পবিত্র ঈদুল আজহা ও কোরবানির বহুমাত্রিক তাৎপর্য

পবিত্র ঈদুল আজহা ও কোরবানির বহুমাত্রিক তাৎপর্যআগামীকাল বাংলাদেশসহ আশপাশের দেশগুলো পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হবে। সর্বোচ্চ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, যথাযোগ্য মর্যাদা, বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ত্যাগের মহিমায় মুসলমানরা ঈদ পালন করবেন। ঈদের দিন সকালে মুসলমানরা বিনম্র হৃদয়ে ঈদুল আজহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করবেন। নামাজ শেষে মহান রব আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি দেবেন। আল্লাহর জন্য নিজের জান-মাল ও প্রিয়তম জিনিস সন্তুষ্টচিত্তে বিলিয়ে দেয়ার এক সুমহান শিক্ষা নিয়ে প্রতি বছর ঈদুল আজহা ফিরে আসে আমাদের মাঝে। মুসলমানদের জীবনে ঈদুল আজহার গুরুত্ব ও আনন্দ অপরিসীম।

উৎসব হিসেবে পবিত্র ধর্মীয় অনুভূতি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইসলামের দৃষ্টিতে জীবন আর ধর্ম একই সূত্রে গাঁথা। তাই ঈদ শুধু আনন্দের উৎস নয় বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্তব্যবোধ, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের বৈশিষ্ট্য। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্প্রীতির ভাবটাই এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এলাকার লোকেরা ঈদের নামাজের জন্য নির্দিষ্ট ঈদগাহে সমবেত হয়। এতে সবার মধ্যে একাত্মতা ও সম্প্রীতি ফুটে ওঠে এবং ইসলামের মহান ভ্রাতৃত্ববোধে সবাই উদ্দীপ্ত হয়। পরস্পর কোলাকুলির মাধ্যমে সব বিভেদ ভুলে গিয়ে পরস্পর ভাই বলে গৃহীত হয়। ধনী-গরিবের ব্যবধান তখন আর প্রাধান্য পায় না। ঈদের আনন্দ সবাই ভাগ করে নেয়। এর ফলে ধনী-গরিব, শত্রু-মিত্র, আত্মীয়-স্বজন সবাই পরস্পর ভ্রাতৃত্বের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকে। ঈদ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভোলার জন্য, মানুষের মধ্যে প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি হওয়ার জন্য পরম মিলনের বাণী নিয়ে আসে। ঈদুল আজহায় যে কোরবানি দেয়া হয়, তার মাধ্যমে মানুষের মনের পরীক্ষা হয়, কারণ কোরবানির রক্ত-গোশত কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না; শুধু দেখা হয় মানুষের হৃদয়। এই ঈদে আছে সাম্যের বাণী, সহানুভূতিশীল হৃদয়ের পরিচয়। তাই পরোপকার ও ত্যাগের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় মানুষের মন। এটাই ঈদের শিক্ষা ও সার্থকতা।

আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নাদিষ্ট হয়েছিলেন প্রিয়তম বস্তু তথা তার পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করার জন্য। সেই অনুযায়ী তিনি পরম করুণাময় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রিয়পুত্রকে কোরবানি দিতে উদ্যত হন। কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তাকে আর শেষ পর্যন্ত পুত্রকে কোরবানি দিতে হয়নি। ইসমাইলের পরিবর্তে কোরবানি হয় একটি পশু। মহান আল্লাহর এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন হজরত ইব্রাহিম (আ.)। এই সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমাকে তুলে ধরাই ঈদুল আজহার পশু কোরবানির প্রধান মর্মবাণী। সুস্থ মস্তিষ্ক, প্রাপ্তবয়স্ক, মুকিম (মুসাফির নয় এমন ব্যক্তি) ব্যক্তিÑ যে ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নেসাব (সাড়ে সাত তোলা সোনা অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা সেই পরিমাণ নগদ অর্থ) পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য জাকাতের নেসাবের মতো সম্পদের এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয় বরং যে অবস্থায় সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হয়, ওই অবস্থায় কোরবানিও ওয়াজিব হবে। প্রত্যেক আর্থিক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি দিল না, সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে।’-মুসনাদে আহমদ

কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং ইসলামী নিদর্শন ও অন্যতম ঐতিহ্য। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ এই তিনদিনে আল্লাহর নামে নির্দিষ্ট নিয়মে হালাল পশু জবেহ করা হলো কোরবানি। ত্যাগ, তিতিক্ষা ও প্রিয় বস্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করা কোরবানির তাৎপর্য। গরু, মহিষ, উট, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা এ শ্রেণির প্রাণী দ্বারা কোরবানি করা যায়। কোরবানিকৃত পশুর ৩ ভাগের ১ ভাগ গরিব-মিসকিন, একভাগ আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হয়। আবার পুরোটাই বিলিয়ে দেয়া যায়। আমাদের সমাজে উট, গরু, মহিষ এ ধরনের পশু ৭ ভাগে কোরবানি করা হয়। ভাগে কোরবানি করার ক্ষেত্রে সমমনা ও সমআর্থিক সঙ্গতিসম্পন্ন লোকদের অংশীদার করে কোরবানি করা উচিত। কারণ অংশীদারদের কোনো একজনের নিয়তে ত্রুটি থাকলে, বা সম্পদে অবৈধ কিছু থাকলে সবার কোরবানি নষ্ট হয়ে যাবে। ঈদের কয়েকদিনের আরেকটি আমল হলো, ৯ জিলহজ ফজর নামাজের পর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা। এটা ওয়াজিব। তাকবির হলো, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’

আমাদের মনে রাখতে হবে, কোরবানির পূর্ণ ফজিলত হাসিল করতে হলে মনের মাঝে সৃষ্টি করতে হবে- সেই আবেগ, অনুভূতি, প্রেম-ভালোবাসা ও ঐকান্তিকতা, যা নিয়ে কোরবানি করেছিলেন আল্লাহর খলিল হজরত ইব্রাহিম (আ.)। কেবল গোশত বিলানো ও রক্ত প্রবাহিত করার নাম কোরবানি নয়; বরং আল্লাহর রাস্তায় নিজের সম্পদের একটি অংশ বিলিয়ে দেয়ার এক দৃপ্ত শপথের নাম কোরবানি। গোশত খাওয়ার নিয়তে কোরবানি করলে তা আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। কেননা আল্লাহ তায়ালার কাছে গোশত ও রক্তের কোনো মূল্য নেই। মূল্য আছে কেবল তাকওয়া, পরহেজগারি ও ইখলাসের। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর কাছে কখনো জবেহকৃত পশুর গোশত ও রক্ত পৌঁছবে না, পৌঁছবে কেবল তাকওয়া।’ -সূরা হজ : ৩

অতএব, আমাদের একান্ত কর্তব্য হলো- খাঁটি নিয়ত সহকারে কোরবানি করা এবং তা থেকে শিক্ষা অর্জন করা। নিজেদের আনন্দে অন্যদের শরিক। পূর্বেই বলা হয়েছে, কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ সমাজের অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রের মাঝে বিলিয়ে দেয়া। এছাড়া কোরবানিকৃত পশুর চামড়া অনাথ আশ্রম, এতিমখানা ও মাদরাসায় পড়–য়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণের জন্য প্রদান করলে দ্বিগুণ সওয়াব হাসিল হয়। এক দুঃখী মানুষের সাহায্য দ্বিতীয় দ্বীনি শিক্ষার বিকাশ। প্রকৃতপক্ষে কোরবানি দাতা কেবল পশুর গলায় ছুরি চালায় না; বরং সে তো ছুরি চালায় সব প্রবৃত্তির গলায় আল্লাহর প্রেমে পাগলপারা হয়ে। এটাই কোরবানির মূল নিয়ামক ও প্রাণশক্তি। এ অনুভূতি ব্যতিরেকে যে কোরবানি করা হয়, তা হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাঈলের (আ.) সুন্নত নয়, এটা এক প্রথামাত্র। এতে সমাজের লোকের ঘরে ঘরে গোশতের ছড়াছড়ি হয় বটে; কিন্তু তাকওয়া হাসিল হয় না, যা কোরবানির প্রাণশক্তি। হজরত ইব্রাহিমের (আ.) অনুপম ত্যাগের অনুসরণে হাজার হাজার বছর ধরে মুসলমানরা কোরবানি করে আসছে। কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, কোরবানির পূর্বশর্ত আল্লাহভীতি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাক্সক্ষা। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘মানুষের আমলের প্রতিফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’

আরবিতে কোরবান শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ দাঁড়ায় পরম নৈকট্য। অর্থাৎ আল্লাহর একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া, নিকটতম স্থান লাভ করা। পশু জবাই এবং আনুষঙ্গিক ত্যাগের মাধ্যমে এই চরম নৈকট্য অর্জিত হয় বলেই এর নাম কোরবানি। এখানে কোরবানি দ্বারা এর প্রচলিত সাধারণ অর্থ গ্রহণ করলে ভুল হবে। সাধারণত এটাই ধারণা করা হয় যে, সুন্দর একটি পশু ক্রয় করে জিলহজ মাসের ১০ তারিখে জবাই করলেই কোরবানি আদায় হয়ে গেল এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়ে গেল। কোরবানির আসলরূপ আমাদের জানতে হবে এবং বুঝতে হবে।

