পদ্মার চরে অর্ধদিবস

পদ্মার চরে অর্ধদিবস

জার্মানির ভ্যার্ল সিটির গ্রিন পার্টির সভাপতি এবং এমপি প্রার্থী আমাকে ফোনে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পরিবেশ দূষণ, সুন্দরবন রক্ষা এবং সামাজিক বনায়ন ও বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছুক। আমি যেন তার সঙ্গে থাকি, সেই ইচ্ছা ব্যক্তও করেছেন অলাপকালীন। উল্লেখ্য, তিনি মাদারীপুরের কৃতী সন্তান শাহাবুদ্দিন মিয়া। সংগঠনের নাম ‘গ্রীন মুভমেন্ট’। আমি এবং সাপ্তাহিক অগ্নিবীণা পত্রিকার সম্পাদক বাপ্পি সরদার সংগঠনটির সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। আশা করি আপনারাও থাকবেন আমাদের সঙ্গে। প্রকৃতি নিয়ে কাজ করলে বেশ মজা পাবেন। অনেকটা ‘রথ দেখা কলা বিক্রি’র মতো আর কি। যেমনি ঘটছে আমার ক্ষেত্রেও। সুযোগ পেলেই আমি ছুটে যাই প্রকৃতির সন্ধানে। যেমনি ক’দিন আগে গিয়েছি পদ্মার চরে। সেই বৃত্তান্তই জানাচ্ছি এখন। পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক কমলাঘাট থেকে জলে ভেসে পদ্মার চরের উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম আমরা। কমলাঘাট থেকে সড়ক পথে পদ্মারচরের দূরত্ব ২০-২২ কিলোমিটার হলেও নদী পথে সময় লাগে ঘণ্টা চারেক। তার ওপর পাড়ি দিতে হয় সে াতের বিপরীতে। ফলে কালক্ষেপণে যে কেউ বিরক্ত হতে পারেন বোধ করি। তবে আমরা বিরক্ত হইনি বরং পুলকিত হয়েছি। শাখা নদী অতিক্রম করে নৌকা পদ্মায় পতিত হতেই একটু শিহরণবোধ করলাম। সেকি ঢেউ! নৌকা হেলেদুলে এগোচ্ছে, আমরা গুটিসুটি মেরে নৌকার গলুইয়ে বসে রইলাম। আর দু’পাশে তাকিয়ে তাকিয়ে পদ্মার ভয়ঙ্কররূপে মুগ্ধ হলাম। কত কি বলাবলিও করলাম নিজেরা নিজেরাই।

উত্তাল তরঙ্গ পাড়ি দিতে দিতে একসময় চরের কাছাকাছি এসে যাত্রা বিরতি দিলাম। চরের সঙ্গে নৌকা ভিড়তেই রোমাঞ্চিত হলাম। প্রকৃতির সঙ্গে মেশার এই তো সুযোগ। লাফিয়ে নামলাম তাই টপাটপ। তার পর পাঁক-কাদায় মাখামাখি হয়ে হাঁটাহাঁটি করতে লাগলাম। আর চারদিকে তাকিয়ে কত কি দেখলাম। অভিভূত হলাম খানিকটা। বিশাল ভূখণ্ড পদ্মার বুকে ভাসছে! সেই ভূখণ্ডে শুধু ফসলের সমারহ। ফসলের বাইরে এখানে রয়েছে ঘাসবনও। ফসলের মধ্যে ধান, পাট, ধইঞ্চা; এসবই বেশি। ধান সংগ্রহের মৌসুম বিধায় কৃষক ধান কেটে নিচ্ছে। আর জলকাদায় মাখামাখি হয়ে গৃহস্থের ছেলেপেলেরা মাছ শিকারে ব্যতিব্যস্ত সময় পার করছে। অদূরে জেলেরা মাঝ নদীতে জাল ফেলে প্রতিক্ষায় আছেন বড়সড়ো ইলিশসহ অন্যান্য মাছ শিকারের। পদ্মায় সুস্বাদু ইলিশের প্রাপ্তিস্থান বিধায় এখানকার ইলিশের কদর দেশব্যাপী।

যাই হোক, চরের কথায় ফিরছি আবার। চরের পরিবেশটা বেশ উপভোগ করার মতো। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। চোখ জুড়িয়ে গেল সেই তুলতুলে সবুজে নজর পড়তেই। দূরে দু’একটি বসতঘরও লক্ষ্য করলাম, ছন্দপতন ঘটল তাতেই। চরের জমিনে বসতঘর, আশ্চর্য হলাম বৈকি! তবে সেখানে কারো বসতি রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হতে পারিনি। হতে পারে কৃষকদের আস্তানাও।

কাদাজলে নেমে আমরা খুব মজা করলাম। ভাটা চলছে তখন। তরতরিয়ে জল নেমে যাচ্ছে পদ্মায়, সঙ্গে ছোট মাছও। আর সামান্য বড় সাইজের মাছগুলো পাঁক-কাদায় আটকে হামাগুড়ি দিচ্ছে। গুটিকয়েক কিশোর মাছগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছে দ্রুত।

চরে অর্ধ দিবস কাটিয়ে এবার বিদায়ের প্রস্তুতি নিলাম। উপলব্ধি করলাম পদ্মার চরে মানুষের পদচারণ রয়েছে ঠিকই, তথাপিও সুনসান নীরবতা যেন গ্রাস করে রেখেছে পরিবেশটাকে। পাখ-পাখালির কিচির-মিচির পদ্মার চরকে প্রাণবন্ত করলেও অজানা আশঙ্কা তাড়াতে তা যথেষ্ট নয় বিধায় পড়িমরি করে নৌকায় চড়লাম।
লেখক: আলম শাইন, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ। [email protected]

মানবকণ্ঠ/এসএস