‘নির্বাচনের আগে কমছে না সঞ্চয়পত্রের সুদহার’

বাজেট পেশের পর থেকেই সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হবে বলে বেশ কয়েকবার ঘোষণা দেয়া হলেও নির্বাচনের আগে তা কমছে না বলে জানা গেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭৮ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। একইসময়ে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা পরিশোধ শেষে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা, যা বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা (সংশোধিত) থেকেও ২ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বেশি। জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে বাজেট পেশের পর থেকেই সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হবে বলে বেশ কয়েকবার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, সঞ্চয়পত্রের সুদহার সমন্বয় করতে একটা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি আগামী ২ মাসের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট দেবে। তবে রিপোর্ট যাই আসুক, আগামী নির্বাচনের আগে সঞ্চপত্রের সুদহার কমছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সঞ্চয়পত্রের সুদহার সমন্বয় করতে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী।

বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. ইউনুসুর রহমান, অর্থ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব আবদুর রউফ তালুকদার, জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের মহাপরিচালক বেগম শামসুন্নাহারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এ সময় মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৭৮ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্য থেকে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা পরিশোধ করা হয়েছে ৩২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে মুনাফা পরিশোধ হয়েছে ২০ হাজার ২ কোটি টাকা। যদিও অর্থবছরের জন্য সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে (২০১৬-১৭) সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ৭৫ হাজার ১৩৪ কোটি টাকার। সঞ্চয়পত্র বিক্রি হলেও তুলনামূলক কম মূল ও মুনাফা পরিশোধের কারণে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছিল ৫২ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে মূল ও মুনাফা পরিশোধে ব্যয় হয়েছিল ২২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে মুনাফা পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা।

প্রসঙ্গত, আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা পরিশোধের পর যে পরিমাণ অর্থ অবশিষ্ট থাকে তাকে বলা হয় নিট বিনিয়োগ। তাই বিনিয়োগের ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেটে নির্ধারিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যয় করে থাকে। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতিমাসে মুনাফা দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়। তথ্য মতে, অর্থবছরের শেষ মাস জুনে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৫ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার। ওই মাসে মূল ও মুনাফা পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। ফলে ওই মাসে সরকারের নিট ঋণ হয় ৩ হাজার ১৬৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

জানা গেছে, সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ব্যাংকে নানা ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতির খবর প্রকাশিত হওয়ায় ব্যাংক খাতে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। পুঁজিবাজারেও টালমাটাল অবস্থা। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানোর আভাসের পাশাপাশি নতুন সংকট এসে উপস্থিত হয়েছে আমানতের সুদহার কমিয়ে আনা। সম্প্রতি ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) প্রতিনিধিরা এক বৈঠকে আমানতের সুদের হার কমিয়ে সর্বনিম্ন ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেন। যা গত ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। তাই অধিকাংশ বিনিয়োগকারী সঞ্চয়পত্রকেই শেষ ভরসার জায়গা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এ ছাড়া যে কোনো সময় সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হতে পারে। তাই সুদহার কমানোর ঘোষণা আসার আগে সঞ্চয়পত্র কিনলে বাড়তি হারেই মিলবে মুনাফা। এ কারণে সঞ্চয়পত্র কেনায় হিড়িক লেগেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে ব্যাংক আমানতের সুদহারের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের স্কিমগুলোর মুনাফার হার বেশি হওয়ায় তা কমানোর দাবি আসে ব্যাংকার, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন মহল থেকে। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল প্রায় ২ ঘণ্টার বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগামী ৯ আগস্ট থেকে ব্যাংক আমানতের ৬ শতাংশ ও ঋণে ৯ শতাংশ সুদহার কার্যকর হচ্ছে। তাই ব্যাংক আমানতে সুদহার থেকে সঞ্চয়পত্রের সুদহারের পার্থক্য অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সুদহার কমাতে চায় সরকার।

এজন্য অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি আগামী ২ মাসের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট দেবে। তবে রিপোর্ট যাই আসুক, আগামী নির্বাচনের আগে সঞ্চপত্রের সুদহার কমানো হবে না। তিনি বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রের সুদহারের ক্ষেত্রে আমরা বাজার রেট থেকে এক বা দেড় শতাংশ বেশি রাখতে চেষ্টা করি। কিন্তু এখন এটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। এটা কমাতে হবে। তবে পরবর্তী সরকার সঞ্চয়পত্র কমানোর বিষয়টি বাস্তবায়ন করবে। আশা করছি, আমরা আবারো সরকারে আসব। আমরাই এটি বাস্তবায়ন করব।’

তিনি বলেন, ‘আগামী জানুয়ারি থেকেই সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের সব কার্যক্রম অটোমেশন হয়ে যাবে। এ অটোমেশনে ন্যাশনাল আইডি কার্ডের সঙ্গে লিংক থাকবে। তাই কেউ সীমার অতিরিক্ত সঞ্চয়পত্র কিনছে কিনা সেটি সহজেই ধরা পড়বে। সঞ্চয়পত্রে কালো টাকা বিনিয়োগরোধে আগামীতে ৫০ হাজার টাকার বেশি কেউ সঞ্চয়পত্র কিনতে চাইলে তাকে চেকের মাধ্যমে টাকা পেমেন্ট করতে হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে গতকাল গিয়ে দেখা যায়, সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছেন বিনিয়োগকারীরা। ফরম সংগ্রহ ও জমা দিতে প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লাগছে প্রতি গ্রাহকের। সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেড়েছে কিনা জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল শাখার মহাব্যবস্থাপক মো. মাছুম পাটোয়ারী বলেন, ‘যে কোনো সময় সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমতে পারে এমন আশঙ্কা করছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এ ছাড়া ব্যাংকের আমানতের সুদের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বেশি হওয়ায় মানুষ সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছেন।’

তিনি বলেন, ‘সকাল থেকেই সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য গ্রাহক ভিড় করেছে। এত লোক যে আমাদের অফিসাররা তাদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।’

অধিদফতরের তথ্য সূত্র জানায়, সঞ্চয়পত্রগুলোর মধ্যে ৫ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। ৫ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ৫ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। ৩ বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। ৩ বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বর্তমানে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।’

মানবকণ্ঠ/এএএম