দেখুন, হজরত ইব্রাহিমকে (আ.) আল্লাহ তায়ালা স্বপ্নযোগে ওহি প্রেরণ করেন তিনি যেন তার প্রিয় সন্তান হজরত ইসমাঈলকে (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে জবেহ করেন। পবিত্র কোরানে জবেহ শব্দটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে তিনি তার প্রিয় সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় ঠিক সেভাবে উৎসর্গ করেন, জবাই করেন যেভাবে তিনি স্বপ্নযোগে আদিষ্ট হন। পবিত্র কোরানে হজরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক প্রাণাধিক প্রিয়পুত্র হজরত ইসমাঈলকে (আ.) জবাইয়ের ঘটনাটি ‘কাদ সাদ্দাকতার রুইয়া’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জবাইয়ের ঘটনাটি ছিল বাস্তব। অর্থাৎ ইব্রাহিম (আ.) সত্যি সত্যিই তার প্রিয়পুত্রের গলায় ছুরি চালিয়েছিলেন, জবাই করেছিলেন। তবে গলা কাটেনি, শিশুপুত্র ইসমাঈলের কোনো ক্ষতি হয়নি। এর কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা হজরত ইব্রাহিমকে (আ.) যেমন তার সন্তান জবাই করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তেমনি গলায় চালানো ছুরিকেও নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন সে তার কাটার কাজ না করে। এখানে ইব্রাহিম (আ.) এবং ছুরি উভয়ে আল্লাহর নির্দেশ পালন করেছেন। তারপর ফেরেশতা কর্তৃক পশু হাজির করা এবং পশু জবাইয়ের বিবরণও পবিত্র কোরানে এসেছে। প্রাণাধিক প্রিয়পুত্রের পরিবর্তে পশু জবাইয়ের এই সুযোগকে বৃদ্ধ বয়সে হজরত ইব্রাহিমের (আ.) প্রতি আল্লাহ তায়ালার বিরাট প্রতিদান বলা হয়েছে। কোরানে কারিমে আল্লাহ তায়ালা পুরো ঘটনাটিকে সুস্পষ্ট এক বিশাল পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর এই বিশাল পরীক্ষায় ত্যাগের সর্বোত্তম নজির স্থাপন করে কোরানের ভাষায় ‘মুহসিনিন’র অন্তর্ভুক্ত হলেন হজরত ইব্রাহিম (আ.), হজরত ইসমাঈল (আ.) এবং হজরত হাজেরা (আ.)। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ত্যাগের এই মহান দৃষ্টান্ত হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তার পরিবারের আগে মানব ইতিহাসে আর একটিও খুঁজে পাওয়া যায় না।

আল্লাহর রাস্তায় নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ করার নাম কোরবানি। এখানে আরো একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, কোরবানি কোনো ব্যক্তিগত ত্যাগের নাম নয়। এটা সামষ্টিক ত্যাগের প্রতিফলন। যেমন হজরত ইব্রাহিম (আ.) একা এই কাজে অগ্রসর হননি। তার সঙ্গে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন পুত্র হজরত ইসমাঈল (আ.) এবং হজরত হাজেরা (আ.)। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোনো মুসলমান শুধু একা আল্লাহর রাস্তায় ত্যাগের জন্য প্রস্তুতি নিলে হবে না, তার পুরো পরিবারকেও ত্যাগের এ পথে নিয়ে আসতে হবে। এটাই সুন্নতে ইব্রাহিম তথা- কোরবানির মর্মকথা।

কিন্তু আফসোস! মুসলিম সমাজে কোরবানি আজ নিছক আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছে। আমরা ভুলে গেছি কোরবানির আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। লৌকিকতা আর আনুষ্ঠানিকতায় হারিয়ে গেছে কোরবানির আসল মাকসুদ। কোরবানি আজ হয়ে গেছে কিছু মানুষের গরু প্রদর্শনী, নির্বাচনী প্রচারাভিযান আর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির হাতিয়ার। এক কথায় কোরবানি এখন আর ত্যাগের শিক্ষায় মানুষকে উদ্ভাসিত করছে না বরং অহমিকা প্রদর্শনীর মাধ্যম বা হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিয়ের প্রথম বছর মেয়ের বাপের বাড়ি থেকে কোরবানি উপলক্ষে বিরাট গরু পাঠাতে না পারায় অনেকের ঘর-সংসার ভেঙে যাওয়ার উপক্রমের খবরও পাওয়া যায়। অন্যদিকে ঢোল-বাদ্য সহকারে লাখ টাকায় কেনা উট-গরুর প্রদর্শনীর মিছিলের কাছে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছে- তালবিয়া ও তাকবিরের ধ্বনি। আমরা ভুলেই গেছি যে, আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর গোশত, রক্ত কিছুই পৌঁছে না, আল্লাহর কাছে পৌঁছে শুধু তাকওয়া। সেই তাকওয়ারার চিত্র কী এই? কী হবে জবাব? মনের মাঝে এসব বিষয়ের অনুসন্ধিৎসা জাগ্রত না হলে, প্রশ্ন উত্থাপিত না হলে- কী লাভ কোরবানি করে?

