নীরবতার সরব কণ্ঠস্বর

রায়হান উল্লাহ:
ছেলেবেলায় ছোট একটি বাক্সে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনে চমকিত হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। তখন ভাবনারা দুলত কীভাবে এই প্লাস্টিকের বাক্সে মানুষ আসল? ধীরে ধীরে ভাবনারা পূর্ণাঙ্গ হলো। একে একে সবাই বুঝতে শিখল বিজ্ঞানের তারহীন চমক। বাংলাদেশে ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় বেতার স্বল্প পরিসরে যাত্রা শুরু করে আজ অনেকদূর পৌঁছেছে। বাংলাদেশের বেতার দেশের প্রাচীনতম এবং একক বৃহত্তম সম্প্রচার মাধ্যম হিসেবে বিগত প্রায় সাত দশক ধরে তথ্য-বিনোদন ও শিক্ষার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নে জনগণকে সম্পৃক্ত করার দায়িত্ব পালন করে আসছে। এরপর অবাধ তথ্য প্রবাহের ডিজিটাল যুগে বহুমাত্রিক উপযোগিতার দাবি মেটাতে বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় ব্যক্তি মালিকানাধীন এফএম রেডিও। প্রধানত নগরকেন্দ্রিক এসব রেডিও চ্যানেলে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানই সম্প্রচারিত হয় বেশি। তারপর শহরকেন্দ্রিক সার্ভিস থেকে দূরে তৃণমূল পর্যায়ে তথ্য পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিওর যাত্রা শুরু হয়।

বেতারের ইতিহাস
ইতিহাস বলে বেতার হলো তারহীন যোগাযোগের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এতে তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে তথ্য প্রেরণ কিংবা গ্রহণ করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষপ্রান্তে অনেক দেশের বিজ্ঞানী প্রায় একই সময়ে বেতার আবি®ড়ার করলেও গুলিয়েলমো মার্কোনিকে বেতারের আবি®ড়ারক হিসেবে ধরা হয়। পূর্বে শুধু রেডিওতে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে বেতার প্রযুক্তির ব্যবহার চলছে সর্বত্র। রেডিও (বেতার), টেলিভিশন (দূরদর্শন), মোবাইলফোন, ইত্যাদি তারবিহীন যে কোনো যোগাযোগের মূলনীতিই হলো বেতার। বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে মহাকাশ পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হয় বেতার দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা রেডিও টেলি¯েড়াপ।

কমিউনিটি রেডিও
এতসব পুস্তকীয় কথা পেরিয়ে আমরা একুশ শতকের ধেই ধেই করে এগুনো প্রযুক্তির সময়ে। এখন ভাবনারা বড় বেশি দ্রুতগামী। আরো দ্রুতগামী জানার ইচ্ছা। এসব থেকেই বেতারের নানা রূপ দেখা যাচ্ছে। এ রূপের একটি শাখা কমিউনিটি রেডিও। যাকে বলা যায়, নীরব সুরে সরব কণ্ঠস্বর।
কমিউনিটি হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী, যার অন্তর্ভুক্ত মানুষজনের একই ধরনের কিছু লোকজ, আর্থসামাজিক ও সাং¯ড়ৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তারা নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ শহর, গ্রাম কিংবা মহল্লার মধ্যে থেকে পারস্পরিক আদান-প্রদান করে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিপন্ন, সেবা ও মালামাল লেনদেনের মাধ্যমে একই অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অংশীদার হয়ে ওঠে। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে এর সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। এলাকাবাসীর অংশগ্রহণ ও তাদের জীবনকেন্দ্রিক সমস্যা ও সম্ভাবনা, চাওয়া ও পাওয়া ইত্যাদির ওপর এর অনুষ্ঠান নির্মাণে এতে গুরুত্ব দেয়া হয়। সংবাদ, তথ্য বিনোদন, নাটক, জীবন্তিকা, সাং¯ড়ৃতিক অনুষ্ঠান আলোচনা অর্থাৎ স্থানীয় সর্ববিষয়ে প্রচার প্রক্রিয়ায় এলাকাবাসী সরাসরি অংশগ্রহণ করে থাকে। স্থানীয় যে কোনো গুরুতপূর্ণ তথ্য সংবাদ এ কেন্দ্র থেকে স্থানীয় জনগণ পেয়ে থাকে। যা কখনো জাতীয় সম্প্রচারকেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয় না।

