পদ্মা সেতু মামলার রায়

2বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়নি এটা প্রমাণ হওয়াতে বেশি খুশি হওয়ার কারণ নেই। যে দেশে সাধারণ সেতু-কালভার্ট নির্মাণে দুর্নীতি হয় সেখানে পদ্মা সেতুতে হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না। হতেও পারত। সে কারণে প্রধানমন্ত্রীকে, দুদুককে অনুরোধ করব দুর্নীতি রোধে আরো বেশি সোচ্চার হওয়ার জন্য। প্রধানমন্ত্রী দিন- রাত যে পরিশ্রম করছেন- সবই বিফলে যাবে যদি আমরা দুর্র্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি
কানাডীয় আদালত রায় দিয়েছে পদ্মা সেতুতে কোনো দুর্নীতি হয়নি। কানাডীয় কোম্পানি এসএনসি লাভালিনকে কাজ পাইয়ে দিতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে এমন এক কাল্পনিক অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক ঋণ দান স্থগিত রেখে থমকে দাঁড়িয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখনো বলেছিলেন বিশ্বব্যাংক এখনো কোনো টাকাই দেয়নি দুর্নীতি হলো কেমন করে। তবু তিনি মন্ত্রী আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়েছিলেন। একজন সচিব ও একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্তও করেছিলেন এবং তাদের কারাগারেও থাকতে হয়েছিল। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দু-দু’বার বিষয়টি তদন্ত করেছে। কিন্তু কোনো কিছুই তারা উদ্ঘাটন করতে পারেনি।
কানাডার লাভালিনের তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধেই মূলত মামলাটা হয়েছিল। কানাডায় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিদেশে কাজ পাওয়ার জন্য ঘুষ প্রদান করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। সে কারণেই এ মামলার সূত্রপাত। সব নথিপত্র পর্যালোচনা করে কানাডীয় আদালত লাভালিনের তিন কর্মচারীকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, লাভালিন কাজ পাওয়ার জন্য কাউকেও কোনো ঘুষ প্রদান করেননি বা ঘুষ প্রদানের জন্য কোনো ষড়যন্ত্রও করেননি।
বিশ্বব্যাংকের ঋণ দেয়ার কথা ছিল ১২০ কোটি ডলার। জাইকা ও এডিবিরও টাকা দেয়ার কথা ছিল। প্রধানমন্ত্রী বুঝেছিলেন যে, এ এক গভীর ষড়যন্ত্র। তিনি কালবিলম্ব না করে বিশ্বব্যাংকের ঋণ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন। এখন বাধাহীনভাবে পদ্মা সেতুর কাজ চলছে এবং ৪০ শতাংশ কাজ হয়েও গেছে। আগামী দু’বছরের মাঝে সেতুর কাজ হয়তো সম্পূর্ণ করা সম্ভব হবে। বিশ্বব্যাংকের টাকা না নেয়ায় বাংলাদেশের দুটো লাভ হয়েছে। প্রথম লাভটা হলো বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সাহসী পদক্ষেপের জন্য ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছেন এবং ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঋণ নিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, যে সব দেশ বিশ্বব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েছে তাদের সবাইকে নানা অভিযোগ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়েছে।
দ্বিতীয় লাভটা হলো বাংলাদেশ বাধাহীনভাবে সেতুর কাজ চালাতে পারছে, যাতে যথাসময়ে সেতুর কাজ সমাপ্ত হবে। তৃতীয় লাভটা হলো সাহসে ভর করে পদক্ষেপ নেয়ায় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাহসের ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হয়েছে। এখন কথায় কথায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নে করব এরূপ কথাবার্তা বলতে দ্বিধা করছেন না। পদ্মা সেতুর কাজ সমাপ্ত হলে প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই আরো সাহসী হবেন। দীর্ঘদিনের হীনম্মন্যতা থেকে দেশও মুক্ত হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর খোলা হাতের সুনাম যেমন আছে আবার অসময়ের জন্য লক্ষ্মী গৃহিণীর মতো সঞ্চয় করে রাখারও অভ্যাস আছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ হলো তিন হাজার দুইশ’ বিলিয়ন ডলার।
