নয়া সংসদের যাত্রা শুরু

নয়া সংসদের যাত্রা শুরু

প্রথম অধিবেশন শুরুর মাধ্যমে গতকাল বুধবার যাত্রা শুরু করেছে নবগঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ। দশম সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার নেতৃত্বেই এবার সংসদের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। একাদশ জাতীয় সংসদে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন রংপুর-৬ আসন থেকে থেকে নির্বাচিত ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। দশম জাতীয় সংসদেও তিনি এ পদে ছিলেন। নবম জাতীয় সংসদেও কিছুদিন স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন শিরীন শারমিন। গতকাল বুধবার বেলা ৩টায় নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর পরপরই স্পিকার পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দশম জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার সভাপতিত্বে অধিবেশন বসে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্পিকার পদে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেন। পরে এটি সমর্থন করেন চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন। এরপর সংসদে কণ্ঠ ভোটে তা পাস হয়। স্পিকার নির্বাচনের পর সংসদের অধিবেশন ৩০ মিনিটের জন্য মুলতবি রাখা হয়। মুলতবির এই সময়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ নবনির্বাচিত স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে শপথবাক্য পাঠ করান। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনাসহ সরকার এবং বিরোধী দলের সিনিয়র সদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। নবম সংসদের শেষ দিকে তত্কালীন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর মো. আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে শূন্য হয় স্পিকারের আসন, সেই স্থানে আসেন এমপি ড. শিরীন শারমিন। সেবার প্রথমবারের মতো আইনসভায় এসে চার বছরের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই স্পিকারের পদে বসেন তিনি। আর এই পদে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীই প্রথম নারী। নবম সংসদে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হয়ে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

স্পিকার নির্বাচন এবং শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে অধিবেশন বসলে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করে সংসদ। নবনির্বাচিত স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে দ্বিতীয় পর্বের অধিবেশন শুরু হয়। এ সময় ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচিত হন গাইবান্ধা-৫ থেকে নির্বাচিত অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া। হুইপ আতিউর রহমান আতিক ডেপুটি স্পিকার পদে অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার নাম প্রস্তাব করেন। হুইপ ইকবালুর রহীম এই প্রস্তাবে সমর্থন করেন। পরে এটি কণ্ঠ ভোটে সংসদে পাস হয়। অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া দশম জাতীয় সংসদেও ডেপুটি স্পিকার ছিলেন। এই নিয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে এ পদ অলঙ্কৃত করবেন তিনি। এর আগে সংসদ ভবনের নবম তলায় অবস্থিত সরকারি দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় স্পিকার, ডেপুটি স্পিকারের নাম চূড়ান্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচনের পর তাদের অভিনন্দন জানায় নতুন সংসদ। পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম নবনির্বাচিত ও ডেপুটি স্পিকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু আলোচনায় অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা নবনির্বাচিত স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘আশা করি এই সংসদও কার্যকর হবে। প্রাণবন্ত হবে। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হবে বর্তমান সংসদ।’ তিনি এ সময় বিরোধী দলের সদস্যদেরও অভিনন্দন জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ধারায় সমালোচনা সব সময় গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিরোধী দলের সদস্যদের আশ্বাস দিতে পারি যে তারা তাদের সমালোচনা যথাযথভাবে করতে পারবেন। এখানে আমরা কোনো বাধা সৃষ্টি করবো না। কোনো দিন বাধা আমরা দেইনি, দেবও না।’

সংসদ নেতা বলেন, ‘গণতন্ত্রই একটি দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর তা আজ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রমাণিত সত্য। আজ আমরা আর্থ-সামাজিকভাবে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছি। এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বাংলাদেশের জনগণকে একটি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে স্বপ্ন, যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি এ দেশকে স্বাধীন করেছিলেন, সেই ক্ষুধা মুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা আমরা ইনশাআল্লাহ গড়ে তুলব। এটাই আমাদের লক্ষ্য।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ যেহেতু ভোট দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচিত করে এবং আমরা যারা প্রতিনিধিরা বসেছি, সকলেই কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসেছি। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে এখানে আমরা আমাদের স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করব।’

চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী: একাদশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন করবেন মাদারীপুর থেকে নির্বাচিত এমপি নূূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন। তার সঙ্গে হুইপ হিসেবে থাকছেন শেরপুরের এমপি আতিউর রহমান আতিক, দিনাজপুরের ইকবালুর রহিম, গাইবান্ধার মাহাবুব আরা বেগম গিনি, খুলনার পঞ্চানন বিশ্বাস, জয়পুরহাটের আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন ও চট্টগ্রামের সামশুল হক চৌধুরী। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বুধবার চিফ হুইপ ও হুইপদের নিয়োগ অনুমোদন করেন। পরে সংসদ সচিবালয় এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। চিফ হুইপ মন্ত্রীর এবং হুইপরা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করবেন।

হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ভাগ্নে। ১৯৯১ সাল থেকে মাদারীপুর-১ আসনের প্রতিনিধিত্ব করে আসা লিটন গত সংসদের সংসদ কমিটি এবং বেসরকারি সদস্যদের বিল এবং বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। এর আগে নবম সংসদে তিনি হুইপ এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এবার হুইপের দায়িত্ব পাওয়া ছয়জনের মধ্যে আতিক, ইকবালুর রহিম ও গিনি দশম সংসদেও একই দায়িত্বে ছিলেন। বাকি তিনজন এ দায়িত্বে নতুন।

সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন: প্রথম দিনেই নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীর মনোনয়ন দেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এরা হলেন- আবুল কালাম আজাদ, অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, এবি তাজুল ইসলাম, ফখরুল ইমাম এবং সাগুফতা ইয়াসমিন। স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে তারা সংসদ অধিবেশন পরিচালনা করবেন। গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ একাই জয়ী হয় ২৫৮টিতে। ২২টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে জাতীয় পার্টি। দশম জাতীয় সংসদে এই দলটি ৩৪টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছিলো।

নির্বাচনের পর ৩ জানুয়ারি নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির ছয় জন এবং গণফোরামের দুই জন এবং আরো চারজন বাদে বাকীরা এ দিন শপথ নেন। ওই দিনই টানা তৃতীয়বারের মতো সংসদ নেতা নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়েও রেকর্ড সৃষ্টি করেন শেখ হাসিনা। এবার প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ হন বিরোধীদলীয় নেতা। যদিও দশম জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা ছিলেন তার স্ত্রী ও জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ। সিঙ্গাপুরে চিকিত্সাধীন থাকায় একাদশ সংসদের প্রথম দিন অনুপস্থিত ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। অন্যদিকে ব্যাংককে চিকিৎসাধীন থাকায় মৃত্যুবরণ করলে কিশোরগঞ্জ-১ আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম শপথ নিতে পারেননি।

মানবকণ্ঠ/এসএস