নির্বাচনের আগে ঋণ বিতরণে সতর্ক ব্যাংকগুলো

আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে সতর্কতার সঙ্গে ঋণ বিতরণ করছে দেশের ব্যাংকগুলো। এতে গত কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবেই ঋণ বিতরণের পরিমাণ কমছে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বরে ৩৩ মাসের মধ্যে সব চেয়ে কম ঋণ বিতরণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।

আগামী দু’তিন মাস ঋণ বিতরণের পরিমাণ আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নির্বাচনের বছরে এমনিতেই ব্যাংকগুলো বাড়তি সতর্কতার সঙ্গে দেখেশুনে ঋণ দেয়।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের এডিআর নির্ধারিত সীমার ওপরে রয়েছে, তারা ঋণ দিতে পারছেন না। এ ছাড়া, এডিআর সীমার মধ্যে থাকা ব্যাংকগুলোও সতর্কতার সঙ্গে ঋণ বিতরণ করছে। অন্যদিকে নির্বাচনের কারণে ব্যবসায়ীরাও নতুন কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করছেন না। অর্থাৎ তারা ব্যাংক থেকে খুব একটা ঋণ নিচ্ছেন না। অর্থাৎ ব্যাংক এবং গ্রাহক দু’পক্ষই সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। ফলে কমছে ঋণ বিতরণ প্রবৃদ্ধি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যাংক এবং ব্যবসায়ী দু’পক্ষই সতর্কতা অবলম্বন করছে। অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের অনেকেই উৎপাদনে যাচ্ছেন না। বিনিয়োগ কমায় ঋণও কমেছে। আর ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণও অনেক বেড়ে গেছে। ফলে তারা নির্বাচনের আগে নতুন ঋণ বিতরণে কিছুটা সতর্ক হচ্ছে। তবে ব্যাংক ঋণ কমে যাওয়ার জন্য মূলত উচ্চ সুদকে দায়ী করেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি যে খারাপ, এটা স্বীকার করতে হবে। তবে এর জন্য প্রধানত ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ দায়ী। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে চান না। এ ছাড়া ব্যাংকগুলো নিজেরাও এখন একটু রক্ষণশীল ভঙ্গিতে এগোচ্ছে। এ কারণে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমছে।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, গত জানুয়ারিতে ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) কমানো এবং সুদ হার কমানোর সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংক খাতে তারল্যের (নগদ টাকা) সংকট হয়েছে। তারা বলছেন, আমদানি বৃদ্ধিসহ কিছু কারণে গত বছরের মাঝামাঝি থেকে ঋণ চাহিদা ব্যাপক বাড়তে থাকে। ফলে তারল্যের ওপরও চাপ পড়ে। এক অঙ্কের নিচে নেমে আসা ঋণের সুদহার বেড়ে দুই অঙ্ক হয়ে যায়। অনেক ব্যাংক ১০ শতাংশের বেশি সুদে আমানত নিতেও শুরু করে। এর মধ্যে গত ৩০ জানুয়ারি ব্যাংক খাতের এডিআর কমিয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে যেসব ব্যাংকের এডিআর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে, নানা উপায়ে তারা তা সমন্বয়ের চেষ্টার ফলে নতুন করে ঋণ বিতরণ করতে পারছে না। এডিআর যেন বেড়ে না যায় এ জন্য লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে থাকা ব্যাংকগুলোও সতর্কতার সঙ্গে ঋণ বিতরণ করছে। সব মিলিয়ে ব্যাপক চাপে পড়ে ব্যাংকগুলো আগের মতো আর ঋণ বাড়াতে পারছে না।

জানা গেছে, বর্তমানে বেশকিছু বাণিজ্যিক ব্যাংকে নগদ টাকার সংকট চলছে। বাকি ব্যাংকগুলোও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঋণ দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে ব্যাংক খাতে এখন ঋণ বিতরণ কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ হচ্ছে না। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা ব্যাংক থেকে এখন ঋণ নিতেই আগ্রহী নন। সামনে নির্বাচন। তাই নতুন করে কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যও শুরু করছেন না। পুরনো ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রেও পর্যবেক্ষণে থাকছেন তাদের অনেকেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে কমে সেপ্টেম্বরে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের পর এত কম প্রবৃদ্ধি আর দেখা যায়নি। আগের মাস আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ১৮ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল আট লাখ এক হাজার ২১৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। অথচ চলতি বছরের শুরুতেও বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে আগামী ডিসেম্বর নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের শেষার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতিতে একই রকম প্রবৃদ্ধি ধরা হলেও গত জুনে প্রবৃদ্ধি হয় ১৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এ ছাড়া গত বছরের ডিসেম্বরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।