নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহার দরকার

নির্বাচনে প্রযুক্তির ব্যবহার দরকার

সময় যত যাচ্ছে প্রযুক্তির ব্যবহার ততই বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে নির্বাচনে ভোট প্রদান ও প্রচারণার ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। যেমন- বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার অন্যতম ফেসবুকে এ ধরনের প্রচারণা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। ফেসবুকের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সামাজিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছে তার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী ও তার সমর্থকরা প্রচারণা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে দলীয়ভাবেও এ ধরনের প্রচার-প্রচারণা চলছে। যেমন- বর্তমান সরকার তাদের সময়ে অর্জিত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডগুলো মানুষের কাছে খুব সহজে পৌঁছে দিতে পারছে। এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রের উন্নয়নের বিভিন্ন দর্শনগুলো প্রচারের ব্যবস্থা করেছে। এর ফলে দেশের মানুষ উন্নয়নের প্রক্রিয়া যে চলমান রয়েছে এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠী সম্পৃক্ত যে উপকৃত হবে সে বিষয়গুলো বিবেচিত হচ্ছে। এটি নির্বাচনী প্রচারণার একটি ইতিবাচক দিক। এর ফলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয় এবং কোনটি ভালো ও কোনটি মন্দ এই বিষয়ে মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে এই ধরনের প্রচারণায় কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কিনা সে বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে। কারণ একটি গোষ্ঠী কোটা আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের নামে বিভিন্ন ধরনের গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার করেছে। এই নির্বাচনেও সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে এই ধরনের প্রচার-প্রচারণায় এই গোষ্ঠীটিকে তৎপর দেখা যাচ্ছে। এরা কারা এটি শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনা দরকার।

ফেসবুকের মতো ম্যাসেঞ্জারেও নির্বাচনের প্রার্থীরা তাদের মিশন ও ভিশন উল্লেখ করে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে তার প্রচারণা চালাচ্ছে। এর সঙ্গে তার নির্বাচনী ম্যাসেজটি অন্যদেরকে শেয়ার করার মাধ্যমে তার বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার অনুরোধ করছে। এটি প্রযুক্তির একটি ইতিবাচক ব্যবহার। তবে এটিকে কোনোভাবেই নেতিবাচক পর্যায়ে নেয়া উচিত নয়। এখানেই প্রার্থীর ও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর দায়বদ্ধতার বিষয়টি জড়িত। অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সবদলের অংশগ্রহণে এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ইতিবাচক ঘটনা। কারণ এবারই প্রথম ৩০০ আসনের জন্য প্রায় ১২ হাজার প্রার্থী সংসদ সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এরা যে সবাই রাজনীতিবিদ তা নয়।

রাজনীতিবিদদের বাইরেও আমলা, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, চিকিৎসক, খেলোয়াড়, অভিনেতা, প্রকৌশলী, আইন বিশেষজ্ঞরাও মনোনয়ন চেয়েছেন। তবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক না নেতিবাচক ছিল সে বিষয়টি নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ এ ধরনের গবেষণার মাধ্যমে বোঝা সম্ভব মানুষের মানসিকতা রাজনীতির কোন কোন বিষয়গুলোকে প্রভাবিত করছে। তবে এখান থেকে একটি বিষয় বলা যায় তা হলো মানুষ জনবান্ধব নীতি ও আদর্শের জায়গা থেকে সরে এসে সম্ভবত ক্ষমতা কেন্দ্রিক রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়েছে। যেখানে দলীয় ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এটি রাজনীতির জন্য শুভকর বিষয় নাও হতে পারে। এবারের নির্বাচনে আরো একটি দিক হলো ভিন্ন নীতি ও আদর্শের রাজনীতিবিদদের একত্রিত হওয়া। এখানেও নেতিবাচক বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। কারণ মানুষ যখন জনকল্যাণকে প্রাধ্যন্য না দিয়ে তার ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তখন নীতি ও আদর্শ বিসর্জন দিয়ে এ ধরনের ঐক্য গড়ে ওঠে। যেমন- জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে বিভিন্ন নীতি ও আদর্শের মানুষের একত্রিত হতে দেখা গেছে। তবে এই বন্ধনকে ঐক্য না বলে যে কোনোভাবে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এ ধরনের বিষয়গুলো বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ জানতে পারছে। এতে করে মানুষের মধ্যে এই ধরনের ভারসাম্যহীন ঐক্যের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠছে। আবার এই প্রচার মাধ্যমগুলোতে সরকারের চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়াগুলো নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ চলছে।

বিভিন্ন উন্নয়নসূচকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে সেগুলোও বিভিন্নভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য ও উপাত্তের তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণের বিষয়গুলো প্রচার মাধ্যমে আসছে। বর্তমান সরকারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মাধ্যমে উন্নয়নকে একটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো। এই বিষয়গুলো জনগণের কাছে ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। ভারতের বিগত নির্বাচনে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারগুলো বিজ্ঞাপন আকারে প্রচারের মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে। আমাদের দেশেও এর প্রভাব পড়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। এছাড়া বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া যেমন- টুইটার, লিঙ্কডিন, হোয়াটসঅ্যাপ, স্কাইপি, ভাইবার, ইমো ইত্যাদির মাধ্যমেও নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চলছে। নির্বাচনে যারা মূল নেতৃত্বে আছে তারা মানুষের কাছে যাবে এটি জনগণ আশা করে। কিন্তু সময় ও ব্যস্ততার জন্য সেটি অনেক সময় সম্ভব হয় না। রাজনীতিবিদরা ভিডিও কনফারেন্সের মতো বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরাসরি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে।

