নির্বাচন এক আতঙ্কের নাম

শতাব্দী জুবায়ের :
বাংলাদেশে নির্বাচন যেন এক আতঙ্কের নাম। নির্বাচনের সময় যত কাছে আসে এই আতঙ্ক আরো বাড়তে থাকে। এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর চড়াও হন। মারধর, মামলা, হামলা এসব যে রাজনীতির মাঠে ডাল, ভাত। কখন কী হয় তা বলা যায় না। প্রশ্নটা হলো একটি গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের আগে একজন মা কেন তার সন্তান হারাবেন? একটি দল কেন ক্ষমতা ধরে রাখার বা টিকে থাকার জন্য অন্য দলের ওপর কেন চড়াও হবে? দেশটা না গণতান্ত্রিক, তাহলে এমন হবে কেন? যে রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তারা আরো থাকতে চাইবে এটা স্বাভাবিক। যখন ক্ষমতায় যাবে তখন অবশ্যই জনগণের ম্যান্ডেড নিয়ে যেতে হবে। কেন্দ্র দখল করে, ভোট চুরি করে নয়। যখন কেন্দ্র দখল, ভোট চুরির হিসাব আসবে তখনই সহিংসতা বাড়বে।
আসুন দেখি জনগণ কী চায়। জনগণ চায় তাদের পছন্দসই নেতা নির্বাচন করতে। ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে। যাকে খুশি তাকে ভোট দিতে। কালো টাকা, পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচন দেখতে। প্রভাবমুক্ত ভোটকেন্দ্র, সন্ত্রাস ও জবরদখলমুক্ত নির্বাচনের পরিবেশ। প্রশাসনকে দেখতে চায় নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব নির্বাচন। সব দল ও মতের মানুষ যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে সে পরিবেশ চায় জনগণ।
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মনোভাব গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দিচ্ছে। পারস্পরিক হিংসাত্মক ও দ্বিমুখী নীতি বিশিষ্ট রাজনীতি আমাদের দেশের ভাবমূর্তি অনেকাংশে কমছে। রাজনৈতিক পরিবেশ পেতে দরকার স্থিতিশীল। দেশের সার্বিক উন্নতির জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেশকে ভালোবাসার নির্দশন স্থাপন করতে হবে। যে কোনো গণতান্ত্রিক দেশের অন্যতম শর্ত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। দেশের ভালোর জন্য একমঞ্চে আসুন। এ দেশের মানুষকে উৎকণ্ঠার জীবন থেকে মুক্ত করে সুস্থভাবে বাঁচতে শেখান। আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় হওয়ার জন্য সব রাজনৈতিক দলসহ আমরা সবাই একত্রে ঘোষণা করি- এই হোক আমাদের সবার অঙ্গীকার।
রাজনৈতিক দলগুলোকে বলব, আপনারা নিজের স্বার্থ পরিত্যাগ করে জনগণের স্বার্থে কাজ করার মনোভাব তৈরি করুন। নির্বাচনের জন্য সব রাজনৈতিক দলকে একত্রে বসে অতীতের নির্বাচনের পদ্ধতি ও ফলাফলগুলো পর্যালোচনা করে একটি সুন্দর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে। নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যেসব ব্যবস্থা দরকার ক্ষমতাসীন দলের সে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ব্যক্তিস্বার্থ ত্যাগ করে দেশ ও জনগণের স্বার্থের কথা চিন্তা করে সঠিক সময়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিন। সব রাজনৈতিক দলকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত।
শক্তিশালী নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন থাকলে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করা সম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে দেশ ও জনগণ জিম্মি। সত্যিকার গণতন্ত্র চর্চা শুরু না হলে গ্রহণযোগ্য কোনোকিছু আশা করা সম্ভব নয়। নির্বাচনকে ঘিরে ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি হলে সাধারণ জনগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এদেশের সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর ইচ্ছা-অনিচ্ছার কাছে জিম্মি, যদি নির্বাচনকে ঘিরে সংকট এড়ানো সম্ভব না হয় তাহলে সাধারণ জনগণকে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। অতীতের মতো এক দল আরেক দলের ওপর দায়বদ্ধতা চাপিয়ে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের নির্লজ্জ চেষ্টা করবে।
বর্তমানে সরকার যদি এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে যার মাধ্যমে অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব, তাহলে তার বাস্তব প্রমাণ দিয়ে বিরোধী দলকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনুক। কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশ্রয় না নিয়ে যদি উভয় দল দেশের স্বার্থে সংলাপে বসে তাহলে অবশ্যই এ সমস্যার সমাধান দেয়া সম্ভব। আমরা সরকারি দলের কাছে এমন কিছু আশা করব না যার কারণে বিরোধী দল বারবার আন্দোলনের নামে হরতাল, ভাংচুর করবে। পক্ষান্তরে প্রতিবাদ করতে গিয়ে সরকারি দল পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আমরা বিগত সময়গুলোতে দেখেছি উভয়দলই একে অন্যের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছড়াচ্ছে। যেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ভারত যদিও বাংলাদেশের বহু বছরের মিত্র, এখন চীন সেখানে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০০৭ সালের পর থেকে চীন বাংলাদেশে প্রায় তিনশো কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। তারা বাংলাদেশে সেতু, সড়ক থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র, অনেক কিছুই নির্মাণ করছে। নির্বাচনে এই দুই দেশের প্রভাব থাকবে। তারা চাইবে তাদের সুবিধামতো সরকার নির্বাচিত হোক। তাই এই দুই রাষ্ট্র যাতে একচেটিয়া সুবিধা না নিতে পারে এমন সরকার নির্বাচিত করা হবে জনগণের বুদ্ধিমানের কাজ।
রাজনৈতিক দলগুলো এখন সংঘাত এবং সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে আগামী নির্বাচনের জয়-পরাজয়কে সামনে রেখে। নির্বাচন হয়ে গেলে এই সংঘাত থামবে কিন্তু তারপর আবার যখন নির্বাচন আসবে তার আগে একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। রাজনীতির এই সংস্কৃতি বেশ পুরনো, রাজনীতি হলো ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতার এক দৌড়। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই। যদি থাকত তাহলে হরতালও দেয়া হতো না আবার সভা-সামাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আসত না। এখন আমরা কোনোভাবেই সহিংসতার নির্বাচন চাই না। নির্বাচন হতে হবে অবাধ ও সুষ্ঠু। তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে।