাড়া করতে চাইছেন না সখারাম।
দীর্ঘ সওয়াল-জবাব-শুনানির পরে রায় দিলেন বিচারক রবার্ট হিল পিনহে। বললেন রুখমাবাঈয়ের বিয়ে হয়েছিল শৈশবে তার অমতে। এখন তিনি সাবালক। স্বামীর ঘর করতে চাইতে নাও পারেন। তাই তার অসম্মতিতে তাকে স্বামীগৃহে পাঠানো বেআইনি। এই রায়দানের পরে অবসর নেন পিনহে। তৎকালীন ভারতীয় সমাজে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল এই রায়। সংবাদমাধ্যম দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। সমাজের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব এবং জনমতের বেশিরভাগই গিয়েছিল দাদাজির পক্ষে। তাদের মত ছিল ব্রিটিশ আইনব্যবস্থা ভারতীয় বিবাহরীতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। ভারতীয় বিয়েতে পাত্রপাত্রীর সম্মতিকে এত গুরুত্ব দিলে হবে না। এই সময়ে টাইমস অব ইন্ডিয়ায় শুরু হলো নতুন কলাম। ‘এ হিন্দু লেডি’ ছদ্মনামে। সেই লেখায় বলিষ্ঠভাবে যুক্তি দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হয় কেন এবং কীভাবে একজন হিন্দু নারী হিসেবেই রুখমাবাঈয়ের অধিকার আছে স্বামীগৃহে না যাওয়ার। পরে জানা যায়, লেখক ছিলেন স্বয়ং রুখমাবাঈ।
১৮৮৭ সালে আবার শুরু হলো এই মামলার শুনানি। এবার রায় গেল রুখমাবাঈয়ের বিরুদ্ধে। বিচারক ফ্যারান নির্দেশ দিলেনÑ স্বামী দাদাজির কাছে যেতে হবে স্ত্রী রুখমাবাঈকে। নতুবা ৬ মাস সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। উত্তরে রুখমা জানালেন তিনি স্বামীগৃহের বদলে কারাগারে যেতে চান! তার এই পদক্ষেপে স্তম্ভিত হয়ে যায় গোটা সমাজ।
রুখমা এবার সরাসরি চিঠি লিখলেন রানী ভিক্টোরিয়াকে। তার বিয়ে বাতিল করতে হবে। হাজারো কোর্ট-কাছারি করে রানী মুক্তি দিলেন রুখমাকে। বিবাহ নামক সম্পর্কের বোঝা থেকে মুক্তি পেলেন রুখমাবাঈ। ১৮৮৮ সালে হলফনামা গেল দাদাজির কাছে। রুখমাবাঈয়ের ওপর তার আর কোনো অধিকার রইল না।
সব পিছুটানমুক্ত হয়ে রুখমাবাঈ চলে গেলেন ইংল্যান্ডে। ১৮৮৯ সালে ভর্তি হলেন লন্ডন স্কুল অব মেডিসিন ফর উইমেন-এ। ইংল্যান্ড থেকে প্রভূত সাহায্য পেয়েছিলেন। স্বদেশ থেকে বিশেষ সহায়তা না পেলেও পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ইন্দোরের মহারাজা শিবাজিরাও হোলকর। এই সাহসিনীকে সাহায্য করেছিলেন নগদ ৫০০ টাকা দিয়ে। তখনকার দিনে এর মূল্য নেহাত কম নয়। ১৯১৮ সালে দেশে ফিরে যোগ দিয়েছিলেন রাজকোট স্টেট হাসপাতালে। প্রায় ৫০ বছর গুজরাট এবং সুরাতে ডাক্তারি প্র্যাকটিস করেছেন তিনি। প্রয়াত হন ১৯৫৫ সালে ৯০ বছর বয়সে। – নারী ডেস্ক