বর্তমানে আমাদের বাজেট মাল্টিমিডিয়াসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হচ্ছে। নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশের ক্ষেত্রেও এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এছাড়া সমাজে সব মানুষের কাছে সমাদৃত যে ব্যক্তিরা রয়েছেন তাদের সংক্ষিপ্ত ভিডিও ক্লিপস, ইউটিউব ও বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করে বিভিন্ন প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল সাধারণ মানুষের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। বর্তমানে ভিজ্যুয়াল স্টুডিও ধারণা মানুষের মধ্য এসেছে। এই ধারণা প্রয়োগ করে রাজনীতিবিদরা তাদের উন্নয়নের থ্রিডি ইমেজ হাতে নিয়ে মানুষকে দেখাতে পারে। এতে করে মানুষ প্রকৃত ধারণা পাবে। এছাড়া বিভিন্ন জনসভায় উন্নয়ন সংক্রান্ত ও জনগণের সাধারণ চাহিদা সংক্রান্ত বিষয়গুলোর কিভাবে সমাধান হবে তা ভিডিও ক্লিপ আকারে দেখানো যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘গ্রাম হবে শহর’ এই বিষয়টি নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে মানুষের সামনে এনেছেন। এটি একটি বাস্তবধর্মী ও সৃজনশীল ধারণা। প্রতিটি মানুষ তার জীবন যাত্রাকে এগিয়ে নিতে চায়। নতুন প্রযুক্তি ও ধারণাকে ব্যবহার করে দেশের উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চায়। এই স্লোগানটি এই বার্তায় বহন করছে বলে প্রতীয়মান হয়। প্রকৃতপক্ষে গ্রাম শহর হবে না তবে শহরের যাবতীয় সামাজিক ও মানবিক সুবিধাগুলো গ্রামে পৌঁছে যাবে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য হিসেবে যে বিষয়টিকে বিবেচনা করা যায় তা হলো মানুষের আয়। ‘গ্রাম হবে শহর’ এটির সফল বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব হবে যখন গ্রাম ও শহরের মানুষের আয়ের বৈষম্য দূর করে মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে। এটি কিভাবে সম্ভব? এটি আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমেই সম্ভব। বিশেষ করে গ্রামের মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সব কৃষককে কৃষি উৎপাদনের প্রযুক্তিভিত্তিক জ্ঞানে দক্ষ করে ফসল উৎপাদনে অনুপ্রাণিত করতে হবে। নতুন নতুন প্রযুক্তিগুলোর ব্যবহার সম্পর্কে তাদের ধারণা দিতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা ফসল উৎপাদনে বিভিন্ন মৌলিক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। এর ফলে বছরে তিন থেকে পাঁচ ধরনের ফসল উৎপাদন করা যায়। কৃষকদের এই ধারণাগুলো দিতে হবে। এর ফলে মানুষের আয় বাড়বে।

বাংলাদেশে চল্লিশ থেকে বিয়াল্লিশ লাখ কুটির শিল্প রয়েছে। গ্রামীণ জনপদের নারীদের এই কুটির শিল্পে দক্ষ করে তাদের আর্থিকভাবে সাবলম্বী করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এতে করে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিও নিশ্চিত হবে। ‘গ্রাম হবে শহর’ এক্ষেত্রে একটি কুটির শিল্প ও একজন মানুষ এই ধারণার প্রয়োগ করা যেতে পারে। যেমন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ এই ধারণা প্রদান করেছেন। গ্রামের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে আউটসোর্সিংয়ের মতো কাজে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। যাতে করে তারা গ্রামে বসেই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন আউটসোসিংয়ের কাজগুলো করতে পারে। বিভিন্ন ধরনের সেবাগুলো যেমন- শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও এই ধরনের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে শহরে যে সুবিধা রয়েছে সমপরিমাণ সুবিধা গ্রামেও দিতে হবে। মানুষকে শহর কেন্দ্রিক না করে গ্রাম কেন্দ্রিক করে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিতে হবে। গ্রাম হবে শহর এটি কিভাবে বাস্তবায়ন হবে তা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াসহ গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আরো এগিয়ে যাবে। এর সঙ্গে এগিয়ে যাবে মানুষের মন ও মানসিকতা। তবে সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহারকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। তবেই নির্বাচন ও রাজনীতি মানুষের মনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে। এটি সবার প্রত্যাশা।

প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিবিদদের সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশতে হবে। হিউম্যান স্কিল বা ইন্টারপার্সোনাল স্কিল রাজনীতিবিদদের মধ্যে থাকতে হবে। নীতি ও আদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনীতিকে সঠিক দর্শনের ওপর গড়ে তুলতে হবে। এর সঙ্গে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকে দেশ প্রেমের মূলমন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তবেই রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন সম্ভব।
– লেখক: শিক্ষাবিদ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.