গত শতাব্দীর ছয়ের দশকের দিকে বিশ্বব্যাংক মিসরকেও এমতো এক অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল। কথা ছিল বিশ্বব্যাংক নীল নদে আসাওয়ান বাঁধ নির্মাণের জন্য ঋণ দেবে আর ঋণ বরাদ্দ দেয়ার পর এরূপ গড়িমসিতে দীর্ঘ দেড় বছর কাটাবার পর মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসেরও ঋণ প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন মিসরকে নীল নদে আসাওয়ান বাঁধ তৈরি করে দিয়েছিল। মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংকের ৬০-৬৫ বছর বয়সের মাঝে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছেন।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করে থাকেন ড. ইউনূস সাহেব আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে দিয়ে নাকি বিশ্বব্যাংককে বলে-কয়ে ঋণটা স্থগিত করেছিলেন। বিশ্বব্যাংকের ওপর আমেরিকার আধিপত্য বেশি। কারণ বিশ্বব্যাংকে আমেরিকার ডিরেক্টর বেশি। ইউনূস সাহেব এ কাজটা করেছেন বলে অনেকে বিশ্বাসও করেন। কারণ ইউনূস সাহেব যখন গ্রামীণ ব্যাংক করে অর্থের অভাবে পড়েছিলেন তখন শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সম্ভবত ৪০০ কোটি টাকা দিয়েছিলেন। শেরেবাংলা নাকি বলতেন, সে লোক আমার অমঙ্গল কামনা করবে কেন আমি তো কখনো তার উপকার করিনি।
প্রধানমন্ত্রী এবং ড. ইউনূসের ঘটনাটাও মনে হয় অনুরূপ কিছু। যাক, অসাধারণের জন্য কোনো রাজপথ নেই সব পথই তার জন্য রাজপথ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অসাধারণ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি সুতরাং ড. ইউনূসের বাধা তার জন্য কোনো সংকটই সৃষ্টি করতে পারেনি। তিনি সব সময় রাজপথ সৃষ্টি করে চলেন। তার সফলতা দেখে কারো কারো হজব্রতে যাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছে।
পদ্মা সেতুর ঋণ স্থগিত হয়ে যাওয়ার পর আমাদের দেশের কিছু বুদ্ধিজীবী বহু ভাবসাবের ঠাট ধারণ করে বহু বৈদ্যালি ফলাতে দেখেছি। তারা এখন কি বলবেন? আমাদের দেশে কিছু লোক আছেন সরকারের বিরুদ্ধে দরখাস্ত দিতে সব সময় কাগজ কলম নিয়ে বসে থাকেন। তেল, গ্যাস ও বন্দর রক্ষা কমিটি এমন সব দরখাস্ত করে চলেছেন বিশ্বব্যাপী। বিদ্যুতের অভাবে শিল্প উন্নয়নে স্থবিরতা এসেছে যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী বলছেন বনের কোনো ক্ষতি হবে না। আপনারা বলছেন বাঘ, কুমির মরে যাবে, বন ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর কথা অসত্য হলে তার কবর রচনা করবে মানুষ আপনাদের কথা অসত্য হলে তো আপনাদের কোনো ব্যক্তিগত ক্ষতি হবে না। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর বিপক্ষে যে জন্য আপনাদের হরতাল সফল হয়নি। আপনারা দয়া করে আন্দোলন স্থগিত করুন। মানুষকে বাঁচতে দিন।
পরিশেষে একটি কথা বলতেই হবে। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়নি এটা প্রমাণ হওয়াতে বেশি খুশি হওয়ার কারণ নেই। যে দেশে সাধারণ সেতু-কালভার্ট নির্মাণে দুর্নীতি হয় সেখানে পদ্মা সেতুতে হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না। হতেও পারত। সে কারণে প্রধানমন্ত্রীকে, দুদুককে অনুরোধ করব দুর্নীতি রোধে আরো বেশি সোচ্চার হওয়ার জন্য। প্রধানমন্ত্রী দিন- রাত যে পরিশ্রম করছেন- সবই বিফলে যাবে যদি আমরা দুর্র্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এসএস