নিয়ম ভেঙে প্রকল্প সংশোধনের চেষ্টা

দেশে ব্যাপকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পটুয়াখালীতে আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ কাজে হাজার বিঘা জমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়নের জন্য ২০১৪ সালের ২১ অক্টোবর একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি প্রকল্প অনুমোদন দেন। প্রায় ৭৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পটি গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। তাই ছয় মাস সময় চেয়ে সংশোধনের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু তাতে নিয়ম নীতি হয়নি মানা। অনুমোদিত মেয়াদকাল শেষ হওয়ার তিন মাস আগে প্রস্তাব করার নিয়ম থাকলেও তা আমলে নেয়নি কর্তৃপক্ষ। দুই কোটি ঘনমিটারেরও বেশি ভূমি উন্নয়নের জায়গায় প্রস্তাব করা হয়েছে অর্ধেকেরও কম। এ কাজে ওপেন টেন্ডারের পদ্ধতি বাদ দিয়ে ডিএমপির মাধ্যমে ব্যয় বেশি দেখানো হয়েছে প্রায় ১৬৪ শতাংশ। এ ছাড়া সংযোগ সড়ক ৩০ শতাংশ কমানো হলেও ব্যয় প্রায় ২০৮ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রস্তাব মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। তা আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী বলে পরিকল্পনা কমিশন থেকে আপত্তি করা হয়েছে। প্রকল্পটি সংশোধনের জন্য বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে তা যাচাই বাছাই করতে সম্প্রতি পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হলে তাতে এসব অভিযোগ পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নে কয়লাভিত্তিক ‘১৩২০ মেগাওয়াট পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে এক হাজার একর জমি অধিগ্রহণ, উন্নয়ন ও প্রকেটশন’ নামে একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী। বাস্তবায়ন কাল ধরা হয় ২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৭৮৩ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এক হাজার একর ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন করার কথা। সঙ্গে ৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ। এ ছাড়া সব সরঞ্জামসহ পটুয়াখালী ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাবস্টেশন থেকে ৩৩ কেভি বৈদ্যুতিক লাইন এবং ০.৪ কেভি লাইন নির্মাণ। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের জন্য নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি এবং চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি) বাংলাদেশ চুক্তি করে। কাজ শুরু হলেও তাতে গতি পায়নি। ফলে ব্যয় ছাড়া একবার দুই বছর সময় বাড়িয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে শেষ করার জন্য সংশোধনও করা হয়। কিন্তু এভাবে দু’বার সময় বাড়িয়েও সাড়ে তিন বছরে হয়নি সম্পূর্ণ কাজ। তাই এবার বাকি কাজ শেষ করতে ছয় মাস সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বর্ষাকাল প্রলম্বিত হওয়ায় মালামাল যথা সময়ে সাইটে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তাই পুনর্বাসন ও অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ সমাপ্ত করা সম্ভব হয়নি। এ জন্য আরো ছয় মাস অর্থাৎ আগামী জুন পর্যন্ত সময় লাগবে।

কিন্তু সূত্র জানায়, এত অল্প সময়ের মধ্যেও ৫ কিলোমিটারের জায়গায় সংযোগ সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে সাড়ে ৩ কিলোমিটার। কিন্তু এ কাজে ডিপিপিতে প্রতি কিলোমিটারে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা হিসেবে ব্যয় ধরা হয় ১৪ কোটি টাকা। কিন্তু এবারে ২০৭ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়ে প্রতি কিলোমিটারে ৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা হিসেবে ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা গ্রহণযোগ্য নয় এবং আর্থিক শৃঙ্খলারও পরিপন্থী। এ ছাড়া পূর্ত কাজও (আবাসিক অনাবাসিক ভবন নির্মাণ) বাকি রয়েছে। এসব নির্মাণে ৫২ কোটি টাকা বা প্রায় ৭ শতাংশ ব্যয় বাড়ছে। ২ কোটি ২ লাখ ৩৫ হাজার ঘনমিটার ভূমি উন্নয়নের কথা থাকলেও সংশোধিত প্রকল্পে কমিয়ে ৭৩ লাখ ৯ হাজার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু নিয়ম না মেনে রেট সিডিউল ১৫৯ টাকার জায়গায় ১৬৪ শতাংশ বাড়িয়ে ৪১৯ টাকারও বেশি করা হয়েছে। এ ছাড়া ওটিএমের পরিবর্তে ডিপিএমের প্রস্তাব করা হয়েছে। তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প অনুমোদনের নীতিমালার পরিপন্থী। যা আর্থিক শৃঙ্খলারও পরিপন্থী। আর সময় বাড়ানোর কারণে প্রকল্প পরিচালকসহ অন্যদের জন্য ব্যয়ও বাড়ছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা। ভূমিও কম অধিগ্রহণ করা হচ্ছে ১.২ একর।

প্রকল্পটি সংশোধনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে ১৪ জানুয়ারি পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে এসব ব্যাপারে আপত্তি করে তা ন্যায়সঙ্গত ব্যয় করার জন্য বলা হয়েছে। এসব যুক্ত করে সংশোধিত ডিপিপি পুনরায় পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়।

মানবকণ্ঠ/আরএ