কমিউনিটি রেডিওর ইতিহাস
বিশ্বে কমিউনিটি রেডিওর বয়স প্রায় ৬৫ বছর। ল্যাটিন আমেরিকায় এর উৎপত্তি। দারিদ্র্য ও সামাজিক অনাচারের বিরু"ে প্রতিবাদ জানাতে এই রেডিও যাত্রা শুরু করে ১৯৪৮ সালে। ১৯৪৮ সালে বলিভিয়ায় ‘মাইনার্স রেডিও’ এবং কলম্বিয়ায় ‘রেডিও সুতাতেনজ’ কমিউনিটি রেডিওর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে অগ্রদূত। সেই প্রেরণায় এখনো বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এই রেডিও স্থাপন হচ্ছে। মাইনার্স রেডিও মাক্সবাদী ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার "^›ে"^র মাঝের শক্তি হিসেবে কাজ করত। প্রচার করত খনি শ্রমিকদের উপযুক্ত কাজের পরিবেশ এবং শ্রম নিযুক্তির জন্য জনগণকে সংগঠিত করতে অনুষ্ঠান। শ্রমিকরাই অর্থ দিয়ে পরিচালনা ও সম্প্রচার করত এই রেডিও। রেডিও সুতাতেনজা সাধারণ মানুষের কাছে এমন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে বছরে প্রায় ৫০ হাজার চিঠি আসত। সুতাতেনজা প্রকৃত অর্থে জনগণের পরিচালনায় জনগণের রেডিও হয়ে উঠেছিল।

দক্ষিণ এশিয়ায় কমিউনিটি রেডিও
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম কমিউনিটি রেডিও নীতিমালা করে ভারত, ২০০৬ সালে। ভারতে বর্তমানে কমিউনিটি রেডিও এবং ক্যাম্পাস রেডিও আছে। ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী ভারতে প্রায় ছয় হাজার এবং থাইল্যান্ডে প্রায় তিন হাজার কমিউনিটি রেডিও সমাজের কল্যাণে কাজ করে চলেছে। ইউনেসকোর সহযোগিতায় ২০০১ সাল থেকে দারিদ্র্যপীড়িত আফ্রিকার মালি, মোজাম্বিক, সেনেগাল, এশিয়ার কিছু অঞ্চল ও ক্যারিবিয়ায় কমিউনিটি রেডিও সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বলিভিয়ার খনি শ্রমিকরা কমিউনিটি রেডিওকে তাদের জীবনের একটি অত্যাবশ্যকীয় কৌশল-যন্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

বাংলাদেশে কমিউনিটি রেডিও
বাংলাদেশ সরকার কমিউনিটি রেডিও স্থাপন, সম্প্রচার ও পরিচালনা নীতিমালা ২০০৮ প্রণয়ন করে। এর মধ্য দিয়ে দেশে কমিউনিটি রেডিওর দিগন্ত উšে§াচিত হয়। ফলাফল ২০১১ সালে দেশের প্রথম কমিউনিটি রেডিও হিসেবে যাত্রা শুরু করে রাজশাহীর রেডিও প"ঞ্চা ও বরগুনার রেডিও লোকবেতার। বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ সম্প্র্রচারে রয়েছে ১৭টি কমিউনিটি রেডিও এবং সম্প্র্রচার অপেক্ষায় রয়েছে আরো ১৫টি।
সম্প্র্রচারে থাকা রেডিওগুলো বর্তমানে প্রতিদিন ১৩ ঘণ্টা অনুষ্ঠান ও উন্নয়ন সংবাদ সম্প্র্রচার করছে। কমিউনিটি রেডিও নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীর রেডিও হিসেবে ষোলোটি জেলার সম্প্রচার এলাকার কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।

