নূর হোসেন

‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’-এই বাক্যটি এবং নূর হোসেন যেন সমার্থক শব্দ। তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে স্মরণীয় এক নাম। ১৯৬১ সালে জন্ম নেয়া নূর হোসেনের জন্ম তারিখ কেউ লিখে না রাখলেও তার চিরবিদায়ের দিনটি আমাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে স্মরণীয়। নূর হোসেনের পৈতৃক বাড়ি পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার বাতবুনিয়া গ্রামে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তার পরিবার স্থান পরিবর্তন করে ঢাকায় চলে আসে। পিতা মুজিবুর রহমান ছিলেন পেশায় অটোরিকশা চালক। মায়ের নাম মরিয়ম বিবি। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর নূর হোসেন পড়ালেখা বন্ধ করে মোটরচালক হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কয়েকটি রাজনৈতিক দল তৎকালীন স্বৈরশাসকের পতনের লক্ষ্যে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা করে। বিরোধী দলগুলোর একমাত্র দাবি ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা। অবরোধ-কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকায় একটি মিছিলে নূর হোসেন অংশ নেন এবং প্রতিবাদ হিসেবে বুকে-পিঠে সাদা রঙে লিখিয়ে নেন: ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। মিছিলটি ঢাকা জিপিও’র সামনে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি এলে পুলিশের গুলিতে নূর হোসেনসহ মোট তিনজন আন্দোলনকারী শহীদ হন। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ফলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আরো বেগবান হয়। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়। পদত্যাগ করেন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এর মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে এবং দুটি হ্যাঁ-না ভোটের মধ্য দিয়ে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনের এক বছর পর সরকারের পক্ষ থেকে নূর হোসেনের মৃত্যু দিনটি সরকারিভাবে উদযাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। দিনটিকে প্রথমে ঐতিহাসিক ১০ নভেম্বর দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হলেও আওয়ামী লীগ দিনটিকে শহীদ নূর হোসেন দিবস করার জন্য সমর্থন প্রদান করে এবং এই নামটি এখন পর্যন্ত বহাল রয়েছে। নূর হোসেনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার নামে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। প্রতি বছরের ১০ নভেম্বর বাংলাদেশে নূর হোসেন দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এছাড়া তিনি যে স্থানে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান, তার নামানুসারে সেই জিরো পয়েন্টের নামকরণ করা হয়েছে নূর হোসেন স্কয়ার। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক চিরস্মরণীয় প্রতীক বিবেচনায় নূর হোসেন এক অবিস্মরণীয় নাম। তার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
আব্দুল্লাহ আল সিফাত