‘নয়া স্ট্র্যাটেজির’ খোঁজে বিএনপি

আপিল বিভাগ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত করে দেয়ার পর তার মুক্তি আন্দোলনের ‘নয়া স্ট্র্যাটেজি’ সাজাতে চায় দলটি। তাদের দলীয় প্রধানের মুক্তি আইনি ঘেরাটোপে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় আন্দোলনের নতুন কৌশল বের করার কথা ভাবছেন নেতারা। কারাগার থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য এতদিন আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠে অহিংস-শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করার কৌশল নিয়েছিল বিএনপি। ৮ ফেব্রুয়ারি দলটির চেয়ারপার্সন ৫ বছরের সাজা মাথায় নিয়ে কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই তারা মানববন্ধন, প্রতীক অবস্থান, লিফলেট বিতরণ, কালো পতাকা প্রদর্শন, স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান ইত্যাদি অহিংস কর্মসূচি চালিয়ে আসছেন। তবে গত সোমবার আপিল বিভাগ বেগম জিয়ার জামিন আগামী ৮ মে পর্যন্ত স্থগিত করে দেয়ার পর দলটির নেতাদের কপালে চিন্তার বলিরেখা দেখা দিয়েছে। এতদিন তারা যে কৌশলে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন, জামিন স্থগিত হয়ে যাওয়ায় সেই কৌশল থেকে সরতে হচ্ছে তাদের। কেননা, বিএনপি নেতারা মনে করেন, তাদের নেত্রীকে কৌশল করে সরকার আটকে রাখতে চাচ্ছে। এ ব্যাপারে স্পষ্ট করেই দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে সরকার কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। কৌশলটা হচ্ছে জামিন স্থগিত করে দিয়েছে, নাকচ করেনি। এরপর হিয়ারিং হবে লিভ টু আপিলের। অর্থাৎ এভাবে ক্রমান্বয়ে যেতে থাকবে এবং তাকে আটকে রাখা হবে। তিনি মনে করেন, এটা জামিন দিয়েও করতে পারত।’ ক্ষমতাসীন দলের এমন ‘দুরভিসন্ধি’ বুঝতে পেরেই আন্দোলনের নতুন রণনীতি নিতে চায় বিএনপি।

এজন্য গত সোমবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলটির সিনিয়র নেতাদের একটি বৈঠক হয়। সেখানেই এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে অংশ নেয়া দলের এক নেতা মানবকণ্ঠকে বলেন, দলের সিনিয়র নেতারা মনে করেন, খালেদা জিয়ার কারাবাস যে দীর্ঘ হবে, তা আপিল বিভাগ হাইকোর্টের দেয়া তার জামিন স্থগিত করে দেয়ার পর আরো স্পষ্ট হয়ে গেছে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে সরকার তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। আবার শক্ত কর্মসূচি দিয়েও সরকারের ফাঁদে পা দিতে চাচ্ছি না। তাই চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির পাশাপাশি দলীয় প্রধানের মুক্তি কীভাবে ত্বরান্বিত করা যায়, এ নিয়ে নতুন করে ‘রণনীতি’ প্রণয়ন করার কথা এসেছে বৈঠকে। এজন্য আলাপ-আলোচনা করে নতুন কৌশল ঠিক করা হবে।

বৈঠকে অংশ নেয়া কয়েক নেতা মানবকণ্ঠকে জানিয়েছেন যে, আন্দোলনের স্ট্র্যাটেজি কি হবে এর জন্য তারা বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে যৌথসভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ছাড়া শিগগিরই জোট শরিকদের নিয়ে বৈঠকে বসার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে বিএনপির তরফে ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের সার্বিক পরিস্থিতি জানানো হবে বলেও বৈঠকে নীতিগতভাবে সবাই একমত হয়েছেন। জোট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক ও দলের নেতাদের সঙ্গে যৌথসভা শেষে খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন ‘নতুন আকার’ ধারণ করতে পারে বলে জানিয়েছেন বৈঠকে অংশ নেয়া এক নেতা। গুলশান কার্যালয়ের এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও বরকত উল্লাহ বুলু উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে একাদশ নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ (সবার জন্য সমান সুযোগ) থাকবে কিনা সেই চিন্তায়ও পেয়ে বসেছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করা দল বিএনপিকে। বিশেষ করে জানুয়ারি থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতানেত্রীরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে দেশে-বিদেশে নৌকায় ভোট চাওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে দেয়ায় এ চিন্তা শুরু হয়েছে দলটির। এর চেয়েও তাদের বড় চিন্তা হচ্ছে এই যে, এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) চিঠি দিয়ে নালিশ জানালেও কোনো সুরাহা পায়নি তারা। ইসি বলেছে, তারা বিএনপির এ ধরনের কোনো চিঠি পায়নি। পেলেও তফসিল ঘোষণার আগে এ ব্যাপারে করার কিছু নেই নির্বাচন পরিচালনাকারী এই সাংবিধানিক সংস্থাটির।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের সাজায় জেলে আছেন এক মাসেরও বেশি হয়ে গেল। দলটির কাছে এখন প্রধান কাজ হচ্ছে, তাদের দলীয় নেত্রীকে জেল থেকে মুক্ত করা। এজন্য তারা আইনি লড়াইকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এর পাশাপাশি তারা মানববন্ধন, প্রতীক অবস্থান, লিফলেট বিতরণ, কালো পতাকা প্রদর্শন, স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান ইত্যাদি অহিংস ধরনের কর্মসূচি নিচ্ছেন। একইসঙ্গে তারা আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতিও নিয়ে রাখছেন। খালেদা জিয়ার মামলা ও পরবর্তী সময়ে ৫ বছরের সাজা দেয়ার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক বন্ধু রাষ্ট্র ও কূটনীতিকদের সঙ্গে যেসব বৈঠক হয়েছে বিএনপির, তাতে তাদের কাছ থেকে এমন বার্তাই পেয়েছে দলটি।