কমিউনিটি রেডিও ও সম্ভাবনা
কমিউনিটি রেডিওতে শুধু এলাকার মানুষের জন্য অনুষ্ঠান তৈরি হচ্ছে না; বরং ওইসব এলাকার মানুষ তাদের নিজেদের জন্য নিজেরাই অনুষ্ঠান তৈরি করছে, অংশ নিচ্ছে রেডিওর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। ফলে জাতীয় গণমাধ্যমে যাদের কথা সচরাচর উঠে আসত না তারা এখন তাদের চাওয়া পাওয়ার কথা তুলে ধরছেন কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে। এর ফলে তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
কমিউনিটির মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় এমন নানা বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান নির্মাণ ও সম্প্রচার হচ্ছে কমিউনিটি রেডিওতে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় উপক"লের ছয়টি রেডিও স্টেশন নিরবচ্ছিন্ন চবি"শ ঘণ্টা সম্প্রচারে থেকে এবং চলতি বছরের বন্যার সময় গাইবাšার রেডিও সারাবেলা একটানা তিনদিন নিরবচ্ছিন্ন ৭২ ঘণ্টা অনুষ্ঠান ও বিশেষ দুর্যোগ বুলেটিন ও বার্তা সম্প্রচারের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আলোচনায় উঠে আসে।
কমিউনিটি রেডিওতে তৈরি হচ্ছে নানা বিষয়-বৈচিত্র্যের অনুষ্ঠান। এসব অনুষ্ঠান ও সংবাদ ইতোমধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একাধিক পুর¯ড়ার-অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছে। চলতি বছরের ৩ নভেম্বর চীনে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন, এবিইউ অ্যাওয়ার্ডের জন্য চ"ড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয় গাইবাšার কমিউনিটি রেডিও সারাবেলার একটি বিশেষ প্রতিবেদন।
দেশের সবগুলো কমিউনিটি রেডিওতে দলিত যুবনারীদের কমিউনিটি মিডিয়ায় প্রবেশাধিকার ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষার অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে। এ দুটি কার্যক্রমের জন্য পর পর গত দুই বছর জাতিসংঘের তথ্যসমাজ (ডব্লিউএসআইএস) পুর¯ড়ার লাভ করে কমিউনিটি রেডিওগুলোর নেটওয়ার্কভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা-বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন ‘বিএনএনআরসি’। সারাদেশের বিভিন্ন কমিউনিটি রেডিওতে এক সময় কাজ করতেন কিন্তু বর্তমানে জাতীয় গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে কাজ করছেন এমন সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি।

কমিউনিটি রেডিওর সীমাব"তা
অর্ধযুগের পথচলায় কমিউনিটি রেডিওর ঝুড়িতে অসংখ্য অর্জন ও সাফল্য রয়েছে। বলা যায় কমিউনিটি রেডিওর পথচলা মসৃণ নয়। রয়েছে বহুবিধ চ্যালেঞ্জও। যার মধ্যে অন্যতম- অর্থনৈতিক স্থায়িত্বশীলতা। কমিউনিটি রেডিওকে বলা হচ্ছে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে এখন পর্যন্ত বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন নিতে পারছে না তারা। ফলে বেশিরভাগ রেডিও স্টেশন রয়েছে অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে। এ কারণে এখন পর্যন্ত কোনো কমিউনিটি রেডিও বš না হলেও খরচ কমাতে পূর্বের তুলনায় সম্প্রচার সময় কমিয়ে এনেছে অনেক স্টেশন। প্রত্যেকটি কমিউনিটি রেডিওতে হাতে গোনা কয়েকজন নিয়মিত কর্মী রয়েছেন। দলের বাকি সদস্যরা হচ্ছেন প্রত্যেকেই একেকজন স্বেচ্ছাসেবক। বিএনএনআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৭টি কমিউনিটি রেডিওর অনুষ্ঠান ও সংবাদ তৈরিতে কাজ করছেন এমন এক হাজার কর্মী ।

শেষ কথা
রেডিওর তরঙ্গের শিহরিত সময় ক্রমশ বাড়ছে। তা চলে এসেছে গ্রামীণ জনপদের খেতের আইলে। দলিত সমাজের প্রতিনিধিও তার মনের ক্ষোভ, আশা, স্বপ্ন কিংবা জিঘাংসা তরঙ্গের মাধ্যমে সহমর্মীদের ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এক সময় রেডিওর কণ্ঠস্বর ছিল স্বপ্নের মানুষ। এ ভাবনা এখন আর থাকছে না। ভাবুকরা নিজেই এখন সেই স্বপ্নের মানুষে রূপ নিচ্ছেন। এ ছাড়া ক্রমশ কমিউনিটি রেডিও বড় গণমাধ্যম হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ সরকারের নীতিমালা তৈরি করেছে। কমিউনিটি রেডিওর অনেকে জাতীয় গণমাধ্যমে কাজ করছেন। এসব সুখের। তাই খুব সহজেই ভাবা যায়, সেই দিন আর বেশি দূরে নয় একজন কৃষক কিংবা শ্রমিক কোনো একদিন বিশ্ব জয় করবেন। হয়ে উঠবেন একজন লেয়ার লেভিন অথবা ফতেহ লোহানী। আশা ও ভাবনা গন্তব্য পায়, পেতেই হয়।