নির্বাচনের আগে হত্যার টার্গেটে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতারা!

আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলের বড় ও শীর্ষ নেতাদের টার্গেট করে হত্যা করা হতে পারে। নির্বাচনের আগে গুপ্ত হত্যা ও গুম-খুন বেড়ে যেতে পারে। উত্থান ঘটতে পারে জঙ্গি তৎপরতার। মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে অশুভ শক্তির। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা ধরনের সুযোগ গ্রহণ করে নির্বাচনের স্বাভাবিক পরিবেশকে অস্বাভাবিক করে তুলে নির্বাচনকে বিশৃঙ্খল করতে পারে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে বৃহস্পতিবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সমন্বয় সভায় উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফ থেকে এসব আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। বৈঠকে সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানে ইসির কাছে বেশকিছু সুপারিশ ও প্রস্তাবনাও দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসবের মধ্যে রয়েছে- নির্বিঘ্নে নির্বাচনের কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য ভোটের তিন দিন আগে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা, এর লেনদেন তদারকি করা, মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা, ফোরজি থেকে নেটওয়ার্ক টুজিতে নামিয়ে আনা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাছে কেবল বৈধ অস্ত্র রাখা; তবে- তা প্রদর্শন না করা, প্রার্থীর বাইরে যাদের কাছে বৈধ অস্ত্র রয়েছে তা নির্বাচনের ৭ দিন আগে জমা দেয়া, সাংবাদিকদের ভোটের পরিচয়পত্র দেয়ার আগে তাদের সঠিকতা যাচাই করা, যেনতেনভাবে কাউকে কার্ড না দেয়া, পর্যবেক্ষক এবং পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর ওপর সতর্ক নজর রাখা, ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কারো মোবাইল নিয়ে প্রবেশ করতে না দেয়া এবং কেন্দ্রের মধ্যে ছবি ও ভিডিও তোলা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন বৈঠকে উপস্থিত গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি রিটার্নিং কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে দেশের চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ভোটের ৯-১০ দিন আগে থেকেই (২০ ডিসেম্বরের পর) আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো বেশি খারাপ হওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়ে ইসির পক্ষ থেকে এ সময়কালীন ভোটের মাঠে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায় কিনা সে বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। তবে এ নিয়ে দ্বৈত মত আসায় কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায়নি। বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদার সভাপতিত্বে বৈঠকে চার নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এবং ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের সচিব, সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সব জেলা পুলিশ সুপার (এসপি), সব জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সূত্রমতে, বৈঠকে র‌্যাবের মহাপরিচালক মোবাইল নিয়ে কেন্দ্রে না যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রের অভ্যন্তরে ভোটকক্ষে কোনো ধরনের ছবি ও ভিডিও ধারণ করা যাবে না; এ বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হবে। সাংবাদিকদের নির্বাচনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে যেনতেনভাবে কাউকে কার্ড না দিতে ইসির প্রতি অনুরোধ জানান র‌্যাব ডিজি। তিনি নির্বাচনে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কার্যক্রম সর্তকতার সঙ্গে অবলম্বন করার জন্য বিশেষভাবে তাগিদ দেন।

সশস্ত্রবাহিনীর বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার বলেন, নির্বাচন কমিশন যে নিদের্শনা দেবে সেই অনুযায়ী আমরা কাজ করব। পাবর্ত্য এলাকায় ঝামেলা বিদ্যমান; সেখানের রিটার্নিং কর্মকর্তাকে সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচনের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে ওই এলাকার জন্য হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখতে হবে।

বৈঠকে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা সুযোগ নিয়ে নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। এ সুযোগে জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ওই গোষ্ঠীটি নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর পর তৎপর হয়ে উঠেছে। পুলিশকে ব্যস্ত রাখার কৌশলে নেমেছে। এমনকি দফায় দফায় ফোন দিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে কাজে বিঘ্ন তৈরির চক্রান্তে নেমেছে। ইতিমধ্যে তাদের ওই পরিকল্পনা ফাঁস হয়েছে; তাদের নথি আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। মোবাইল ব্যাংকিং নির্বাচনের ৩ দিন আগে বন্ধ রাখতে হবে। মনিটরিং ও ট্রাকিং বন্ধ রাখতে হবে।

একজন পুলিশ সুপার বলেন, ক্ষমতাসীন দলের বড় নেতাদের নির্বাচন করে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে মিশনে নেমেছে। দেশে গুপ্ত হত্যা ও খুন বেড়ে যেতে পারে। উত্থান ঘটতে পারে জঙ্গি চক্রের। ওই কর্মকর্তা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ছাড়া কাউকে মোবাইল নিয়ে প্রবেশ না করতে ব্যবস্থা নিতে কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছেন।

এদিকে নির্বাচনে কালো টাকার ব্যবহার বন্ধে ভোটের তিন দিন আগে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ করার প্রস্তবনা দেয়া হয়েছে বৈঠকে। এই প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দেয়া হয়, নির্বাচনকালীন বিদেশ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা আসতে পারে। এসব টাকা নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ইসিকে অনুরোধ করেছেন।

বৈঠকে সেনাবাহিনীর মোতায়েনের বিষয়ে সভায় দুই ধরনের বক্তব্য উঠে এসেছে। ইসির পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ২৪ ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি পর্যন্ত সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত ছিল। বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি পক্ষের দাবি, নয় দিনের চেয়ে সেনা মোতায়েন বাড়ানো হোক। আরেক পক্ষের দাবি, সেনাবাহিনী মোতায়েনের সময় কমিয়ে বরং বিজিবিকে আগে নামানো হোক। রোহিঙ্গা বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। বলা হয়েছে, রোহিঙ্গারা নির্বাচন প্রভাবিত করতে পারে। সেজন্য বিশেষ নজরদারি বাড়াতে হবে।

বৈঠকে নির্বাচন কমিশনাররাও কিছু নির্দেশনা দেন। নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার কাছে ২৪ ঘণ্টা ফোন আসছে। বেশিরভাগই বলেন, স্যার ভোট দিয়ে বাসায় ফিরতে পারব কিনা? ভোটারদের এই আশঙ্কা রাখা যাবে না। এটা দূর করতে হবে আপনাদের। নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেন, ১২ ডিসেম্বর ঢাকা-১ আসনের প্রার্থীকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। রিটার্নিং কর্মকর্তাকে ফোন করে জানতে চাইলে জানান, তিনি নাকি কিছু জানেন না। একজন প্রার্থীকে তুলে নিয়ে গেল আপনি কিছুই জানেন না। তাহলে এত সমন্বয়হীনতা নিয়ে আপনারা কাজ করছেন কীভাবে?

তিনি বলেন, আগামী ২০ ডিসেম্বরের পর পরিস্থিতি আরো বেশি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওই সময়টিতে আপনাদের অধিক ধৈর্য ধারণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, ফৌজদারি অপরাধ আর আচরণবিধি এক নয়। আপনাদের ছোট্ট একটা ভুলের কারণে অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে। সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ নিয়ে গণমাধ্যমের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। সভার প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে কমিশন বসে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