নির্বাচন বানচালে সক্রিয় রয়েছে বিশেষ গোষ্ঠী

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক যারা বিশৃঙ্খলা করতে চায় তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। নির্বাচন বানচালে যারা ষড়যন্ত্র করছে তাদের ওপর কঠোর নজর আছে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে তাদের কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে পুলিশ কাজ করছে। কেউ গুজব ছড়ালে বা অপপ্রচার করলে প্রতিহত করা হবে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। সম্প্রতি ঢাকায় পুলিশ সদর দফতরে সাক্ষাৎকার দেন তিনি। এ সময় চট্টগ্রামের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কৌশল, সেবার মান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়। সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-

মানবকণ্ঠ: নির্বাচনকে ঘিরে সিএমপির কী রকম প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা রয়েছে?
সিএমপি কমিশনার: আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বানচাল করতে বিশেষ গোষ্ঠী ষড়যন্ত্রে সক্রিয় রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে হয় সে প্রয়াসে সিএমপি ব্যাপক প্রস্তুতি সমপন্ন করেছে। এ মহাযজ্ঞকে সামনে রেখে সব পুলিশ সদস্যকে নির্বাচন প্রস্তুতিমূলক ব্রিফিং ও প্রশিক্ষণ প্রদান, ঘাটতি জনবল পূরণ, পুলিশ সদস্যদের কল্যাণ মূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি, তাদের উজ্জীবিত করণ, পর্যাপ্ত পরিমাণ লজিস্টিক সাপোর্টের ব্যবস্থা গ্রহণ, জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় ও যোগাযোগের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও গোয়েন্দা নজরদারি কার্যক্রম বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে অগ্রিম তথ্য সংগ্রহকরণ তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। কোনো ধরনের বিরূপ তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে।

মানবকণ্ঠ: শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে সিএমপি?
কমিশনার: একটা নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে যে ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন তা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে এ অঞ্চল ঘিরে একটি বিশেষগোষ্ঠী তৎপর হতে পারে। সে জন্য তাদের ওপর নজরদারি আছে। এ ছাড়া সব দলের রাজনৈতিক প্রচারণা কার্যক্রম শান্তিপূর্ণভাবে পালনে সহযোগিতা করা। নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশ সদস্যদের সুশৃঙ্খল রাখা ও তাদের মনোবল উজ্জীবিত রাখা। লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করার বিষয়টি প্রাধান্য দিচ্ছি।

মানবকণ্ঠ: অভিযোগ রয়েছে সিএমপির কতিপয় সদস্য অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত?
সিএমপি কমিশনার: একটি পরিবারের পাঁচ সন্তানের সবাই সমানভাবে যেমন সৎ, বিদ্বান ও ন্যায়পরায়ণ হয় না, একইভাবে ৭ হাজার সদস্যের সিএমপি পরিবারে কর্মরত সব পুলিশ সদস্যের মাঝে এসব গুণাবলী সমান হবে না, এটাই স্বাভাবিক। এ রকমের ধারণা প্রত্যাশা করা সঠিকও নয়। সিএমপিতে কর্মরত সৎ, যোগ্য ও দক্ষ পুলিশ সদস্যদের যেমন তাদের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পুরস্কার প্রদান করা হয় তেমন ভাবে অসৎ পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা বা আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

মানবকণ্ঠ: অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সিএমপিতে প্রযুক্তির ব্যবহার কেমন হচ্ছে?
কমিশনার: সিএমপিতে পুলিশ কমিশনার হিসেবে যোগদানের পর ৭০ লক্ষাধিক জনবসতিপূর্ণ চট্টগ্রাম মহানগরীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তি নির্ভর পুলিশিং কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। এ মহানগরে প্রতিবছর ৫ থেকে ৭ হাজারের মতো মামলা হয়। বেশির ভাগই মাদক এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা। প্রতি বছর দায়ের করা মামলার মধ্যে প্রায় ৫ হাজারের মতো মামলার নিষ্পত্তি হয়ে থাকে। দেশে বর্তমানে দায়েরকৃত মামলার কনভিকশন (সাজা) হার প্রায় শতকরা ২০ ভাগ। যা মোটেও সন্তোষজনক নয়। এজন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তের মান বৃদ্ধির পাশাপাশি জনগণের প্রতি সেবাধর্মী মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি। অপরাধ প্রতিরোধে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসি টিভি স্থাপন, অপরাধ প্রবণ স্থান চিহ্নিত করে ফুট পেট্রল ও মোবাইল পেট্রল বৃদ্ধি, ওয়ারেন্ট তামিল বৃদ্ধি বিশেষত সাজা ওয়ারেন্ট, ছিনতাই পার্র্টি ও গাড়ি চুরি পার্টি গ্রেফতার, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ইত্যাদি কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হয়েছে।