আরেক শ্রেণীর মানুষের কাছে কোরবানি নিছক ব্যবসা ছাড়া আর কিছুই নয়। কোরবানি উপলক্ষে মৌসুমি পশু-ব্যবসা খারাপ কিছু নয়, বরং নিয়ত ঠিক থাকলে তা এক বিরাট ইবাদত। কিন্তু কোরবানি উপলক্ষে পশুর চামড়া নিয়ে যা হয় তার সঙ্গে সুন্নতে ইব্রাহিমের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। কোরবানির সময় প্রতি বছর আমাদের দেশে একশ্রেণীর চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে ফেলে। এছাড়া আর একশ্রেণীর মস্তানের উপদ্রব ঘটে যাদের সামনে কথা বলার সাহসও রাখেন না কোরবানিদাতারা। এরা নিজেরাই চামড়ার দাম ঠিক করে দেয় এবং কোরবানিদাতারা তাদের নির্ধারিত মূল্যে তাদের হাতেই চামড়া তুলে দিতে বাধ্য হন। কোরবানির চামড়ার হকদার এতিম, মিসকিন গরিব মানুষগুলো। যারা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম ফেলে দেয়, কিংবা যারা চামড়া নিয়ে মস্তানি করে তারা গরিবের হক তসরুফ করছে, এতিমের মুখের গ্রাস কেড়ে নিচ্ছে। এটা জঘন্য অপরাধ। দুনিয়ার জিন্দেগিতে তাদের বিচার হয়তো হবে না। কিন্তু কিয়ামতের মাঠে তারা ছাড়া পাবে না। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা এতিম আর গরিবের পক্ষে তাদের হক আদায় করে ছাড়বেন।

যারা কোরবানির চামড়া নিয়ে মস্তানি করে, যেসব ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পশুর মূল্য বাড়ায়, চামড়ার মূল্য ফেলে দেয় কিংবা যারা কোরবানিকে লোক দেখানো খেল তামাশায় পরিণত করে তাদের ভেবে দেখা উচিত কিয়ামতের মাঠে প্রত্যেককে নিজ নিজ কাজের জন্য অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। ত্যাগের বার্তা নিয়ে প্রতি বছর আমাদের কাছে কোরবানি হাজির হয়। শুধু আল্লাহকে খুশি করার জন্য, আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য যারা কোরবানি করেন, মাটিতে শোয়ানো পশুর গলায় ছুরি চালানোর পর গলা বেয়ে মাটিতে রক্ত পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। মনে রাখা দরকার পশু জবাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতরে অবস্থিত পাশবিকতারও জবাই হয়ে যেতে হবে। তা না হলে গোশত খাওয়া ছাড়া কোরবানি দ্বারা আর কিছু অর্জিত হবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।

বস্তুত কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহা আমাদের কাছে আত্মশুদ্ধি, আত্মতৃপ্তি ও আত্মত্যাগের এক সুমহান বার্তা নিয়ে প্রতিবছর উপস্থিত হয়। ঈদুল আজহার শিক্ষায় উজ্জীবিত হলে আমরা সব পাপ, বঞ্চনা, সামাজিক অনাচার, রিপুর তাড়না ও শয়তানের প্রবঞ্চনা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হব। তাই ঈদুল আজহার পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মানুষের মধ্যে বিরাজমান পশুশক্তি, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রিপুকেই কোরবানি দিতে হয়। আর হালাল অর্থে অর্জিত পশু কোরবানির মাধ্যমে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়। আমরা চাই ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সব অনিশ্চয়তা-শংকা দূর হোক। সেই সঙ্গে আমাদের পরস্পরে হিংসা, হানাহানি ও বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে এক সঙ্গে এক কাতারে পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দে শামিল হয়ে সবার মধ্যে সাম্য ও সহমর্মিতার মনোভাব জাগিয়ে তুলতে হবে। নিজের ভেতরের এই ত্যাগটুকু কীভাবে অর্জন করা যায় সে চেষ্টার পরীক্ষায় আগামীকাল আমরা কতটুকু সফল হই এখন সেটাই দেখার বিষয়।
– লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এসএস