তবে কয়েকদিন আগে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ও অন্যতম নীতিনির্ধারক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য ‘নির্বাচনে বিজয় এখন অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র’ বলার পরই দলটির নেতাদের কপালে চিন্তার বলিরেখা দেখা দিয়েছে। ওবায়দুল কাদেরের ওই বক্তব্য, সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নৌকায় ভোট চাওয়া, ইসিতে নালিশ করেও এর কোনো সুরাহা না পাওয়া, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে বড় ধরনের পরিবর্তনকে একই সূত্রে গাঁথা বলে মনে করছে দলটি। অর্থাৎ এসবের মাধ্যমে এটাই স্পষ্ট হচ্ছে যে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসাকে পাকাপোক্ত করছে, এমনই মনে করছেন বিএনপির নেতারা।

এ ব্যাপাারে গত পরশু শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে যেতে ষড়যন্ত্র করছে বলে যে কথা বিএনপি বলে আসছে, তার ভিত্তি হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যকে দেখালেন।

তিনি ওই আলোচনা সভায় বলেন, এতদিন আমরা যেটা সন্দেহ করে আসছিলাম, আজকে তারা নিজেরাই সেটা হয়তো অজ্ঞাতে বলে ফেলেছেন। তার মানে নীলনকশা অনুযায়ী নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা, এখন শুধু গেজেট নোটিফিকেশন হবে আর শপথ গ্রহণ হবে।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত শুক্রবার বলেছিলেন, শেখ হাসিনার উন্নয়নে, অর্জনে জনগণ খুশি। নির্বাচনে বিজয় একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আগামী নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রকার সংকোচ, কোনো প্রকার ভয় আমাদের নেই।

সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটিসহ সিনিয়র নেতাদের যে বৈঠক হয়, সেখানেও এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া কারাগারে থাকার পরও দলটির পক্ষ থেকে এর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগামী নির্বাচনের ব্যাপারে যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি মহাসচিবের এই আহ্বান ধর্তব্যের মধ্যেই নেয়নি সরকারি দল। ইতালি সফর শেষে গণভবনে এক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেই বলেন যে, নির্বাচনে কে আসল আর কে আসল না তা আমাদের দেখার বিষয় নয়। সংবিধান অনুয়ায়ী যথাসময়ে নির্বাচন হবে। এর পরই বেসামরিক ও পুলিশ প্রশাসনে পরিবর্তন ঘটেছে, যদিও সরকারি দল বলছে, এসব হচ্ছে রুটিন পরিবর্তন।

অন্যদিকে বিএনপি তাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে অহিংস কর্মসূচি নিলেও তাতেও এখন পুলিশ হামলা চালিয়ে পণ্ড করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ দলটির। তারা দাবি করছেন, প্রথম দিকে অহিংস কর্মসূচিতে সহযোগিতা করলেও এখন এসব কর্মসূচি থেকে বা ফেরার পথে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করছে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী। এর উদাহরণ দিয়ে তারা বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে প্রেসক্লাবের এক কর্মসূচি থেকে ফেরার পথে তেজগাঁও ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকির হোসেন মিলনকে ধরে নিয়ে যায় ডিবি পুলিশ। তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়। পরে কারা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করলে সেখানেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। দলটির দাবি, রিমান্ডে নির্যাতনের কারণেই মিলন মারা গেছে। জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত খালেদা জিয়ার কারামুক্তির আরেক কর্মসূচি থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবুকে গ্রেফতার করা হয়। সুপ্রিম কোর্টে খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি শেষে ফেরার পথে ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতা কাজী আবুল বাশারকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়াও রাজধানীসহ সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের বাসাবাড়িতে তল্লাশি করছে বলে অভিযোগ করছে দলটি। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কিংবা নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের অনুমতি দেয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২২ ফেব্রুয়ারি ও ১২ মার্চে না পেয়ে আবার একই দাবিতে ১৯ মার্চ সমাবেশের অনুমতি চেয়েছে। এই সমাবেশেরও অনুমতি পাওয়া যায়নি। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের লালদীঘির ময়দানে ও খুলনায় হাদিস পার্কে অনুমতি না পেয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করতে হয়েছে বিএনপিকে।

এসব দেখেশুনে বিএনপি মনে করছে, কৌশলে সভা-সমাবেশসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে না দেয়ার কাজে ব্যস্ত রেখে এবং ধরপাকড় করে নেতাকর্মীদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে দিয়ে নির্বাচনে পার পেয়ে যেতে চায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বেগম খালেদা জিয়ার জামিন দেয়া নিয়েও যে গড়িমসি চলছে, তাও একই সূত্রে গাঁথা বলে ধরে নিয়েছে বিএনপি। যদিও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, তারা বিএনপিকে নিয়েই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে চান। তারা ‘ফাঁকা মাঠে গোল দিতে চান না’।

তবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খালেদা জিয়া ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির অবস্থা এখন আর বিরাজমান নেই। বর্তমান যে সরকার রয়েছে, তার বৈধতার সংকট রয়েছে। তাই এই সরকার কোনোভাবেই একতরফাভাবে নির্বাচন করতে পারবে না।

অবশ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদাও স্বীকার করেছেন যে, বিএনপি ছাড়া নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না। বিএনপি একটি বড় দল। তাদের ছাড়া সব দলের অংশগ্রহণ হয় কি করে? ২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের মনোনয়নপত্র নেয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি এ কথা বলেছিলেন।

মানবকণ্ঠ/বিএএফ