মানবকণ্ঠ: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অধিকতর উন্নয়নে কোন কোন বিষয়ে গুরুত্বারোপ করছেন?
সিএমপি কমিশনার: চট্টগ্রাম মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অধিকতর উন্নয়নে বেশ কিছু গঠনমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কিছু কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে লাইসেন্স প্রাপ্ত অস্ত্রধারীদের তথ্য যাচাই বাছাইকরণ, সিসি টিভি স্থাপন ও অচল সিসি টিভি সচল করার ব্যবস্থা গ্রহণ, কমিউনিটিং পুলিশিং কার্যক্রম জোরদারকরণে থানা ভিত্তিক মাসওয়ারি বাধ্যতামূলক কর্মসূচি, বিট পুলিশিং কার্যক্রম জোরদারকরণ, নাগরিক তথ্য সংগ্রহ করণ কার্যক্রম জোরদার ইত্যাদি। এ ছাড়াও পুলিশি সেবাকে গণমুখী ও কল্যাণমূলক করতে পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কল্যাণ নিশ্চিত করণে প্রতি মাসে ‘কল্যাণ সভা’ আয়োজন করা হচ্ছে। পুলিশ সদস্যদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবন উন্নয়নে পর্যাপ্ত ছুটি, আবাসন সুবিধার মান উন্নয়ন, উদ্দীপনামূলক প্রশিক্ষণ, খেলাধুলা কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, বিনোদন সাংস্কৃতিক কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে সদস্যদের মানবিক গুণাবলীর বিকাশ এবং সেবাধর্মী মানসিকতা গঠনে মনোযোগ প্রদান করা হয়েছে। আশা করা যায় বর্ণিত কার্যক্রমগুলো চট্টগ্রাম মহানগরের জনগণের জন্য পুলিশি সেবার মান উন্নয়নের বিরাট ভূমিকা পালন করবে ও সিএমপির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।

মানবকণ্ঠ: মাদক নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে?
কমিশনার: ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনের মতো মাদক দ্রব্যের কোনোটাই বাংলাদেশে উৎপাদন হয় না। এ সব মাদকদ্রব্যের প্রধান উৎস ও উৎপাদনস্থল হলো ভারত কিংবা মিয়ানমার। ভৌগলিকগত কারণে চট্টগ্রামকে মাদক পাচারকারীরা মাদক পাচাররে প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা কক্সবাজার হয়ে প্রবেশ করে চট্টগ্রামে সড়কপথ কিংবা জলপথ ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিচ্ছে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণের কাজ বর্ডার থেকেই শুরু করতে হবে। সিএমপি যেসব বিষয়ের ওপর জোর দিতে পারে তা হলো মাদক বিরোধী জনসচেতনতা সৃষ্টি। ইভটিজিং, ছিনতাই, নারী নির্যাতন, সংশ্লিষ্ট অপরাধ সমূহে ‘নীরব উৎস’ হলো মাদক।

মানবকণ্ঠ: সিএমপিতে কর্মরতদের পেশাদারিত্ব ও মনোবল বৃদ্ধিতে বিশেষ পদক্ষেপগুলো কী কী?
কমিশনার: জনগণের পুলিশি সেবার মানের উন্নয়ন করতে উক্ত সেবা প্রদানকারী সদস্যদের মাঝে কর্মউদ্দীপনা সৃষ্টি ও মনোবল বৃদ্ধি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ বিষয়টি মাথায় রেখে তাদের কল্যাণমূলক কর্মসূচি নতুন নতুন ব্যারাক নির্মাণ, পুরাতন ব্যারাক কিংবা অফিসার্স কোয়ার্টার সংস্কার, সিএমপির ইনসার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সুর্নিদিষ্ট দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক বিষয় প্রশিক্ষণ পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

মানবকণ্ঠ: অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে সামাজিক কর্মকাণ্ড গ্রহণ করেছেন কী?
কমিশনার: রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে সিএমপি আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজের প্রতি একটি দায়বদ্ধতা থেকে জনকল্যাণমূলক এবং জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। সিএমপির সামাজিক কর্মকাণ্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে ভালো ফলাফল অর্জনকারী পুলিশ সদস্যদের মেধাবী সন্তানদের স্বীকৃতিস্বরূপ অর্থ পুরস্কার প্রদান, পুলিশ সদস্যদের রক্তদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, অপরাধ বিরোধী কিংবা ট্রাফিক বিষয়ক জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ছাত্রছাত্রীদের সম্পৃক্ত করতে স্টুডেন্ট কমিউনিটিং পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করণ।

মানবকণ্ঠ: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করছেন?
সিএমপি কমিশনার: এদেশে সকল অংশীজনের স্বার্থ পুলিশি সেবা দ্বারা প্রভাবিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে জনকল্যাণে আইন প্রয়োগের মতো গুরুদায়িত্ব পালনের সময় কোনো বিশেষ অংশীজনের প্রতি আনুগত্য স্বীকার ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা পেশাগত নৈতিকতার বিরোধী। সিএমপি এ দায়িত্ব পালনে সব পুলিশ সদস্যকে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে সামাজিকতা, নৈতিকতা ও ন্যায়-পরায়ণতা সমুন্নত রেখে কঠোর হাতে আইন প্রয়োগকে উদ্বুদ্ধ করে ও কোনো অপরাধ কার্যক্রম আড়াল করার জন্য রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার গর্হিত কাজ বলে চিহ্নিত করে। সিএমপি সব ধরনের অন্যায় চাপ বা তদবিরের ঊর্ধ্বে উঠে জনকল্যাণে কঠোর হাতে আইন প্রয়োগে অঙ্গীকারবদ্ধ।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